শুভব্রত বলল, কী ব্যাপার রে, চিত্ত? এ যে দেখি রীতিমতো নাটক?
চিত্ত নিশ্বাস ফেলে বলল, উনিই আমার মনিব, তোরা যাকে বলিস বস। নানারকম ইলেকট্রিক্যাল গ্যাজেটস-এর এজেন্সি, তা ছাড়াও কাপড়ের দোকান, উলের স্টকিস্ট। আমি ওঁর গ্যাজেটস-এর দোকানে বসি।
বসিস, ভালো করিস। তো আজকের নাটকের ব্যাকগ্রাউন্ডটা একটু খুলেই বল না বাবা।
অনিচ্ছুক স্বরে চিত্ত বলল, তা হলে তো আবার গল্প বলতে হয়।
বল বল, গল্পই বল, খুব দর বাড়াচ্ছিস চিতে!
পুরোনো নাম শুনে চিত্ত হেসে ফেলল বলল, ব্যাপার কিছুই না। যা হয় আর কী! লোকটা প্রতিদিন ক্যাশ মেলাবার সময়ে এসে ঝামেলা করত এ বাঙালিবাবু সোব মালে পক্কা-ক্যাশ মেমো দিবে তো হমার খাতা মিলবে কী করে? বুরবক কঁহাকা! রোজ রোজ।
আমি হিসেবের কারচুপিতে রাজি নই। এদিকে আমার মতো ভালো অ্যাকাউন্টসও ওখানে কেউ জানে না, বিশ্বাসীও না সবাই। একদিন এসে কি করল জানিস? দোকানের সামনের ঝাঁপ পড়ে গেছে, পেছন দিক দিয়ে বেরোচ্ছি দুজনে। শেয়ালের মতো হেসে বললে, চিতরঞ্জনবাবু, কয়েদখানার ভেতরটা দেখিয়েছেন?
আমি বললুম মানে?
মানে আপনি তো কুছ কুছু করে আমার বহুৎ রুপেয় সরিয়েছেন, কয়েদঘর দেখতে হোবে না? সোচুন, সোচে লিন খাতা ঠিক করবেন কি স্বসুরাল যাবেন।
আমি বললুম, আজই আপনার চাকরি আমি ছেড়ে দিচ্ছি।
আসানি কি বাত ক্যা বাবু? লাখো রুপেয়া মারকে ভাগ যানা এতনা আসান? বলে লোকটা চোখ ছোট ছোট করে আমার দিকে চেয়ে রইল। টলতে টলতে বাড়ি চলে এলুম। খেলুম না, দেলুম না। পর দিন জ্বর এসে গেল। অনেক রাতে দিদি মাথা ধুইয়ে দিতে দিতে বলছে শুনলুম, শিউরতনের গণেশ মূর্তিটা নিয়ে এসেছিস বেশ করেছিস। হনুমানটাকেও আনলি না কেন? মাথায় প্রচণ্ড যন্ত্রণা তারই মধ্যে আমি উঠে বসেছি, শিউরতনের গণেশ মূর্তি। আমি আনব কেন? কী যা তা বলছ?
সামনেই তাকের ওপর বসানো গণেশ ওই যে যেটিকে পুজো করে গেলেন শিউরতনজি। ওঁর গ্যাজেটের দোকানে ছিল গণেশমূর্তি, আর কাপড়ের দোকানে হনুমানজি। গণেশটিকে দেখতে গিয়ে হনুমানজিকেও পেলুম। কৃষ্ণমূর্তিটির পেছনে লুকিয়ে ঝুঁকিয়ে বসে আছেন।
আমার যন্ত্রণা তো আরও বেড়ে গেল। সকালেই হয়তো চুরির দায়ে শিউরতন আমাকে অ্যারেস্ট করাবে। দিদি বলল, মূর্তিদুটো তা হলে লুকিয়ে ফেলি। আমি বললুম, না, যেমন আছে, তেমন থাক।
পরদিন বিকেল নাগাদ ঠিক একটা ঝোড়ো কাকের মতো শিউরতন আমার বাড়ি পৌঁছল।
চিত্তরঞ্জনবাবু হমার গণেশজি চোলে গেলো, ইনকম ট্যাকসের ধরপাকড় হচ্ছে বহুত। ডাকু ক্লথ স্টোর্সমে আগ লগাকে ভাগ গিয়া। লেকেন দেওতা তারা লেয়নি। কেন লেবে? মিট্টি কি মুরত, উসমে হ্যায় ক্যা, উন লোগোঁকে লিয়ে?
