রোমান্টিক হলে সেটা কেন আর সিরিয়াস হবে না আমি বুঝতে পারলাম না। রোমান্টিক শুনলে নিউ জেনারেশন নাক সিঁটকোয়, ইনি নিউ জেনারেশন না হয়েও নাক সিঁটকোচ্ছেন। অথচ এ যুগের রোববা, ডাইনোসর, মাইকেল জ্যাকসন এসব যেন আর রোম্যান্টিক নয়! তবে বি. সেন লোকটা যে রকম ঘোড়েল, ও যে চূড়ান্ত রকমের আনরোমান্টিক হবে তাতে আর কোনো সন্দেহ নেই।
এই সময়ে ব্যাবিংটন চোখ গোলগোল করে বলল, প্রেম আর ভূত দুই-ই আছে, এমন একটা গল্প শুনবে না কি?
কুহু এগিয়ে বসে বলল, বলুন মি. ব্যাবিংটন প্লিজ।
তাহলে কফি খাওয়াও। পাপাম্মা আউটহাউজে চলে গেছে। তোমার হাতের কফি খাই। কুহু কোমরে শাড়ি জড়িয়ে উঠে পড়ল। বলল, নিশ্চয়ই। রান্নাঘরের দিকে চলে গেল ও। মিনিট কয়েক পরেই ওদিক থেকে ডাকল, রীনাদি, একটু হেল্প করবে এস না।
আমি উঠে পড়ে রান্নাঘরে যেতেই খুব উত্তেজিত কাঁপা-কাঁপা গলায় বলল, কী গিফট পেয়েছ রীনাদি?
এখনও তো খুলিনি।
আমি আর কৌতূহল সামলাতে পারিনি ভাই, খুলে ফেলেছি এই দ্যাখো, একটা কী রহস্যময় গিফট পেয়েছি! বলে ও একটা দামি কাগজ মেলে ধরল। তার মধ্যে একটা লিপস্টিক। কাগজটাতে লেখা, উইথ কিসেস।
কে বলো তো?
আমি হেসে উড়িয়ে দিলাম। বললাম, তোমার বর আবার কে?
ও চিন্তিত হয়ে বলল, এটা মোটেই ওর হাতের লেখা নয়। ওর কাগের ঠ্যাং বগের ঠ্যাং আমি চিনি।
আমি হেসে বললাম, আমার বরেরও নয়, একটু আশ্বাস দিতে পারি। ও ভুরু কুঁচকে কফি তৈরি করতে লাগল, ইতিমধ্যে আমি চট করে ওই চাতালের দিকের দরজা দিয়ে নিজেদের ঘরে ঢুকে দেখি বইটই, খেলনা-টেলনা ছড়িয়ে বাবাই ঘুমিয়ে কাদা। আমার প্যাকেটগুলো খুললাম। এক প্যাকেট খুব সুন্দর বাহারি মোমবাতি। কে দিয়েছে নাম নেই। আমার কর্তা কিসসু দেয়নি মনে হল, কিন্তু এ কী? কুহুর মতোই একটা কাগজের প্যাকেট না? খুলে দেখি ভেতরে একটা ছোট্ট পারফুমের শিশি, কাগজে লেখা, টোয়েন্টি সেভেন্থ, মিডনাইট, হোয়েন দা ওয়ার্ল্ড ফলস অ্যাস্লীপ লাস্ট চান্স। ওবলাইজ। ভেনু-ব্যাক টেরেস।
এ কি রে বাবা! আমরা অবশ্য আঠাশে সত্যিই চলে যাচ্ছি। কিন্তু এ লেখার কী মানে? কেউ ঠাট্টা করেছে? ব্যাবিংটন জানে আমরা কবে যাব। অন্যরা জানলেও জানতে পারে। কিন্তু ঠাট্টাও যদি হয়, কী জংলি আপমানজনক ঠাট্টা! আমার মাথার মধ্যেটা জ্বলতে লাগল। কাগজটা বালিশের তলায় কোনোমতে দুমড়ে খুঁজে রেখে রান্নাঘরে ফিরে গেলাম। কুহুর কফি তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
আমি নিয়ে গেলাম ট্রে-টা। পেছনে আর একটা ট্রেতে বিরাট পট-টট নিয়ে ও।
কুহু বসে পড়ে বলল, নিন এবারে বলুন। প্রেমিক ভূত, না ভুতুড়ে প্রেম বলতে বলতে কুহু আমার দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে চাইল। বুঝতে পারছি ও ব্যাবিংটনকে সন্দেহ করছে।
ভয় পেলে কিন্তু চলবে না। ব্যাবিংটনের মুখ এখন আরও গোল হয়ে গেছে।
আমি বললাম, ভয়? যা নেই তাকে ভয়টয় আমরা করি না মি. ব্যাবিংটন। তবে যা আছে কিন্তু লুকিয়ে আছে তাকে একটু ভয় পাই। কুহু মুচকি হেসে আমার দিকে চাইল।
ব্যাবিংটন বলল, হেই প্লুটো, এদিকে আয় তো!
