শীতকালে আবার সেই সমুদ্রকেই চেনা যাবে না। একেবারে সুনীল জলধি। গুঁড়ি-মেরে-এগিয়ে-আসা নীচু ব্রেকারগুলো নয় নয় করেও কিছু তো থাকেই। না থাকলে মনে হত মানস সরোবর। যেসব ভাগ্যবানরা মানস সরোবরে গেছেন তাঁদের ভোলা ছবিতে এই রকমটাই যেন দেখেছি। দু-এক বছর বাদ বাদই আমরা গোপালপুরে বেড়াতে আসি। গ্রীষ্মেও আসি। শীতেও আসি। উঠি ব্যাবিংটন সাহেবের বাংলোয়। বরাবর। আমরা আসছি শুনলেই উনি বেরহামপুর স্টেশনে শওকতকে দিয়ে জিপ পাঠিয়ে দেন। আরামে চলে আসি।
এই বাংলোর ওপর আমাদের এত ঝোঁক কেন সেটা চট করে এককথায় বোঝানো যাবে না। কারণ বাংলোটা সুন্দর নয়, আধুনিক তো নয়ই। আশেপাশেই কয়েকটা আছে এটার চেয়ে অনেক সুদৃশ্য। ব্যাবিংটন সাহেবের বাংলো পথের শেষে একটা বালিয়াড়ির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। অর্ধেকটা তার বাঁধানো রাস্তায়, অর্ধেকটা বালির আঁটসাঁট উঁচু স্তূপের ওপর। দাঁড়িয়ে আছে বললেও ভুল হবে। হেলে আছে। পেছন দিকে সমুদ্র। এই পেছন দিকটায় বালিয়াড়িটা এমন ক্ষয়ে ক্ষয়ে গেছে যে সমুদ্রের দিক থেকে দেখলে মনে হবে বাড়িটা যে-কোনো মুহূর্তে হুমড়ি খেয়ে পড়বে। কিন্তু পড়ে না তো! ছ-সাত বছর ধরে দেখছি। একই রকম বিপজ্জনক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো কোনোদিন আমরা থাকাকালীনই হুড়মুড়িয়ে পড়বে। তা সত্ত্বেও কী রকম একটা আকর্ষণ আছে বাড়িটার। ভেতরে ঢুকলে মনে হয় পুরোনো ইংল্যান্ডের কোনো পোড়ো কানট্রি-হাউজে এসেছি। ঢুকে পড়েছি ভিন দেশের অতীত ইতিহাসের পোকায় খাওয়া পাতার ভেতরে। সামনের দিকে বেশ বড়ো হাতা, তার একদিকে একটা ছোট্ট আউট হাউজ। হাতাটা ঢালু। শান বাঁধানো হলে কি হবে, বালিতে ভরতি থাকে সবসময়। ধারে ধারে কেয়ারি করা। তেমন কিছু গাছপালা নেই। কে-ই বা যত্ন করবে! তবে বেশ কিছু টবের পাতাবাহার আর ফুলগাছ আছে। এই-ই বাংলোর বাগান।
ঢুকে প্রথমে বাঁদিকে ব্যাবিংটনের নিজের ছোট্ট ঘর। ডানদিকে একটা লাউঞ্জ মতো। সেটা ব্যাবিংটন সাহেবের অফিস। একদিকে ক-টা বেতের চেয়ার। সামনে কাউন্টার। তার পেছনে ব্যাবিংটন সাহেব শর্টস আর আলগা টি শার্ট পরে খুব কায়দা মেরে বসে থাকে। গাবদা একটা খাতা নিয়ে সারা সকাল খুটখাট কাজ করে। কত তো ওর গেস্ট আসছে! কুল্লে ঘর তো তিনখানা। লাউঞ্জ দিয়ে ঢুকতে পেল্লাই একটা হল। তার বাঁদিকে ওই হলের মতোই প্রায় লম্বা আর একটা পেল্লাই ঘর। উঁচুতে বোধহয় বিশ ফুটেরও বেশি। এই ঘরটা ওর চারজনের। তবে দরকার হলে ছ জনের দলকেও অনায়াসেই দেওয়া যায়। দেয়ও। ডানদিকে দুখানা ঘর ডবল বেড। হল পেরিয়ে সমুদ্রের দিকে গেলে আগে একটা টাকা দালান, তার বাঁদিকে রান্নাঘর আর স্টোর। দালানটাতে কিচেন টেবল আছে, আরও নানা খুচখাচ ঘরকন্নার জিনিস। এই দালানটার শেষে বিরাট, মোটা কাঠের দরজা। তার ওদিকে আবার চাতাল। খোলা। মাথার ওপর অর্ধেকটা টালির ছাদ আছে। বাকি সব দিক ভোলা। এইখানে বসে সমুদ্র দেখা যায় অবাধ।
