বাবা বললেন, আমরা বুড়ো হয়েছি খোকা, আমাদের অবস্থাটার কথা একটু বিবেচনা করো। গলা বেশ গম্ভীর। মা মাথায় কাপড় টেনে বলল, কে এসে বলল বন্ধু, অমনি তুই চলে গেলি! রাত দশটা বেজে গেল। আমরা কেউই এখনও কিছু মুখ দিইনি।
বয়োবৃদ্ধ বাবা-মাদের ভালোবাসার এই একমাত্র প্রকাশ। প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের বাড়ি-ফেরা না-ফেরার সময় নিয়ে অযথা চিন্তা করা। তাঁদের দুশ্চিন্তা হবে বলে তুমি নিয়মমতো বাড়ি ফেরার রুটিন ভঙ্গ করতে পারবে না। রুটিন পালন করতে করতে তোমার জীবনের রস মূল থেকে শুকিয়ে গেলেও না।
রাত-আলোর সবুজ আলোয় বিছানার ওপর পাশ ফিরে কনুইয়ে ভর দিয়ে অনুশীলা বলল, হ্যাঁ গো, দিল্লির চটি আর সালোয়ার-সেট এনেছ? ওপাশ ফিরতে ফিরতে শুভব্রত বলল, হুঁ। অনুশীলা সবুজ-আলোয় স্বপ্নের মৎস্যকন্যা।
আর কার্ডিগ্যান? ওখানে তো ডিসকাউন্ট দেয়।
হ্যাঁ হ্যাঁ—শুভব্রতর গলায় বিরক্তি।
রাগ করছ কেন বাবা? ওখানে কত সস্তায় চমৎকার চমৎকার পাওয়া যায়। তোমারই খরচ কমাচ্ছি।
খরচ কমানোর জন্য খরচ বাড়াবার এই এক চিরকালি ধান্দা এদের। শুভব্রত বলল, চাবিও জানো। সুটকেসের সঠিক অবস্থানও জানো। আমাকে একটু ঘুমোতে দিলে হত না? দুটো বড়ি গিলেছি।
অনুশীলা সঙ্গে সঙ্গে উঠে চলে গেল। বাঁচা গেল। চিত্তটা কি গাঁজা খায়, না সোজাসুজি লোক ঠকায়? কৃষ্ণনগরের বাজার থেকে পছন্দসই কৃষ্ণমূর্তিটা নির্ঘাত হাত সাফাই করেছিল যদি না পুরো গল্পটাই গাঁজা হয়। হনুমান আর গণেশের মূর্তিদুটো সেও শিউরতনকে জব্দ করবার জন্যে নিজের বশংবদ কাউকে দিয়ে সরিয়েছিল তাতে কোনো সন্দেহই অবশ্য নেই। করেছে বেশ করেছে। এন্ডস অলওয়েজ শুড জাস্টিফাই মীনস। শিউরতন লোকটা তো চিরকালের মতো জব্দ হয়ে গেছে! বাস। কিন্তু গল্পের পেছনের আসল গল্পটা বন্ধুর কাছে চেপে যাওয়াটা কি উচিত হল চিতেটার? তা ছাড়া ওই সব গঙ্গা-ফঙ্গা। সেইজন্যেই সন্দেহ হয় চিত্তটা হয় গেঁজেল নয় গুলবাজ। চেহারাটা বেশ সৌম্য-সৌম্য বাগিয়েছে কিন্তু। যেন খুউব শান্তিতে আছে ঘর ভরতি ওই সব পুতুল-ফুতুল নিয়ে।
দারুণ হয়েছে গো শালটা। সেমি পশমিনা, না আসল?—–ও ঘর থেকে অনুশীলার গান গান গলার আদুরে চিঙ্কার ভেসে এল।
