কিন্তু ওই যে বললাম সকাল থেকে ঘ্যানঘ্যানে বৃষ্টি। হাওয়া ভীষণ জোলো। ঠান্ডা। গায়ে যেন ভিজে কম্বল লেপটে আছে। দু-একবার পেছনের চাতালে যাবার চেষ্টা করলাম। দেখি এলোমেলো হাওয়া দিচ্ছে, অর্থাৎ ক্রমশই সাইক্লোনিক হয়ে যাচ্ছে ওয়েদার। ব্যাবিংটন বলল, মিসেস ঘোষ, খবরদার ওদিকে যেয়ো না। হঠাৎ দমকা হাওয়া এসে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে একেবারে আছড়ে ফেলে দেবে সি-বিচের ওপর।
সর্বনাশ! তাড়াতাড়ি শওকতকে ডাকি। আমি না হয় না গেলাম। কিন্তু বাবাই। সারাদিন ঘরের মধ্যে থেকে উত্যক্ত হয়ে রয়েছে, যা দস্যি, টুক করে সবার অলক্ষ্যে ওদিকে চলে গেলেই হল। শওকত, পাপাম্মা, ব্যাবিংটন সবাই মিলে ঝোড়ো হাওয়ার মুখে সেই বিশাল দরজা বন্ধ করে দিল। দুপাশ থেকে দুটো চওড়া লোহার খিল পড়ল। লাউঞ্জের দিকের দরজাও বন্ধ। আমাদের সব ঘরের জানলার শার্সিও বন্ধ। এবার ঝড় এ চত্বরের বাইরে যত খুশি মাতামাতি করুক।
সন্ধে হতেই ঝাড়লণ্ঠনে মোম জ্বলে উঠল। চীনে লণ্ঠন জ্বলে উঠল, ক্রিসমাস ট্রির গায়ে ছোটো ছোটো টুনি বালব জ্বলে উঠল। চারিদিক ঝিকমিক ঝিকমিক করছে। বিশেষ করে হলের দরজার মাথায় সেই সোনালি রঙের বেথলিহেম স্টারটা। সেটা থেকে রীতিমতো আলো ঠিকরোচ্ছে।
কী মাস্টার বাবাই, এবার তোমার মন ভালো হয়েছে? ব্যাবিংটন বলল। জবাবে বাবাই দুম করে একটা বন্দুক ফাটাল। সবাই হা-হা করে হেসে উঠল। ব্যাবিংটন বলল, ব্যাস, আমাদের ক্রিসমাস উৎসব আরম্ভ হয়ে গেল। প্লুটো পর্যন্ত দেখি প্রচণ্ড ল্যাজ নাড়াতে নাড়াতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অর্থাৎ তারও খুব আহ্লাদ।
ভোজ হল জমাট রকম। ছোটো ছোটো চিকেনের গোটা রোস্ট। বাঙালি পোলাও, প্রতি গ্রাসে কাজু, কিসমিস, মটরশুটি। পমফ্রেটের ফ্রাই। দু রকম স্যালাড। আর ক্রিসমাস পুডিং পাপাশা সত্যিই দারুণ রাঁধিয়ে। একেবারে ওস্তাদ। ওর রান্নার লোভেই বোধহয় ব্যাবিংটনের ভুতুড়ে বাড়িতে সারা বছর একটা গেস্টের ধারা অব্যাহত থাকে। আজকের ভোজটা আবার ব্যাবিংটনই দিতে চেয়েছিল। আমরা সবাই আপত্তি করেছি। জোরজার করে চাঁদা দিয়েছি। কাউন্টারে গাবদা খাতা খুলে বসে হিসেব কষলেও, তেমন কিছু উপার্জন ওর নেই। নইলে গত ছ-সাত বছর ধরে দেখছি তো! রঙ তো দূরের কথা, বাড়িটাকে চুনকাম পর্যন্ত করায়নি একবারও। শুধু কিছু কিছু প্লাস্টারের তাপ্পি চলছে জায়গায় জায়গায়।
সবাই যে যার গিফট পেয়ে গেছি। বাবাইয়ের কোলে তো অ্যাত্তোগুলো জড়ো হয়েছে। তার পরেই ব্যাবিংটনের। আমরা সবাই দু-তিনটে করে পেয়েছি। খুলতে যাব, ব্যাবিংটন বলল, ধৈর্য ধরো মিসেস ঘোষ, প্যাকেট খুলবে একেবারে রাত্তিরে, যে যার ঘরে গিয়ে। এখন আড়া। খালি মাস্টার বাবাই যা ইচ্ছে করতে পারে। বাবাই তৎক্ষণাৎ তিন লাফ দিয়ে একটার পর একটা প্যাকেট খুলতে লাগল। টিনটিনের কমিকস পেয়েছে দুটো, ব্যাবিংটন দিয়েছে। একটা ইয়াবড় টয়লেট সাবান, বিদেশি–বি, সেন দিয়েছেন অবশ্যই। কাজুবাদামের প্যাকেট-কুহু ও কেকা। আমরা আসবার সময়ে একটা স্ক্র্যাবলস গেম কিনে এনেছিলাম, সেটাই দিয়েছি। ভাগ্যিস, ওকে আগে দেখাইনি।
বাবাই তার উপহারের প্যাকেট সব দু হাতে আঁকড়ে ধরে ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল। এখন ও কমিকস দুটো গোগ্রাসে গিলবে।
ব্যাবিংটন বলল, কী? আড্ডায় সবাই রাজি তো?