হলটা দারুণ। যেমন লম্বা তেমন চওড়া। মেঝে ভরতি পুরনো দিনের মেরুন রঙের কার্পেট। মাথায় ঝাড়বাতি। যদিও জ্বলে না। একদিকে গ্র্যান্ডফাদার ক্লক। বাজে না। ঠিকঠাক সময়ও দেয় না। কিন্তু চলে। আপন খেয়ালে, সময়ের কোনও তোয়া ক্কা না রেখে টিক-টিক টিক-টিক চলে। হলে ঢুকতেই বড়ো বড়ো গদি দেওয়া সোফাসেট। আর রান্নার চাতালের ধার ঘেঁষে বহুদিন আগেকার ডিমের মতো আকারের বিরাট ডিনার টেবিল। চেয়ারগুলো লাল ভেলভেটের গদি-মোড়া, বাঁকানো পায়ের। পিঠের দিকে বেশ কারুকার্যও আছে। সব আসবাবই সেগুন কাঠের, চকচকে পালিশঅলা, আকারে বড়ো। কাবার্ড, আলমারি সবই। বেমানান খালি একদিকে একটা খুব খুদে ফ্রিজ। আর তার ওপরে টেলিফোন। এই দুটো জিনিস বাদে ঘরখানাতে একটাও এ শতাব্দীর জিনিস নেই, বাজি ধরে বলতে পারি।
ঘরের আসবাবও ওই রকমই। ওয়ার্ডরোব, খাট, দেরাজ-আয়না। শুধু অতিরিক্ত বিছানা দিতে হলে, স্টিল ফ্রেমের ফিতে-লাগানো খাট দেওয়া হয়। ওপরে ডানলোপিলোর তোশক বা গদি যাই হোক।
এখানে বেশিরভাগ বাড়িই পোর্তুগিজ গোত্রীয় সাহেবদের। এটাই বোধহয় একমাত্র কলকাতাইয়া অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানের। অন্তত আমি যদ্দূর জানি। ব্যাবিংটন সাহেবের রং বেশ লালচে ফরসা, অনায়াসেই আসল সাহেব বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। পঞ্চাশের ওপর বয়স মনে হয়, কিন্তু খুব মজবুত শরীর। কটা চুল। পাকা টাকা বুঝি না। সব সময়েই দেখি শর্টস পরে ঘোরে। খালি শীতের শর্টসটা একটু মোটা ধরনের, আর গরমেরটা পাতলা। গরমে অনেক সময়ে খালি গায়েও ঘুরতে দেখেছি।
চব্বিশে ডিসেম্বর পর্যন্ত আবহাওয়ায় শীতের কোনো লক্ষণই নেই। এমনিতেই সমুদ্রের ধারে শীত তত বোঝা যায় না। এবার যেন একটু বাড়াবাড়ি রকমের শৈত্যাভাব। এমনিতে বেশ মনোরম কিন্তু একটু রোদ উঠলেই আর সি-বিচে থাকা যাচ্ছে না। চান করে উঠে আমাদের পাশ দিয়ে যেতে যেতে কুহু আর গোবিন্দ বলতে বলতে গেল, ভাববা তো, পৃথিবীর নানান জায়গায়, এমনকী ভারতবর্ষেও কোথাও কোথাও এখন বরফ পড়ছে! এরা স্বামী-স্ত্রী বোধহয় অল্পদিন বিবাহিত, বিয়ের ঠিক পরেই বেরোবার সুযোগ পায়নি, এখন ক-মাস পরে এসেছে হনিমুনে। আছে আমাদের ডানদিকের ঘর দুটোর একটায়। আমরা ওদের নিজেদের মধ্যে বলি কুহু ও কেকা। খুব একটা ভাব না হলেও কুহুর সঙ্গে মাঝে মাঝে আমার ভালোই কথাবার্তা বিনিময় হয়। বেশ মিশুক মেয়েটা। আরেকটা ঘরে আছেন বি, সেন বলে এই ভদ্রলোক। এঁরও বয়স পঞ্চাশের ওদিকে। কিন্তু নিশ্চয় করে বলাও কিছু যায় না। মাথায় চুল বেশিরভাগই পাকা হলে হবে কি, বেশ তাগড়া চেহারা। হাঁটা-চলা সবল, দ্রুত। থলথলে না হলেও একটু মোটার দিকেই। তামাটে রং গায়ের। খুব শৌখিন। মাথায় বিদেশি ক্রিম-ট্রিম মাখেন বোধহয়, সবসময়ে একটু মৃদু গন্ধ বেরোয়, মনে হয় মাথার চুল থেকেই। গন্ধটা ঠিক ধরতে পারি না। জামাকাপড় জুতো সব ফিটফাট, যখনকার যা তখনকার তেমনটি। সবুজ রঙের সুইমিং ট্রাংক পরে চান করতে নামবেন, বিরাট একটা টার্কিশ তোয়ালে গায়ে জড়িয়ে। বিচ দিয়ে হাঁটছেন দেখব পাতলা লাটখাওয়া ট্রাউজার্স আর আলগা টি শার্ট পরে, পায়ে ক্যাম্বিসের জুতো। আবার সন্ধেবেলায় বসবেন, সুট-টাই হাঁকিয়ে, পালিশ করা কেতাদুরস্ত জুতো। তাই এঁকে আমরা বলি বড়োসাহেব। এঁর কাছে ব্যাবিংটন আপাতত ছোটোসাহেব হয়ে গেছেন। কুহু আর গোবিন্দ বা কুহু ও কেকা যেমনি হাঁসকুটে, গপ্পোবাজ, তেমনি একলফেঁড়ে ওই বি. সেন। কারও সঙ্গেই যেন আলাপ করার গরজ নেই। গতিবিধিও আমাদের সঙ্গে মেলে না।