আমি বললুম, শিউরতনবাবু আপনার দুই মূর্তিই আমার ঘরে, বজরংবলিও। আমি কিন্তু নিয়ে আসিনি। ওই দেখুন।
খুব হম্বিতম্বি করে মূর্তি নিয়ে চলে গেল। পরদিন আমার জ্বর আরও বেড়েছে, দিদি ভীষণ ব্যস্ত, ঘোরের মধ্যে শুনছি ডাক্তার বলছেন, শক ফিভার মনে হচ্ছে, জ্বরটা ভালো ঠেকছে না। ডা, ধরকে কনসাল্ট করুন।…
এমন সময়ে হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকল শিউরতন। আমার অবস্থা দেখে চমকে গেল। খুব নরম সুরে দিদিকে বলছে শুনি, বহেনজি আপ ঘাবড়াইয়ে মৎ ডাগদারবাবুকে হমি গাড়ি ভেজকে ডেকে আনছি। হমারা মূরত ফির কিসনে চোরি কিয়া। বহুত গলত হো গয়া মেরা। যে আদমি, দুসরা খাতা বনাতে হমার পসিনা ছুটিয়ে দিল সে চোরি করবে? বলতে বলতেই শিউরতন দিয়েছে এক দারুণ লাফ। লম্ফ যাকে বলে।
ওই তো হামার মূরত! ঠিক যেখানে আগের দিন গণেশের মূর্তিটি ছিল সেখানে গোলাপি পেটের ওপর সাদা গুঁড়টি গুটিয়ে ভদ্রলোক বসে আছেন। কৃষ্ণমূর্তির পেছনে বীরবাহাদুর হনুমান এক হাতে গদা এক পা তুলে পাশ ফিরে দণ্ডায়মান। ফ্যাল ফ্যাল করে সেইদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শিউরতন আমার দিদির পায়ে পড়ে গেল, তারপর আমার পায়ে।
সেই থেকে ও কারও সঙ্গেই খারাপ ব্যবহার করে না। মুর্তি দুটি আর নিয়ে যায়নি। ফি সপ্তাহের তিন দিন করে পুজো করে যায় এখানে। তা ছাড়া ডেইলি ভোগ পাঠায়। আমাকে রোজ ধরছে ওকে দীক্ষা দেবার জন্যে। কিছুতেই বোঝাতে পারি না আমি কিছুই জানি না। একজন সাধারণ মানুষ। ওর ধারণা আমি ছদ্মবেশী মহাপুরুষ-টুরুষ হব।
শুভব্রত হাসতে হাসতে বলল, আমারও তো তাই ধারণা রে। শাস্ত্রের তেত্রিশ কোটি দেবতা নিজের থেকে যেচে তোর কাছে এসে পড়ছে। বিপদে-টিপদে পড়লে একটু দেখিস বাবা।
চিত্ত বলল, ঠাট্টা করছিস? ঠাট্টা করারই কথা। কেন যে এমন হয় আমি সত্যিই বুঝতে পারি না। কত পুণ্যবান মানুষ আছে জগতে। ছেলেবেলা থেকে মূর্তি দেখতে, গড়তে ভালোবাসতুম। এইটুকুই শুধু…
ঘরের মধ্যে একটি মহিলা এসে দাঁড়িয়েছেন। চিত্তর মতো দশাসই নয়। হঠাৎ দেখলে চিত্তর থেকে বয়সে ছোটো বলে মনে হয়। সাদা ধবধবে সবুজ পাড় একটা শাড়ি পরনে। চিত্ত বলল, দিদি রে শুভ, আমার দিদি। আমার দিদি কথাগুলোর মধ্যে কী যেন ছিল। শুভ উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করল। মহিলার হাতে দুটো থালা, হাসিমুখে বললেন, প্রসাদ খেয়ে নাও।
শুভব্রত শিউরে উঠে বলল, এইমাত্র অত খাওয়ালেন, আবার প্রসাদ?
একজন সিদ্ধিদাতা গণেশ, আরেকজন ভক্তি এবং শক্তিদাতা শ্রীহনুমান। এঁদের প্রসাদে কখনও না করতে আছে! দিদি দুজনের দিকে দুটো পাথরের থালা এগিয়ে ধরলেন। ভদ্রমহিলা ছোটোখাটো হলে কি হবে, বেশ একটা ব্যক্তিত্ব আছে।
