রিকশাওলা চলছে। রেলগাড়ির ইঞ্জিনের পিস্টনের মতো তার কনুই দুটো তালে তালে সামনে পেছনে সামনে পেছনে সরছে। ঘাম চকচক করছে। ফুলে ফুলে উঠছে পেশিগুলো।
চিত্ত বলল, দেখেছিস? দেখেছিস? অপূর্ব না? ভাস্করদের সাবজেক্ট রে। আমাদের মেঠো চোখ আর কী দেখছে!
শুভব্রত হেসে বলল, তুই এখনও তেমনি পাগলা আছিস চিত্ত। আঁকিস-টাঁকিস আজকাল?
চিত্ত কিছু বলল না। হাসিমুখে চুপ করে রইল।
কতকগুলো জিনিস মানুষ কখনই ভোলে না। কেমন করে কে জানে ঠিক স্মৃতিতে থেকে যায়। চিত্তর পাশাপাশি চলতে চলতে সেই কথাগুলো এখন এমন জীবন্তভাবে মনে পড়ল শুভব্রতর যেন গঙ্গার পুলের তলা দিয়ে পঁচিশ বছরের জল গড়িয়ে যায়নি।
চিত্তটা অঙ্কর খাতায় সব সময়ে একটা কাঁটালি চাঁপা ফুল রেখে দিত। খানিকটা করে অঙ্ক কষবে আর ফলের গন্ধ শুকবে। জিজ্ঞেস করলে বলত, বুদ্ধির গোড়ায় ফুলের গন্ধ দিচ্ছি। আঁকগুলো কীরকম সুড়সুড় করে বেরিয়ে আসে দ্যাখ না।
সত্যিই! জিওমেট্রিতে এঁটে উঠতে পারত না বলেই চিত্তটা শুভব্রতর থেকে কম নম্বর পেত অঙ্কে। আঁকার সুযোগ পেলেই ও নানারকম কারিকুরি করবে। করবেই। ডায়াগ্রামের চারপাশে শেড দেবে। কোথাও গাঢ়, কোথাও হালকা। তলার লেখাগুলো সব বাহারি। প্রত্যেকবার অঙ্কের মাস্টারমশাই ওর কান ধরে দাঁড় করিয়ে দেবেন বেঞ্চে। তবুও ও করবেই। তা ছাড়া যা দেখবে তাই আঁকবে। ক্লাসঘরের জানলার পাটে বসে একটা দাঁড়কাক বিশ্রী স্বরে ক ক করত। তাকে সুষ্ঠু এঁকে ফেলল ঠোঁটের ভেতরকার লাল সমেত। তার সেই ঘাড় বাঁকানো ভঙ্গিতে একচোখো তাকানো দেখে ক্লাসসুষ্টু ছেলের কী হাসি!
চিত্ত বলল, নাম। দে ব্রিফকেসটা আমার হাতে দে তো। তড়াক করে অনায়াসে নেমেছে ও। শুভব্রতর একটু কষ্ট হয়। প্রথমত অনভ্যাস, দ্বিতীয়ত ভুঁড়িটা ঘনত্বে, বেড়ে গেছে বেশ, তৃতীয়ত হাঁটুতে আজকাল একটা খচখচে ব্যথা হচ্ছে।
সরু গলির মধ্যে হলেও চিত্তর বাড়িটা দেখা গেল খুব প্রশস্ত এবং পরিচ্ছন্ন। এসব অঞ্চলের রাস্তাঘাট যে রকম একটা ঘিনঘিনে নোংরা হয় সেরকম নয় মোটেই। বেশ বড়ো উঠোন তার চারদিক ঘিরে রোয়াক। উঠোনময় প্রচুর টবে ফুলগাছ। প্রত্যেকটা টব চকচক করছে। শুভব্রত চিত্তর বাড়িতে ঢুকেই যেন একটা ডুব দিল। দু-হাতে জল সরিয়ে সরিয়ে, জল সরিয়ে সরিয়ে ঝপাৎ করে ডুব। সময়ের লহরিমালার অভ্যন্তরে কোথাও বুঝি মানুষের জীবনের পুরোনো সময় টিকে থাকে। আসলে ওরা দুজনেই এক গ্রামের ছেলে। শহরতলির গ্রাম। শুভব্রতদের ছেলেবেলায় সেসব গ্রাম খুব এঁচড়ে পক্ক হয়ে ওঠেনি। সারা গ্রীষ্ম