আমাদের তো কোনো আপত্তিই নেই। কুহুরাও দেখলাম খুব উৎসাহী।
কী মিস্টার সেন? বসছেন তো? ঘোষ সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।
বি. সেন ধীরসুস্থে একটা পাইপ ধরালেন, তারপর এই প্রথম চাপা হাসিতে উজ্জ্বল মুখে বললেন, ইয়েস। অফ কোর্স। তবে অন কন্ডিশন। যদি ইন্টারেস্টিং গল্প শুনতে পাই।
ব্যাবিংটন বলল, ইন্টারেস্টিং গল্প? মানে ভূতের?
বি. সেন বললেন, প্রেমের হতে পারে।
প্রেম আর ভূত? কুহু খিলখিলিয়ে হেসে উঠল।
একটু ভেবে দেখলেই বুঝতে পারবেন দুটোর মধ্যে কিন্তু প্রচুর মিল আছে, বি. সেন মিটিমিটি হেসে বললেন।
ঘোষ সাহেব বললেন, কেন? প্রেমও ভূতের মতো হুট করে ঘাড়ে চাপে, তারপর পট করে ঘাড় মটকায় বলে?
ব্যাবিংটন বললে, ছিঃ মহিলারা মনে কষ্ট পায় এমন কথা না-ই বললে মিঃ ঘোষ! বলছে বটে, কিন্তু তার মুখে দুষ্টু হাসি।
আর কোনো মিল? দুটোর মধ্যে? বি. সেন চারদিকে চোখটা ঘুরিয়ে নিলেন একবার, যেন কুইজ-মাস্টার!
কেকা অর্থাৎ গোবিন্দ বলল, আমি একটা মিলের কথা বলতে পারি—ভূতও নেই, প্রেমও নেই।
ব্যাবিংটন এবারে সশব্দে প্রতিবাদ করে উঠল, নো, নো, ইয়াং ম্যান। তুমি একটা সদ্য-বিবাহিত যুবক। হনিমুন কাটাতে এসেছ, তোমার মুখে এসব কথা! নো, নো… ব্যাবিংটন মাথা নাড়তে লাগল।
বললে আর কী করবেন? ঠ্যাঙাতে পারবেন? দিন না বেশ করে দু ঘা। কুহু হাসতে হাসতে বলল।
এরই মধ্যে বি. সেনের গলার আওয়াজ শোনা গেল।
উঁহু। প্রেম আছে, যেমন ভূতও আছে। কী বলেন, মিসেস ঘোষ!
সবাইকে ছেড়ে আমাকেই ভদ্রলোক সাক্ষী মানলেন কেন বোঝা গেল না। বললাম হ্যাঁ কবি বলেছেন বটে বোঝা গেল না, গেল না। ওকি মায়া কি স্বপনছায়া? ও কি ছলনা?
কুহুর যেমন অভ্যেস। সে হেসে গড়াতে লাগল। অন্য সবাইয়েরও স্মিত মুখ। ব্যাবিংটনের সুদ্ধ। যদিও এত শক্ত বাংলা ও বুঝতে পেরেছে কিনা আমার সন্দেহ আছে। কিন্তু বি. সেন যেন হাসিটা গিলে নিয়ে বললেন, এ তো রোমান্টিক ব্যাপারস্যাপারের কথা বলছেন। প্রেমের রহস্য কিন্তু আরও অনেক সিরিয়াস।
