শুব্ৰত হেসে বলল, তুই কি সিদ্ধি-টিদ্ধি খাস না কি বল তো? বরাবরই তুই ছিটে পাগলা। কিন্তু এসব রোগ তো তোর ছিল না?
চিত্ত হাসিমুখে বলল, নাই বা শুনলি এসব গুলগপ্পো। ছেলেবেলাকার মতো আড্ডা মারি আয়।
শুভব্রত নিজের মনের ভেতর খানিক হাতড়ে বলল, প্রোফেশন্যাল টক করে করে ব্রেনের ভেতরটা কী রকম ইয়ে হয়ে গেছে রে চিত্ত। তুই শুরু কর। তুই আজকাল করছিসটা কী? সেই পাকপাড়ার স্কুল?
ছেলেবেলায় যা করতুম তাই। পাকপাড়ার ইস্কুলেও তাই। এখানেও তাই।
অর্থাৎ?
অর্থাৎ আঁক কবছি।
মাস্টারি-ই?
না রে, এক ব্যাবসাদারের গদিতে হিসেবনিকেশ করি।
বড়বাজারি নাকি রে?
হ্যাঁ, কেন বল তো?
ওরা তো সাবর্ডিনেটদের সঙ্গে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করে। শুনেছি চাকরবাকরের মতো দেখে! মনে করিসনি কিছু।
না, মনে করব কেন? তুই তো ঠিকই বলেছিস। করত। আমার মনিবও করত। এখন আর করে না। আমার সঙ্গে তো নয়ই। অন্য কোনো কর্মচারীর সঙ্গেও না।
আগে করত। এখন করে না? শুভব্রত অবাক হয়ে বলল। একটু থেমে ও আবার বলল, খুব ঝেড়ে দিয়েছিলি বুঝি? বেশ করেছিস। এই তো চাই। চিত্ত তোর গায়ের জোরও তো কম ছিল না রে, তেঁতুলবাগানের কুস্তির কথা মনে আছে? সেই গোবরবাবুর ফটো সামনে রেখে একলব্যের মতো…? চিত্ত হাসতে হাসতে বলল, তুই তো কিছুই ভুলিসনি দেখছি।
শুভব্রত বলল, এত যে আমার মনে আছে তাই-ই জানতুম না। ওঃ, সে একখানা সিন করেছিলি তুই, এক-একজন আসছে আর বলছিস, উঠাকে পটাক দেগা! বাপস রে। কতজনকে কাত করেছিলি বল তো?
জনা চার-পাঁচ হবে। ও কিছু নয়। আসলে ওগুলো ছিল কাপুরুষ। না হলে নিরীহ মাস্টারমশাইকে অপমান করে?
কী করেছিল বল তো?
দূর দূর ওসব ছাড়।
তা তোর মনিবকেও কি ওই রকম পটকে দিয়েছিলি নাকি!
দূর দূর তাও কখনও কেউ করে? চিত্ত হাত নেড়ে বন্ধুর কথা একদম উড়িয়ে দিল।
এই সময়ে বাইরে থেকে একটা হাঁক শোনা গেল, বাবুজি! চিতরঞ্জন ভাইয়া!
চিত্ত তাড়াতাড়ি উঠে বাইরে বেরিয়ে গেল। শুভব্রত দেখল রোয়াকের ওপর উঠে আসছেন ফিনফিনে মিলের ধুতি আর সিল্কের পাঞ্জাবি পরা দুধে ঘিয়ে অতিরিক্ত পুষ্ট ধবধবে ফর্সা এক মাঝবয়সি ভদ্রলোক। পেছনে একটি চাকরশ্রেণির লোক। তার হাতে খুঞ্চিপোশ ঢাকা মস্ত থালা। উঠতে উঠতে ভদ্রলোক বললেন, কেতোবার বলিয়েছি চিতজি হামাকে আপনি শিউরতনভাই বলবেন, তো আমি এতো পাপতাপ করিয়েসে যে একঠো বাত রাখতে পারলেন না।
চিত্ত বলল, আগরওয়ালজি আপনি তো বয়সেও আমার থেকে বড়ো। এতদিনের অভ্যাস কী করে ছাড়ি বলুন তো?