রোদ্দুরের গন্ধ, জ্বলন্ত আকাশের গন্ধ ঠান্ডা জলের গন্ধ আর ফুলের গন্ধে টইটম্বুর হয়ে থাকত সেই শহরতলির গ্রাম। সিনেমার পোস্টার, ফিলমি গানের ঘেয়ো ককুর তখনও তার সর্বাঙ্গে চাটেনি। সেইসব ফুলের গন্ধ চিত্ত তার উঠোনে কোনো আশ্চর্য জাদুতে জিইয়ে রেখেছে। শুভব্রত মেশিন পার্টস চিনেছে চিরকাল, ফুল-টুল অত চেনেনি, বিশেষত দেশি ফুল। কিন্তু ফুলের গন্ধ তার সমস্ত চেতনা ছেয়ে আছে।
জুতোটা এখানে খোল শুভ, দাঁড়া একটা টুল এনে দিই…চিত্তর গলার স্বরে সে চমকে উঠল।
রোয়াকের এক কোণে জুতো আর মোজা খুলে ঘরে ঢুকল শুভ। এবং সঙ্গে সঙ্গেই আবার চমকে উঠল। চিত্তর ঘরের দেয়ালে দেয়ালে কুলুঙ্গি খুপরি, কাঠের তাক, এবং সর্বত্র পুতুল। ঘরটা ধূপের ধোঁয়ায় আবছায়া, বাইরের ফুলের গন্ধ এখানে চার দেয়ালের মধ্যে আরও প্রবল। ফুলদানিতে, গেলাসে, বোতলে, রেকাবিতে সর্বত্র ফুল। একটা নীচু তক্তপোশে তাকে বসিয়ে চিত্ত বলল, দাঁড়া আসছি। সিগারেট খাসনি ভাই প্লিজ।
সিগারেট খাওয়ার অবশ্য কোনো প্রশ্নই নেই। ডায়াবিটিসের সঙ্গে হাই প্রেশার। ডাক্তার একদম ত্যাগ করতে বলেছেন। তবে ধীরে। এখন দু-বেলায় দুটো এসে দাঁড়িয়েছে। খাওয়ার পর একটা করে ধরায়। ওই ধরানোই। কিং সাইজ সিগারেট আঙুলের ফাঁকেই ছাইয়ের স্তম্ভ হতে থাকে। দু-একটা টান দেয় কী না দেয়। ঘরে ঢুকল চিত্ত এক হাতে থালায় প্রচুর খাবার, আরেক হাতে চা। বলল, ওই টুলটা টেনে নে না ভাই!
শুভব্রত বলল, খিদে পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু এত খাবই বা কী করে আর জোগাড়ই বা করলি কোথা থেকে? তুই একা দোকা তা-ই তো এখনও বুঝতে পারলুম না রে!
চিত্ত হেসে বলল, খিদে পেয়েছে, খেয়ে নিবি, ফুরিয়ে গেল। মেয়েদের মতো তা না না করিসনি তো! এই সব লুচি আলুরদম ঘুগনি সব আমার দিদির হাতে করা, দোকানের নয় একটাও। তা ছাড়া স-ব ঠাকুরের ভোগ। খা।
ঠাকুরের ভোগ? কী ব্যাপার বল তো?
চিত্ত হাতটাতে ঘরের চারদিকে ঘুরিয়ে এনে বলল, এই তো সব ঠাকুর। আমরা যা কিছু খাই, খাওয়াই স-বই দেবতার ভোগ রে শুভ, আলুটালু কিছুই খেতে দ্বিধা করিসনি।
শুভব্রত বলল, বলিস কী? আমি এক্ষুনি ভাবছিলুম এত পুতুল তুই জোগাড় করলি কোত্থেকে! এসব শখ তো মেয়েদের থাকে বলেই জানতুম।
চিত্ত রহস্যের হাসি হেসে বলল, পুতুলই বটে! মিথ্যে কিছু বলিসনি। আর শখের কথা বলছিস! দু-চারটে আমার কিংবা দিদির কেনা। বাস।
বাকিগুলো? সব গিফট?
চিত্ত বলল, ধর যদি রাস্তায় একটা ছোট্ট অনাথ ছেলে এসে তোকে আশ্রয়ের জন্যে ধরে, আর ধর তোর সংসার বলতেও কিছু নেই, অভাব বলতেও কিছু নেই। তুই কী করবি শুভ?