গরগর গরগর করে একটা চাপা আওয়াজ করে অ্যালসেশিয়ানটা এগিয়ে এলো, ব্যাবিংটনের চেয়ারের পাশে থাবা গেড়ে বসল। ল্যাজটা খুশিতে যেন লাফাচ্ছে।
এর কত বয়স হবে বলো তো?
কত হবে? দশ কি এগারো। বড়োসাহেব বি. সেন বললেন। বলবার হক ওঁরই আছে মনে হল। আমার আবার কুকুর-টুকুর আসে না।
কুহু আমার কানে কানে বলল, নেড়ি কুকুর ছাড়া আর কোনো কুকুরেরই বয়স বাবা আমি বলতে পারি না।
আমি চুপিচুপি জিজ্ঞেস করলাম, নেড়ি কুকুরেরটাই বা কী করে পার?।
আমাদের বাড়ির একতলার গুদোমঘরে একটা নেড়ি বাচ্চা পেড়েছিল। পাঁচটার মধ্যে চারটে বছরখানেকের মধ্যেই মরে গেল। পঞ্চমটা সাত বছর পরে, ঠিক যে গুদোমে জন্মেছিল সেইখানেই এসে মরে।
এই সময়ে ব্যাবিংটন ঘোষণা করল, প্লুটোর উনিশ বছর বয়স পেরিয়ে গেছে।
ইমপসসিবল, বি. সেন বললেন।
ব্যাবিংটন বলল, এগজ্যাকটলি। আমিও তাই বলি। কিন্তু সম্ভব হয়েছে। হয়তো প্লুটো প্লুটো নয়। অন্য কেউ।
মানে? বি. সেন মুখ থেকে চুরুট সরিয়ে ফেলেছেন।
ব্যাবিংটন বলল, তোমরা ট্রান্সমাইগ্রেশন অফ সোলস মানো? বিশ্বাস করো?
বি. সেন বললেন, আরে জন্মান্তরবাদ তো আমাদের সংস্কারের মধ্যে ঢুকে বসে আছে। মানি বা না মানি।
আমার কর্তা বলল, না না, উনি বোধহয় সেই পিথ্যাগোরাসের থিয়োরির কথা বলছেন, একজন মারা গেল তো তার আত্মা হয়তো অন্য কেউ, এমনকি কোনো জন্তুজানোয়ারকেই গিয়ে আশ্রয় করল। বহু পুরোনো তত্ত্ব। তাই না, মি. ব্যাবিংটন?
ব্যাবিংটন নীরবে মাথা নাড়ল।
অলরাইট, বলো তোমার গল্প—বি. সেন চুরুটের ছাই ঝেড়ে বললেন।
ব্যাবিংটন বলতে লাগল, পাপাম্মাকে দেখছ তো! অন্ধোর মেয়ে। ক্রিশ্চান। সব কিছুতে একসপার্ট। তেমনি বিশ্বাসী। প্রথমে ওর মা এখানে কাজ করত, ও স্কুলে পড়ত। তারপর ওর মা হঠাৎ মারা যেতে ও আমার কাছে আশ্রয় চাইল। আপন আর কেউ নেই। সেই থেকে কাজ করতে আরম্ভ করল এখানে। ওর মা থাকত দূরে, ওদের বস্তিতে, ও কিন্তু এইখানে আউটহাউজটা পরিষ্কার করে থাকতে আরম্ভ করল। কিছুদিনের মধ্যেই কাজকর্মে মাকে তো বটেই, আরও অনেককেই ছাড়িয়ে গেল। আমার তো একেবারে ডান হাত। গেস্টদের এমন যত্ন করত যে কিছুদিনের মধ্যেই আমার বাংলোর কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। সারা বছর গেস্ট। আর আমাকেও এমন দেখাশোনা করত যে আমি বলতাম ও একাধারে আমার পাপা আর মা। এইভাবে বেশ চলছিল। ইতিমধ্যে একটি ক্রিশ্চান ছোকরা ওর প্রেমে পড়ল। অন্ধোরই ছেলে। বোধহয় সাত-আট ক্লাস পর্যন্ত পড়েছে, তাইতেই নিজেকে নিজেদের কমিউনিটির মধ্যে একটা কেউকেটা গোছের ভাবতে শুরু করেছে। শুটকি মাছ চালানের ছোটোখাটো কারবার করে সেই যোসেফ এসে পাপাম্পাকে বিয়ে করতে চাইল। কী আর করি। বললাম, করতে পার, কিন্তু আমার আউটহাউজে তাই বলে থাকতে দেব না। যোসেফের মতলব ছিল ওকে কাজ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু পাপাম্মা এতদিন এই পরিবেশে মানুষ। এত বড়ো বাড়িতে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ায়, নানান রকমের মানুষ দেখে, কত মেমসাহেবদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে, আমার কাছ থেকে লেখাপড়াও আরও শিখছিল, ভালো ভালো খানা রান্না করে, ফুলবাগান করে, তার ওখানে পোষাবে কেন? সে যেমন আমার কাজ করছিল করতে লাগল। কিন্তু আর এখানে থাকত না।
