ঠিক আগের দিন যোসেফ মারা গেছে, খবর এসেছে পরদিন সকালবেলা। আমি বাগানে কাজ করছি। হঠাৎ দেখি ঝাঁঝরি হাতে পাপাম্মা রান্নাঘরের দিক থেকে দৌড়তে দৌড়তে আসছে। মুখে প্রচণ্ড আতঙ্ক।
সায়েব, সায়েব ওর পেছন পেছন দেখি প্লুটোও আসছে। মাংসপেশিগুলো ফুলে উঠেছে। শীর্ণ, কমজোরি ভাবটা আর নেই।
দেখে তো আমি খুব খুশি। বললাম, ডর খাচ্ছিস কেন? এতদিনে কুকুরটা পোষ মানল।
পাপাম্মা তেমনি ভয়ের সঙ্গে বলল, যোসেফ, যোসেফ এসেছে।
কোথায় রে? আচ্ছা তো! দিনের বেলায় ভূত দেখছে! এদের যা কুসংস্কার! বললাম, চল দেখি কোথায় তোর যোসেফ।
আঙুল দিয়ে প্লুটোকে দেখিয়ে বলল, ওই যে ওর মধ্যে ঢুকেছে। রান্নাঘরে একেবারে আমার কাপড়ের মধ্যে ঢুকে গেছিল। আমরা সবাই হেসে উঠেছি। আমি সুষ্ঠু। বি. সেন সুষ্ঠু।
ব্যাবিংটন গম্ভীরভাবে আমাদের সবার দিকে তাকিয়ে বলল, আমিও প্রথমটা হেসেই ছিলাম। কিন্তু তারপর ব্যাপারটা লক্ষ করলাম। পাপাম্মা খেতে না দিলে খাবে না, খেতে খেতে মাঝে মাঝেই ওর দিকে চাইবে, চোখে যেন জল। কালো কালো কী রকম চোখ দেখছ তো? চাউনি যেন কুকুরের মতো নয়। কোনো মতেই নয়। আস্তে আস্তে মেয়েটার ভয় কেটে গেল। আমাকে বলল, দেখো সাহেব, ও যে যিশুর নামে দিব্যি গেলেছিল ভালো ছেলে হবে, দেখো হয়েছে।
কী রে প্লুটো? হয়েছিস ভালো ছেলে? ব্যাবিংটন অ্যালসেশিয়ানটার দিকে তাকাল। প্লুটো অমনি পেছনের পারে ভর দিয়ে, ব্যাবিংটনের কাঁধের ওপর দুই থাবা রেখে উঠে দাঁড়াল।
দেখে কুহু আমার দিকে ঘেঁষে এসে বলে উঠল বাবা রে!
প্লুটো বলল, ঘাঁউ ঘাঁউ! তারপরে আবার থাবা নামিয়ে শান্তশিষ্ট হয়ে যেমন বসেছিল, বসে পড়ল।
বি. সেন মুচকি হেসে নিবে-যাওয়া চুরুটে অগ্নিসংযোগ করে বললেন, আচ্ছা একখানা আষাঢ়ে গল্প শোনালে যা হোক।
ব্যাবিংটন গম্ভীর হয়ে গেল, বলল, ও কীভাবে বাজারের থলি বয়ে নিয়ে আসে, কাগজ নিয়ে আসে মুখে করে, দুধঅলা, ডিমঅলা, মাছঅলা এলেই চেঁচিয়ে ডাকে পাপাম্মাকে খেয়াল করেননি? দেখেননি কীভাবে গাল চেটে পাপাম্মাকে আদর করে, সারাটা দিন ওর পায়ে ঘোরে, রান্নাঘরে ওর হাতা-বাসন পর্যন্ত এগিয়ে দেয়!
