দুই সাহেব সন্ধে থেকেই বোতল নিয়ে বসে। সমুদ্রের দিকের চাতালটায়। দৃশ্যটা ভারি মজার। বাঁ পাশে এক সারি মরকুটে ঝাউগাছ। আধভাঙা বালিয়াড়ির ওপর সিমেন্ট-চটা চাতাল। চাতালের ওপর গেলে স্টিলের ফোল্ডিং টেবলটা পেতে ফেলে ব্যাবিংটন। শওকত, তার হুকুমবরদার, স্টিলের ফোল্ডিং চেয়ার পেতে ফেলে যেন অন্তত আধডজন লোকের মজলিশ বসবে। পাপাম্মা, ব্যাবিংটনের আরেক হুকুমবরদার, একটি তেলেঙ্গি মেয়ে, বড়ো এক প্লেট কাজুবাদাম, বোতল গেলাস সব সাজিয়ে রেখে যায়। ওরা দুজনে সমুদ্রের দিকে চেয়ে বসে থাকে, হাতে গেলাস, মাঝে মাঝে চুমুক দিচ্ছে, নামিয়ে রাখছে, আবার তুলে নিচ্ছে। পাশাপাশি চেয়ারে বসে দুজনেই একেবারে আকাট চুপ। গম্ভীরভাবে, কেউ কারও দিকে না তাকিয়ে বসে বসে গিলে যাচ্ছে। অন্তত আমি তাই বলি। যাই হোক, গেলার প্রভাব কিন্তু কারও ওপরই বিন্দুমাত্রও পড়ে বলে মনে হয় না। ব্যাবিংটন আগেও যেমন হাসিখুশি সদাশয় ভদ্রলোক, পরেও ঠিক তেমনি। বি. সেন আগেও যেমন গোমড়া, পরেও তেমন গামড়া।
এই সময়টা কুহু-কেকা ফেরেই না, কোথায় কোথায় বেরিয়ে যায়, আমরা বুঝতেই পারি না। আমরাও সাড়ে সাতটা-আটটা পর্যন্ত বাংলোর কাছাকাছি সমুদ্রের ধারে বসে থাকি। যতক্ষণ দিনের আলো থাকবে ততক্ষণ বিচ ধরে বেড়াব, অন্ধকার হলেই বসে পড়ব। লাইট-হাউজটা কাছেই। অন্ধকার জলের ওপর লাইট-হাউজের আলোটা যতক্ষণ না ঘুরতে আরম্ভ করছে, ততক্ষণ আমার ছেলে বাবাই আমাদের উঠতেই দেবে না। এখান থেকে দুই সাহেবের পান-দৃশটা দেখা যায়। বাবাই বলে, মা, ওরা কত থামস আপ খাবে!
ঘোষ সাহেব অর্থাৎ বাবাইয়ের বাবা বলে, ওরা থামস আপ খাচ্ছে? তুই তো দেখছি বুন্ধু দা গ্রেট।
আমি চিমটি কেটে থামবার চেষ্টা করলে কী হবে, ঘোষ সাহেব তার সদাসত্য বলিবে কদাচ মিথ্যা বলিবে না নীতি অনুসারে বলে, থামস আপের বোতল তুই চিনিস না? ইয়ার্কি পেয়েছিস?
তবে কী খাচ্ছে বাবা, মদ? মদটা খুব চুপিচুপি বলে বাবাই।
এই তো ঠিক ধরেছিস ব্যাটা, বলে বাবা ছেলের পিঠে একটা বিরাশি-সি ক্কা ওজনের তারিফসূচক থাবড়া দিয়ে, জনান্তিকে আমাকে বলে, থামস আপ, ধোঁকা দিতে শিখেছে কেমন দেখেছ! তোর বাপ চেনে আর তুই চিনিস না?
