শুভব্রত সরকার একটা সাংঘাতিক সুখী মানুষ। বন্ধুদের ভাষায় লাকি গাই সুন্দরী শান্ত স্বভাবা স্ত্রী। দুটি ছেলে মেয়ে পৃথিবীর যেখানে যা বিদ্যে আছে সব আয়ত্ত করার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে। একটি বাবা, একটি মা। এখনও চোখ কান হাত-পা বজায় আছে। নীচের তলায় বিশ্বাসী কাজের লোকসহ বাস করছেন। আলাদাকে আলাদাও হল আবার যৌথকে যৌথও। রবিবার-রবিবার খাবার টেবিলে সবাই একত্র। অফিস-অতিথি না থাকলে। সকালে লাফ মেরে মেরে অফিস বেরোবার সময়ে দুর্গা নামও রোজ শোনা হচ্ছে মায়ের মুখে। খবরের কাগজের আবড়াল থেকে বাবার সাবধানে চোলো, যেন শুভব্রত চলে! সে যে সদা সর্বদাই চালিত হচ্ছে, বাবা কী জেনেও জানেন না! সকাল আটটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত চেন-রিঅ্যাকশন। একটা নিউট্রন গিয়ে আরেকটা নিউট্রনকে ধাক্কা মেয়ে যাচ্ছে, সে আবার আরেকটাকে, এইভাবে চলল। জনগণের মঙ্গল হচ্ছে। বাড়ি হচ্ছে, গাড়ি হচ্ছে, শাড়ি, রকমারি পোশাক, বিউটি পার্লার এয়ারকুলার, অ্যাক্রিলিক পেন্ট, ভি সি আর সব হচ্ছে। তোমার কী হচ্ছে? তুমি মানুষটি আসলে আর মানুষ নেই। নিজেই জানো না। জাপানি রোবটে পরিণত হয়েছ। তোমার সুখ বলতে চায়ের রংটা ঠিক হয়েছে কি না, শান্তি বলতে ভেড়া গুনতে গুনতে রাত আড়াইটের ঘুম এল কি না, আহ্লাদ বলতে এক পাত্র মদিরার কৃত্রিম স্নায়বিক উত্তেজনা।
মাসকয়েক আগে স্কুলের বন্ধু নিখিলেশের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। সে-ও এসপ্ল্যানেড অঞ্চলে ছুটোছুটির মাঝখানে। বলল, চল না—একটু কফি হাউসে বসা যাক। মাস্টারমশাইদের স্ট্রাইকে লাগাতার ছুটি। তোমার আর কী শালা। এদিকে আমি শুভব্রত সরকার আসলে আমার ওপর-আলাদের বাজার সরকার। সময় নেই। শুনে নিখিলেশ বলল, খাসা আছিস সত্যি। বলতে বলতে সিগারেটের প্যাকেটে আঙুল ঠুকতে ঠুকতে মহা-আনন্দে কফি হাউসের দিকে চলে গেল। সময় না থাকাটা যে কী করে খাসা থাকার লক্ষণ হতে পারে শুভব্রতর মাথায় আদৌ আসে না। সিগারেটের প্যাকেটে টোকা দিতে দিতে কফি হাউসের দিকে চলে যাওয়াটা, যেতে পারাটা বরং তার কাছে ঈর্ষণীর সৌভাগ্যের লক্ষণ বলে মনে হয়।
আরে, শুভ না? সামনে দাঁড়িয়ে কালো দাড়ি-অলা ফর্সা রং হাফ-পাঞ্জাবি পরা এক হৃষ্টপুষ্ট সৌম্য চেহারার ভদ্রলোক যাঁকে শুভব্রত কস্মিনকালেও দেখেনি। আপাদমস্তক দেখে নিয়ে অগত্যা সে আমতা আমতা করল, আপনাকে তো ঠিক…
হাসিমুখে ভদ্রলোক নিজের দাড়িটা চেপে ধরে উজ্জ্বল চোখে শুভব্রতর দিকে চেয়ে রইলেন।
আরে তাই বল, চিত্ত? জববর দাড়ি রেখেছিস তো? শুভব্রত এগিয়ে গিয়ে বন্ধুর কাঁধে হাত রাখল।
দাড়িতে মুখের চেহারা কীভাবে পালটে দেয় দ্যাখ, সাধে কি আর ক্রিমিনালরা দাড়ি রাখে? তা তুই এখানে কোত্থেকে?