বি. সেন বললেন, অনেক কুকুরই এরকম করে থাকে মি. ব্যাবিংটন। শেখালেই করে। আমার তিনটে কুকুর আছে, আমি জানি। মনিবকে, যে খেতে দেয় তাকে, এরা, বিশেষত এইসব পেডিগ্রি ডগগুলো ভীষণ মানে। আমার তো মনে হয় তোমার কুক ওই মেয়েটির থেকে ও তোমারই বেশি ভক্ত। খাওয়াদাওয়া হয়ে গেছে, এখন আর ওর খোঁজ করছে না। তোমার সঙ্গে সেঁটে রয়েছে।
ব্যাবিংটন আরও গম্ভীর হয়ে বলল, সে কথা নয় আসলে রাত হলে ও আর আমার কাছছাড়া হতে চায় না।
কেন? এর মধ্যে বিশেষত্বই বা কী আছে? ঘোষ সাহেব বলল।
ব্যাবিংটনের মুখ ঈষৎ লাল। বলল, দেখো না কেমন বেয়াড়া লোকটা।এক্কে! বারে সন অফ এ বিচ। যত বলি ও মেয়েটা আমার বাপ-মা, সব। আমাকে বিশ্বাস করতে চায় না। সারা রাত আমাকে ঠায় পাহারা দেবে। টয়লেট পর্যন্ত হুশ হুশ করে ঢুকে যাবে। টয়লেটটা আউটহাউজের দিকে মুখ করে কি না। পাঁড় জেলাস শয়তানটা, দেখবে? বলতে বলতে ব্যাবিংটন হাত বাড়িয়ে দেয়ালে একটা সুইচ টিপল।
কিছুক্ষণ পরই হলঘরের লাউঞ্জের দিকের দরজাটার বেল বাজল। ব্যাবিংটন আমার দিকে তাকিয়ে বলল, মিসেস ঘোষ, যদি কিছু মনে না করো তুমিই গিয়ে দরজাটা খুলে দাও। একটু কষ্ট হবে, তবু তুমিই দাও, দেবে?
আমি বললাম, নিশ্চয়ই।
কিন্তু তার আগেই লাফিয়ে উঠেছেন বি. সেন। দরজার দিকে যেতে যেতে বলছেন, হোয়াট ননসেন্স, এই ভায়োলেন্ট ওয়েদারে একজন মহিলাকে দরজা খুলতে পাঠানো?
ব্যাবিংটন বলে উঠল, না সেন, তুমি যেও না, লেট মিসেস ঘোষ গো, শি শিওরলি ওন্ট মাইন্ড!
কিন্তু ততক্ষণে বি. সেন দরজার কাছে পৌঁছে গেছেন। ব্যাবিংটন হাঁ হাঁ করে ছুটে যেতে না যেতেই দরজাটা খুলে ফেলেছেন। আমরা বিদ্যুতের মতো কতকগুলো ঘটনা চমকাতে দেখলাম। বি. সেন প্রাণপণে দরজাটা খুলে ধরলেন। সাইক্লোনিক ঝড়ের ঝাপটা সামলাতে সামলাতে পলিথিনের ওয়াটারপ্রুফ পরে ভেতরে ঢুকে এলো পাপাম্মা। এবং প্লুটো উল্কার মতো ছুটে গিয়ে পাপাম্মা আর বি. সেনের মাঝখানে তার ভয়াবহ বিশালতা নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, দুই থাবা বি. সেনের কাঁধে। দেখলাম হিংস্রভাবে সে বি. সেনের গাল থেকে মাংস খাবলে নিচ্ছে।
বন্ধু
হাওড়ার ফ্যাক্টরি থেকে সোজা গেছি আমহার্স্ট স্ট্রিটে। সেখান থেকে ভবানীপুর। রবিন আজ ছুটিতে। আমিই ড্রাইভ করেছি সবটা। দোতলার দালান পর্যন্ত পৌঁছোতে আজ আমার দম বেরিয়ে গেল। পায়ে যেন জোর নেই। দালান অবধি পৌঁছোতেই কালোমানিক গুড়গুড় গুড়গুড় করতে করতে এগিয়ে এল। পায়ের কাছটায় ফোঁস ফোঁস করছে, যেন প্রণাম করছে। আজ মনমেজাজ এতই খারাপ যে পা-টা ছুঁড়তে গিয়েছিলাম। সামলে নিলাম। ড্যাসুনটার কী দোষ! ও তো। আমার ছেড়ে যায়নি, যাবেও না ওর আয়ুষ্কাল শেষ না হওয়া পর্যন্ত। জানোয়ার মানুষের চেয়ে অনেক বিশ্বস্ত, অনেক বৎসল। উঃ, টুকটুক যে কোথায় গেল! ওর বোঝা উচিত গাড়ির শব্দ পাওয়া গেছে, অতএব আমি এসেছি। কোথায় কী এমন রাজকর্মটা করছে! ঠিক আছে। করো তুমি তোমার রাজকর্ম। আমিও কিচ্ছুটি বলব না। জুতো খুললাম না। জামা-কাপড়, ধড়াচুড়ো যা পরা ছিল, রইল। দালানের সোফায় গা এলিয়ে দিলাম। পাখাটা চলছে ফুল স্পিডে। তবু ঘামছি।