আমরা তিন ঘর অতিথিই এক ডিনার-টেবিলে খাই। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন সময়ে। সবচেয়ে প্রথমে আটটা থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে খেয়ে নেয় ব্যাবিংটন আর বি. সেন! নটা নাগাদ খাই আমরা। নব-দম্পতির খাওয়া সবচেয়ে দেরিতে। ওরা যখন খায় তখন আমরা সামনের, কি পেছনের চাতালে বসে গল্পগাছা করছি। নয়তো শুয়েই পড়েছি কোনো কোনো দিন। ওদের হাহা হুহু কানে আসে। পাপাম্মা বলে তেলেঙ্গি মেয়েটি, আমরা যতদিন আসছি, দেখছি ব্যাবিংটনের বাংলোতেই আছে। খুব ভালো রাঁধে, বিশেষ করে পশ্চিমি রান্না। খাওয়ার জন্যে আলাদা চার্জ দিতে হয়, যে যা খেতে চায় তা-ই বেঁধে দেয়। স্পেশ্যাল তেল-ঘি বা কোনো ডিশ খেলে সেগুলো কিনে দিতে হয়। এসব থেকে দু হাতে মারে, বুঝতে পারি। কিন্তু এত ভালো রাঁধে, আর এত ভালো ব্যবহার যে মেনে নিই। মেয়েটা আঁটসাঁট গড়নের, কুচকুচে কালো। মাথার বেণীতে সবসময়ে ফুল থাকবে, নাকের দুদিকে দুটো নাকছাবি। খুব পরিষ্কার। শাড়ি ব্লাউজ ঝকঝক করে, ভালো ট্যালকম পাউডারের গন্ধ বেরোয় গা থেকে। কাজেই আমাদের কোনো অসুবিধেই হয় না। হ্যাঁ বলতে ভুলেছি, ব্যাবিংটনের বাংলোর সবচেয়ে মজাদার অধিবাসী হল প্লুটো, একটা তাগড়া অ্যালসেশিয়ান। সবসময়ে নখের খপ খপ শব্দ করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সকালবেলা মুখে করে কাগজ নিয়ে আসবে। পাপাম্মার সঙ্গে বাজারে যাবে, ভারী থলিটা মখে করে কামড়ে নিয়ে আসবে। যতক্ষণ পাপাম্মা টেবিলে পরিবেশন। করবে, টেবিলের একধারে থাবা দিয়ে দাঁড়িয়ে হ্যাঁ-হ্যাঁ করবে জিভ বার করে। একমাত্র ব্যাবিংটনের খাওয়ার সময়েই পাপাম্মা পরিবেশন করে, ব্যাবিংটন আর বি. সেনকে। আমাদের টেবিল সাজিয়ে দিয়ে চলে যায়। প্রথম প্রথম পরিবেশন করত, কিন্তু টেবিলের ধারে কুকুরটার অমনি দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের মোটে পছন্দ হয় না, তাই ওকে বলি কুকুর নিয়ে চলে যেতে, হয়ে গেলে সব তুলে-টুলে নেয়। রাতে আবার কুহু-কেকা খেতে এলে, সব গুছিয়ে দিয়ে চলে যায়। দশটার পর ও আর বাংলোয় থাকতে চায় না। আউট-হাউজে চলে যায়।
যাই হোক, চব্বিশে পর্যন্ত বেশ ছিল। পঁচিশে সকাল থেকেই আরম্ভ হল বৃষ্টি। ঘ্যানঘেনে, প্যানপেনে। সেইসঙ্গে হাওয়া চলছে খুব। আমরা জানি ব্যাবিংটন ক্রিসমাস করে খুব ঘটা-পটা করে। জানি মানে জানতাম, ওর কাছে থেকেই শুনেছিলাম। এবার দেখবার সুযোগ হল। মাঝের হলঘরটা চব্বিশ তারিখে সারাদিন ধরে পরিষ্কার হল। লোক বলতে শওকত, সেই আধবুড়ো ড্রাইভার, পাপাম্মা, ব্যাবিংটন আর প্লুটো। একটা অ্যান্টিরুমে ক্রিসমাসের সব সাজ-সরঞ্জাম থাকে। সেখান থেকে ওর কৃত্রিম ফারগাছ বেরোল, বেরোল চকচকে সব কাগজের শিকলি। চীনে লণ্ঠন, গুচ্ছের নানান আকার নানান আয়তনের বেলুন, জাপানি ফিতের ফুল। আর একটা বিরাট সোনালি বেথলিহেম স্টার। বেশিরভাগ জিনিসই মুখে করে করে নিয়ে এল প্লুটো। আমার ছেলেও মহা উৎসাহে হাত লাগাল। ব্যাবিংটন বলল, তার ফারগাছের শাখা থেকে উপহারের প্যাকেট ঋলবে, ভালো করে প্যাক করে আমরা যেন সব রাত্তিরে টেবিলে রেখে যাই। কার উপহার বোঝ যাবে, কিন্তু কে দিচ্ছে বাইরে থেকে বোঝা গেলে চলবে না। যা ববা বা। ঘোষ সাহেব বললে, পড়েছি ব্যাবিংটনের হাতে, খানা তো খানা, আরও কত কী সঙ্গে করতে হয় দেখো। তা যা পারলাম, করলাম।