চিত্তর দিদির ব্যাপারটা কিন্তু হেভি গোলমেলে। নিজের দিদি নয়, মাসতুতো। চোরে চোরে মাসতুতো একেবারে। নিঃসন্তান, বালবিধবা। এই সব মহিলারা সাংঘাতিক হয়। সেক্স-স্টার্ভড হিস্টিরিক। চিতেটাকে হিপনটাইজ করে রেখেছে কিনা কে জানে? পয়সাকড়ি আছে মহিলার। খালি আপনজন কেউ নেই। চিত্তই একমাত্র আপন। মহিলা যদি ঘোরে ডালে ডালে তো চিতে ঘোরে পাতায় পাতায়। দুজনের মধ্যে রিলেশন ফিলেশন…ওষুধে ঘুমের ঘোর নামছে। একটা ফিনফিনে পাতলা মসলিন কেউ তার চেতনার ওপর টুপ করে ফেলে দিল। তলিয়ে যাচ্ছে এবার। কবোষ্ণ একটা সমুদ্রের মধ্যে মিছরির দানার মতো গলে যাচ্ছে যে সে কি সত্যিই কেউ? কোথাও যাচ্ছিল? তারপর যেতে যেতে…আদৌ কি সে আর কোথাও যেতে পারবে? কে যেন সুখী সুখী মাজা-মাজা চর্চিত গলায় বলে উঠল, তুমি ছিলে কর্মবীর। আজকের এই দিনটিতে গত বছর মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে তুমি আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলে। তোমায় আমরা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করি বাবাই, মোনালিসা, অনুশীলা বাবা ও মা। চমকে খানিকটা ভেসে উঠল সে। মোনালিসার গলা না? সে তা হলে মরে গেছে? সত্যিই তা হলে…বাবা মা সবাই তার শ্রাদ্ধ করছে? কথাটা শ্ৰাদ্ধ না শ্রদ্ধা? কাকে? কারা? আপাদমস্তক ঘেমে পুরোপুরি জেগে উঠল সে। ঢং ঢং করে কোথাও রাত দুটো বাজল। খলবলে পায়ে খাট থেকে হুমড়ি খেয়ে নামল, টেবিলে রাখা বোতল থেকে ঢকঢক করে জল খেয়ে নিল। পুরো আধ বোতল খেয়ে থামল। বুকের মধ্যে জল আটকেছে। ব্যথা। আস্তে আস্তে সেটা নেমে গেল। জানলার ধারে গিয়ে ঠোঁটে একটা সিগারেট গুঁজে দিল। ধরাল না। আকাশটা ঝকমকে কালো। কালীপুজোর রাতে টুনি বালবের মতো তারাগুলো জ্বলছে, নিবছে। সে স্পষ্ট দেখতে পেল তার আকাশে তমিস্রা, তবু জীবনের ঘুড়িখানা মাঝ আকাশ বরাবর টানটান হয়ে উড়ছে। এখান থেকে বেশ লাগছে। সে, একমাত্র সে-ই জানে বড্ড টান। যে কোনও মুহূর্তে ভো কাট্টা হয়ে যেতে পারে। তা যাক। কিন্তু তারপরে? হঠাৎ সে টের পেল দিকচিহ্নহীন মহাকাশের মধ্যে এক ফোঁটা বস্তুবিন্দু তার ওই ঘুড়িখানা গোঁত্তা খাচ্ছে। তার বড্ড বিপদ এবং সে চিত্তর সঙ্গে তার আকাশ বদল করতে চায়। এখন, দমবন্ধকরা গ্রীষ্মের নিদ্রাহীন মাঝরাতে তন্ন তন্ন করে আকাশময় সে আসলে খুঁজছে কোনো মিষ্টিমুখের রাখাল পুতুল, যার বাঁশির আওয়াজে ভয় ভোলা যায়, কিংবা কোনো গৌরকান্তি যোগিনীমূর্তি যে তার বহতা জটাভার মেলে তাকে চমকে দিয়ে বলে উঠবে, উধর মৎ-যাও বেটা, ম্যয় য়হাঁ হুঁ।
প্লুটনিক
শীতকালে বৃষ্টি বড়ো বিরক্তিকর। ঘরে বসে তবু একরকম। কিন্তু বেড়াতে গিয়ে ভোগ করতে হলে সব মাটি। জায়গাটা গোপালপুর। যাকে আগে লোকে বলত গোপালপুর-অন-সি। আমাদের বড়ো প্রিয় জায়গা। গ্রীষ্মে, বর্ষায়, শীতে। সমুদ্রের রূপ এখানে মে-জুন মাসে উত্তাল, দুর্ধর্ষ, জল যেন টগবগ করে ফুটছে মনে হয় একেক সময়।
