কী আর করব, ভাগিয়ে দোব। চিত্তর কথাবার্তা বেশ অসংলগ্ন মনে হচ্ছিল শুভব্রতর।
কিন্তু তার পরেও যদি দেখিস ছেলেটা ঠিক তোর বাড়ি চিনে চিনে এসে হাজির হয়েছে আর জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ পর্যন্ত নিখুঁত ভাবে সেরে ফেলে শুধু তোর একটু মায়া-মমতার আশা করে রয়েছে, তবে?
তা হলে তাকে রাখা যায় বটে। ছোটো ছেলে, সুতরাং কর্পোরেশন স্কুলে লেখাপড়ার একটা ব্যবস্থাও করে দেওয়া যায়।
চিত্ত অন্যমনস্কভাবে বলল, ঠিক। আমিও ঠিক তাই-ই করেছিলুম রে। মাইনে তো নিলই না। স্কুলেও গেল না। যাবার কোনো দরকারও ছিল না।
ব্যাপারখানা কী খুলে বল তো। শুভব্রত লুচিতে কামড় দিয়ে বলল, তারপরেই বলে উঠল, তোর দিদির রান্না বললি না! এটা কি প্রিপেয়ারেশন রে? অদ্ভুত ভালো খেতে তো!
চিত্ত বলল, ভোগ অমনিই খেতে হয় রে শুভ। দিদির বাহাদুরি সামান্যই।
আনমনার মতো হেঁটে হেঁটে চিত্ত ঘরের মাঝখানে একটা কুলুঙ্গির দিকে চলে গেল। কুলুঙ্গিতে একটা কৃষ্ণমূর্তি, নীলচে রং, হাতে বাঁশি। একলা মূর্তি। রাখালবেশী বালক কৃষ্ণ।
চমৎকার না? চিত্ত বলল, এরকম মূর্তি কখনও দেখেছিস?
শুভ বলল, পুতুলটা খুবই সুন্দর, সত্যিই। কৃষ্ণনগরের নাকি রে?
ঠিকই ধরেছিস। চিত্ত বলল, বছর দশেক আগেকার কথা, কেষ্টনগর বেড়াতে গেছি। ঘূর্ণিতে গিয়ে অনেক কিছুর মধ্যে এই মূর্তিটা খুব পছন্দ হয়ে গেল। সঙ্গে ছিলেন তেজেশবাবু আমার এক সহকর্মী। তখন পাকপাড়ার একটা স্কুলে কাজ করতুম। ভদ্রলোক ফিজিক্সের লোক, বললেন, কিনছেন তো অন্য জিনিস কিনুন, পুরনো সংস্কারের ওই সব ভূতগুলোকে আর কিনবেন না চিত্তবাবু। বরং ওই টিকটিকি জোড়া কিনুন। আসলের থেকে তফাত করতে পারবেন? আমি বললুম, আমার ঘরের দেয়ালে টিকটিকির অভাব নেই তেজেশদা। এ পুতুলটা আমার চমৎকার লাগছে। তা আমার গরজ দেখে লোকটা একটা সৃষ্টিছাড়া দাম হেঁকে বসল। রাগ করে চলে এলুম। কলকাতায় ফিরে ভিড়ের মধ্যে দেখি একটা বছর দশ বারোর ছেলে আমার পেছু ধরেছে—বাবু তোমার মোটটা আমায় দাও না। যত বলি মোট কোথায় যে দেব। থাকার মধ্যে তো খালি একটা ব্যাগ বা ঝোলা যা বলিস। ওইটেই নোব। ভাবলুম বোধহয় খুব অভাব, পয়সাটা পেলে ওর উপকার হয়। দিলুম ব্যাগটা। নে বাবা, ব। সেদিনও এমনি জ্যাম। সারাটা পথ হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি। পয়সা দিতে গেলুম, নিল না। বললে, দুটি দুধ-ভাত দেবে? দিদি খেতে দিল ভালো করেই। নিঃসন্তান বিধবা। বাচ্চা ছেলেমেয়ের ওপর একটু অতিরিক্ত মমতাই। তা সেই থেকে ছেলেটা দিদির মন ভিজিয়ে বাড়িতে থেকে গেল। পায়ের কাছে চকচকে জুতো। হাতের কাছে জামা। দিদি কলঘরে থাকতে থাকতেই অর্ধেক রান্না সেরে ফেলে। এদিকে একদম ভদ্রলোকের ছেলের মতো কথাবার্তা টানটোন। দিদিতে আমাতে ঠিক করলুম ছেলেটাকে মানুষ করব। সব