গঙ্গায় চান করে ফিরছি! ইঙ্গিতে চিত্ত হাতের পুঁটলিটা দেখাল।
গঙ্গাচ্চান, এই সন্ধেবেলায়? শুভব্রতর মুখ হাঁ।
চিত্ত হেসে বলল, মুখটা বুজিয়ে ফেল, আরশুলো ঢুকে যাবে, তুই জ্যামে পড়ে গেছিস মনে হচ্ছে!
গাড়িটার দিকে হাত দেখিয়ে শুভব্রত বলল, তাই তো দেখা যাচ্ছে!
নটা সাড়ে নটার আগে এ জ্যাম ছাড়বে বলে মনে হচ্ছে না রে? কোত্থেকে আসছিস?
আরে দিল্লি থেকে। গাড়ি স্টেশনে নিতে গিয়েছিল, তারপর এই।
বলিস কী? তুই ট্রেন-জার্নি করে এসে এইভাবে জাঁতাকলে পড়ে আছিস? আয়, আয়, আমার সঙ্গে আয়। তোর কি নিজের গাড়ি না কোম্পানির?
ওই হল।—শুভব্রত বলল।
ছেড়ে দে। চলে যেতে বল সময় মতো। তোর লাগেজও যাক। তুই আমার বাড়িতে একটু বিশ্রাম-টিশ্রাম করে যাবি এখন।
কোথায় তোর বাড়ি?
আরে এই তো কাছেই, হ্যারিসন রোড ধরে যাব, চিৎপুরের কাছে। একটা রিকশা নিয়ে নেব এখন, আয় তো!
শুভব্রত এক মুহূর্ত চিন্তা করল। প্রচণ্ড রকম ডায়াবিটিক শরীর। ঝিমঝিম করছে এখন। প্রেশারও আছে। সত্যি-সত্যিই পারা যাচ্ছে না।
ড্রাইভার মদন পাশে দাঁড়িয়ে কথাবার্তা শুনছিল। শুভব্রত ফিরে দাঁড়িয়ে বলল, কী মদন? আমি তা হলে চলেই যাই! তুমি লাগেজ পৌঁছে দিও।
মদন বলল, ঠিক আছে সার। ঠিকানাটা বলে দিন। জ্যাম ছাড়লে আমি একবার ট্রাই করতেও পারি।
তার আর দরকার হবে না। শুধু শুধু আবার একগাদা ঘুরতে হবে তোমার। তুমি চলে যেও।
দরকারি কাগজের ব্রিফকেসটা শুধু হাতে তুলে নিয়ে শুভব্রত চিত্তকে বলল, চল।
চিত্তর মুখটা দেখে মনে হল যেন হাতে চাঁদ পেয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুর হাত থেকে ব্রিফকেসটা একরকম ছিনিয়ে নিয়ে সে স্ট্যান্ড রোড পার হয়ে একটা রিকশা ধরলে। রিকশাওলা দেখা গেল ওকে চেনে। রাস্তা পার হতে না হতেই ঠুনঠুন করতে করতে এগিয়ে এল। মুখে কৃতকৃতার্থের হাসি। জ্যামের মধ্যে দিয়ে পথ কেটে যেতে কোনো আপত্তিই নেই।
রিকশায় উঠতে উঠতে শুভব্রত বলল, মানুষের কাঁধে চড়তে আমার কেমন ইয়ে লাগে রে চিত্ত!
চিত্ত হেসে ফেলে বলল, মানুষের কাঁধে তো মানুষই চড়ছে রে বাবা, যন্ত্র তো আর চড়েনি! নে, তোদের এই পুতুপুতু ভাবটা ছাড় তো। যে সিস্টেম আছে ওরা এই করেই তো ওদের খেতে হবে। তুই না চড়লে আরেক জন চড়বে। তোর চেয়েও মোটা। ওর আরও কষ্ট হবে তখন। তা ছাড়া একটা গরিব মানুষের সম্মানের রোজগারে তোর অবদানটুকু থাকবে না!
সবই জানি, তবু…
সবই যদি জানিস তো আর দ্বিধা করিসনি। কেমন সুন্দর ফুরফুরিয়ে হাওয়া দিচ্ছে দেখ তো! রিকশায় উঠলে যেমন হাওয়া পাওয়া যায় অন্য কোনো যানে তেমন যায়? আর দ্যাখ দৌড়োনার কায়দাটা। লোকনৃত্য করছে না রিকশা চালাচ্ছে বোঝা যায়! সাক্ষাৎ নটরাজ মহাদেবের শিষ্য সব।–চিত্ত সামান্য একটু ঝুঁকে বসল।