হাঁ উমর, উমর। কেতো উমর হামার? চিতজি পিছলে পিছলের সব জনম হিসাব করেন, জরুর দেখবেন আপনি হামার থেকে বোরো আছেন।
শিউরতনবাবু জুতো খুলে উঠলেন। সঙ্গের লোকটি খালি পায়ে এসেছিল, চিত্ত বালতি থেকে মগে করে তার পায়ে জল ঢেলে দিতে লাগল। শুভব্রতর দিকে লাজুক দৃষ্টিতে চেয়ে শিউরতনবাবু বললেন, দেখছেন তো। এ চিতজি বিলকুল পাগলা আদমি আছেন। নোকর উকর কুছু মানবেন না।
ঘরের মধ্যে ঢুকে লোকটির হাত থেকে বিশাল থালাটি নিজের হাতে নিয়ে নিলেন শিউরতনবাবু। বাঁ দিকে একটি তাকের সামনে চলে গেলেন, খুঞ্চিপোশের ঢাকা খুলতেই এক শতাব্দী আগেকার গাওয়া ঘি-এর গন্ধে ঘর ম ম করে উঠল। আড়চোখে চেয়ে শুভ্রত দেখল থালাটি রুপোর, তার ওপর পুরি, কচুরি, লাড়ু, রাবড়ি; এবং আরও নানারকম বস্তু বাটিতে বাটিতে সাজানো। তাকে গণেশের একটি ছোট্ট মূর্তি। এক বিঘৎ মতো। মাটির ওপর শিউরতনের লোক বোধহয় গঙ্গাজলের আছড়া দিল, তিনি থালা নামিয়ে রেখে ধূপ জ্বালিয়ে দিলেন। চিত্ত ইশারা করল। শুভব্রত তার সঙ্গে বাইরে চলে এল। কিছুক্ষণ পর শিউরতনও বেরিয়ে এসে দরজা বন্ধ করে দিলেন। দশ মিনিট চোখ বুজিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, তারপর হঠাৎ জয় রামজি, জয় বজরংবলি, জয় গণেশজি বলে ঘরের মধ্যে ঢুকে গেলেন। পেছন পেছন চিত্ত ও শুভব্রত।
হুমড়ি খেয়ে থালাটায় কী দেখছেন শিউরতন। হঠাৎ আবার জয় বজরংবলি বলে হুংকার দিয়ে উঠলেন।
কী হল? শুভব্রত নিজের অজান্তেই বলে উঠেছে।
গণেশজি কী কিরপা মিল গয়া।
চিত্ত প্রশান্তমুখে বলল, ঠাকুর দৃষ্টিভোগ করেন আগরওয়ালজি। আপনাকে আমি আজও বোঝাতে পারলুম না।
আরে চিতজি। দৃষ্টিভোগ তো জরুর করেন। কিরপা কি লিয়ে কচৌড়ি, মিঠাই, খান ভি কভি কভি। দেখিয়ে লিন লাড়ু সে, জিলাবি সে কুছু কুছু সেবা করিয়েসেন।
শ্যেন দৃষ্টি মেলেও লাড়ু বা জিলাবির মধ্যে কোনো বৈলক্ষণ্য দেখতে পেল না শুভব্রত। শিউরতনের মতে লাড়ুর ওপর বড়ো বড়ো বাদামের টুকরো ছিল ন-টি তিনি স্পষ্ট দেখেছেন এখন আট টুকরো আছে।
ততক্ষণে শিউরতনের লোকটি ভেতর থেকে একটি থালা নিয়ে এসেছে। শিউরতন তার ওপর তুলে দিচ্ছেন কচুরি, লাড়ু মতিচুর রাবড়ি।
চিত্ত অধৈর্য হয়ে বলল, শিউরতনজি আপনাকে কতবার বলেছি প্রসাদ কণিকামাত্রই যথেষ্ট, কেন আপনি এইভাবে…।
হঠাৎ শিউরতন হুড়মুড়িয়ে চিত্তর পায়ে পড়ে গেলেন। গদগদ স্বরে বললেন, বজরংবলির কিরপা মিলল গণেশজির কিরপা মিলল, চিতজি আপনার কিরপা মিলল না এখনও।
করছেন কী করছেন কী ভাইয়া, ইস উঠুন।
সত্যি-সত্যি সজল চোখে উঠে দাঁড়ালেন শিউরতন। বাস আপ নে মু সে ভাই বোলা, তো কিরপা আধা মিলই গয়া।
ভদ্রলোক নোকরের হাতে থালাটি তুলে দিয়ে যেমন এসেছিলেন তেমনিই ফিরে গেলেন।