ব্যবস্থা করে ফেলে বললুম, কী রে কেষ্টা, তোর তো খুব মাথা। স্কুলে ভরতি করে দিয়ে আসি চল। কী বলল জানিস? ক-দিন পরেই তো বুড়ো হব, তার পরেই পট করে মরে যাব। তোমার ইস্কুল শেখাতে পারবে কী করে বুড়ো-টুড়োনা হয়ে যতদিন ইচ্ছে বেঁচে থাকা যায়? নইলে লেখাপড়া শিখে সেগুলো কাজে লাগাতে না লাগাতেই তো মরে যাব! পাকা পাকা কথা শুনে আমরা ভাইবোন তো হাঁ। পর দিন সকাল থেকেই ছেলেটাকে আর খুঁজে পেলুম না। দিদির সন্দেহ হয়নি। আমার তো পাপ মন। তন্ন তন্ন করে খুঁজে পেতে দেখছি কিছু হারিয়েছে কিনা। যে ঝোলা নিয়ে কেষ্টনগর গিয়েছিলুম সেই ঝোলার ভেতরে দেখি সেই কেষ্টনগরের কৃষ্ণমূর্তি। কী বলব শুভ—এই দ্যাখ আমার গায়ে এখন কাঁটা দিচ্ছে।
শুভব্রতর একবার মনে হল গলা ফাটিয়ে হেসে ওঠে। কিন্তু পরক্ষণে চিত্তর মুখের দিকে তাকিয়ে ও থেমে গেল। তন্ময় দৃষ্টিতে সে কৃষ্ণমূর্তিটার দিকে চেয়ে রয়েছে।
শুভ বলল, ছেলেটা নিশ্চয় পড়ার ভয়ে পালিয়েছে। হয়তো ঘূর্ণি থেকে মূর্তিটা সরিয়ে তোর পেছু নিয়েছিল, অনাথ-টনাথ হবে। তা সেই থেকেই কি তুই ঠাকুরের মূর্তি জোগাড় করে চলেছিস?
চিত্ত বলল, না রে শুভ, একটা মূর্তিও আমি জোগাড় করিনি।
তবে? এই যে তোর দুর্গা, কালী, নটরাজ, সরস্বতী, লক্ষ্মী—এটা কী?
গঙ্গা। মকরবাহিনী, দেখছিস না?
এসব তুই জোগাড় করিসনি?
তুই হরিদ্বারে গেছিস?
একবার গিয়েছিলুম বটে, শুভব্রত বলল।
তুই গিয়ে কী দেখেছিলি জানি না, আমি তো গঙ্গার ঘোলা জল আর গুচ্ছের কুষ্ঠরুগি দেখে দারুণ হতাশ। গঙ্গার ধারেই একটা ধর্মশালায় উঠেছি, দাদা-বউদির হোটেলে দু-বেলা ভাত খাই। আর কখলে রামকৃষ্ণ মিশনের আশ্রমে গিয়ে বসে থাকি। কী রে বোর হচ্ছিস না তো?—চিত্ত হঠাৎ থেমে গিয়ে বলল।
শুভব্রত তখন প্লেটের খাবারের একেবারে শেষাংশটুকু আনমনে চাটছে। কতদিন খেতে বসে আঙুল চাটা, থালা-চাঁছা হয় না। এ-ও ছেলেবেলার এক লুপ্ত স্মৃতি। লুব্ধতার স্মৃতি। যে লুব্ধতা এখন অসভ্যতার নামান্তর। সে বলল—তুই বলে যা চিত্ত আমি ঠিক শুনে যাচ্ছি।
চিত্ত বলল, একদিন ভোরবেলা বেরিয়ে পড়েছি। দারুণ ফর্সা একজন গাড়োয়ালি যোগিনী মতো গঙ্গার ধারে বসে জপ করছে দেখি, ব্রিজটার ঠিক মুখে, আমাকে দেখে বলল, এ বেটা উধর মাৎ যাও। ইধর যাকে গঙ্গাজিকি মন্দির মে পূজা চড়াও! গলায় যেন খানিকটা আদেশের সুর। সত্যি দিন তিন-চার হয়ে গেল এসেছি। গঙ্গামন্দিরের দিকে যাই-ই নি। মহিলা ঝুলি থেকে বার করে ওই মূর্তিটা দিলে, ভালো লাগল মূর্তিটা, দাম জিজ্ঞেস করলুম, বললে, মন্দির সে ওয়াপস আ যাও, পৈসা লে লুঙ্গি। তো ঠিক আছে। গঙ্গামন্দিরে গিয়ে পূজো চড়াব কি মূর্তি দেখে আমি অবাক, অবিকল সেই যোগিনী, ফেরবার পথে মহিলাকে আর দেখতে পাইনি। যে ক-দিন ছিলুম হরিদ্বার চষে ফেলেছি। একদম বাতাসে মিলিয়ে গেলেন ভদ্রমহিলা।
