অনুকে কাঁদতে দেখে, মাতাজি বললেন, ঠিক আছে, আপনাদের জন্য আমি একটা কাজ করছি। এ ঘরে আপনারা বসুন, ঘরটা আমি অন্ধকার করে দিচ্ছি। ওদিকের চৌকো জানলাটা দেখছেন, ওর পেছনে দালান। ওই দালান দিয়ে আমি মহিলা আবাসিকদের পাস করাব। প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ এইভাবে আপনারা গুনবেন। ঠিকজনকে চিনে নেবেন, তারপরে আমি ওঁকে আনিয়ে দেবার ব্যবস্থা করছি।
বাইরের জানলাগুলো বন্ধ করে দিলেন মাতাজি। ভেতরের জানলাটা খুলে দিয়ে চলে গেলেন।
একটু পরে জানলার ওপাশে আইডেনটিটি প্যারেড শুরু হল। প্রথম জন, মাথার চুল কদম ছাঁট, সাদা কালো, মুখ ঈষৎ কুঁচকোনো, না কালো না ফর্সা। দ্বিতীয় জন—মাথার চুল ঘাড় অবধি সাদা-কালো, কুঁচকানো মুখ, না কালো, না ফর্সা। তৃতীয় জন মাথার চুল কদমছাঁট সাদা, কুচকোনো মুখ, না ফর্সা, না কালো। এইভাবে তেরোজন হয়ে গেল, শোভাযাত্রা থামল। একটু পরে মাতাজি ঘরে ঢুকে বললেন, দেখছেন? বলুন কোনুজন?
দীপু বলল, কে আবার! প্রথম জন!
অতীশ বলল, যাঃ, তৃতীয় জন। চুলগুলো একেবারে পেকে গেছে বলে বুঝতে পারিসনি।
অনু বলল, আমি শিওর পঞ্চম জন।
মাতাজি বললেন, সে কি? আপনাদের আপনজন, পিসিমা বলছেন, চিনতে পারছেন না? আচ্ছা আমি এই তিনজনকেই আলাদা আলাদা করে জিজ্ঞেস করে আসছি তিনি রুচিশীলা দেবী কিনা। যদিও, আবার বলছি—এটা আমাদের নিয়ম নয়।
পাঁচ মিনিট পরে ফিরে এসে মাতাজি বললেন, ওঁদের কারুর নামই রুচিশীলা নয়। প্রথমজনের নাম জানকিবাই-উনি বিহারি। তৃতীয় জন ফতিমা বেগম বুঝতেই পারছেন বাঙালি মুসলমান। আর পঞ্চম জনের নাম শুদু বুঢ়িয়া, ও একটি ভিখারি-বস্তিতে থাকত, কখনও নামকরণ হয়নি, হয়ে থাকলেও ভুলে গেছে, ওকে আমরা ধরিত্রী বলে ডাকি। আপনারা এক কাজ করুন, আপনাদের পিসিমার একটা সাম্প্রতিক ফটো, তাঁর চেহারার সঠিক বর্ণনা, আর কিছু আইডেনটিফাইং মার্ক দিন। তারপর দেখছি কী করা যায়।
তখন অতীশ, দীপু ও অনু নিজেদের মধ্যে অনেক আলোচনা করে দেখল—গত দশ বছরে কোথাও, কোনো উপলক্ষ্যে পিসিমার কোনো ফটো তোলা হয়নি। এবং তাদের পিসিমা খুব রোগাও না, কালোও না, ফর্সাও না, চুল পুরো পাকা না, আবার পুরো কাঁচাও না, দাঁত যে সব গোটা তাও না, আবার সব যে পড়ে গেছে তা-ও নয়, তিনি খুব বুড়োও নন, আবার কম বুড়োও নন, আসলে তাঁর কোনও পরিচয়চিহ্ন নেই। তিনি আসলে শুধুই একজন পিসিমা। অগণ্য পিসিমার মধ্যে একজন। কারো মা নয়, বাবা নয় শুধুমাত্র পিসিমা।
পৌত্তলিক
গাড়ি থেকে নেমে শুভব্রত টাইয়ের গিঁটটা আলগা করে নিল। এই এক গেরো। দেশটা গ্রীষ্মপ্রধান। কণ্ঠবন্ধনী-পরা সাহেবরা বিদায়ও নিয়েছে প্রায় পঁয়তাল্লিশ। বছর। কিন্তু এই ভাদুরে গুমোটেও সিনিয়র এগজিকিউটিভকে সেই সাহেবদের বেঁধে দেওয়া নেংটিটি গলায় বাঁধতেই হবে। একেই বোধহয় বলে গলায় গামছা বেঁধে ধরে আনা। এদিকে সামনে লম্বা দুটো ঝুমঝুমি সাপ। একটি আপ একটি ডাউন, মাঝে মধ্যে আরও কিছু-কিছু ঢুকে পড়েছে। থেকে থেকেই হর্নের প্যাঁ পোঁ এবং বিষাক্ত নিশ্বাস। পেছন দিকে সেই ঝুমঝুমি সাপ বোধহয় কোনো বহুপুচ্ছ— পৌরাণিক সরীসৃপে পরিণত হয়েছে। স্ট্র্যান্ড রোড। কলকাতা শহরের বিখ্যাত জ্যাম। ফল-ফুলুরির জ্যামের থেকে এই জ্যাম এখানে অনেক সস্তায় মেলে। একেই অনেকে বাসে-ট্রামে জাম্প বলে থাকেন। জাম্পই বটে। রামভক্ত বজরংবলির মতো একখানা জগঝম্প লাফ না দিলে এই জ্যাম থেকে উদ্ধার পাবার কোনো সম্ভাবনাই নেই। তারই মতো বহু অভাগা গাড়ি-ট্যাক্সি-বাস থেকে নেমে দাঁড়িয়ে উদ্বিগ্ন চোখে সরীসৃপের খাঁজ খোঁদল পরীক্ষা করছে, যদি কোনো ফোকর দিয়ে কোনো ফিকিরে বেরিয়ে যাওয়া যায়। ঘাড় আর গলার মধ্যে ঘাম আর ময়লা জমে কুটকুট করছে। রুমাল চালিয়ে বেশ খানিকটা হিউম্যান কাদা মুছে ফেলে দাগি রুমালটার দিকে ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল শুভব্রত।
শফার বলল, একটু হাওয়া খেয়ে উঠে পড়ন সার। এখান থেকে নিউ আলিপুর তো আর হেঁটে যেতে পারবেন না! যখন জাম ছাড়বে, তখন যাবেন।
না, হেঁটে যাওয়া সম্ভব নয়। বছর কুড়ি আগে হলে দুর্গা বলে নেমে পড়া যেত। কিন্তু এখন আর হয় না। তা ছাড়া লাগেজ রয়েছে। সামান্য হলেও লাগেজ। এবং অফিসের কিছু জরুরি কাগজপত্তর। দিল্লি থেকে অনেক যত্নে সঙ্গে করে বয়ে আনা। লাস্ট মিনিটে পিএ গদাধর রাজধানীর টিকিটটি হাতে ধরিয়ে দিল। আকাশের টিকিট মেলেনি। ট্রেনজার্নির সময়টুকু বাদে ঠিক দুদিন হাতে। তারই মধ্যে নিজেদের অফিসের ব্রাঞ্চ, মার্কিন এমব্যাসি, কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রমন্ত্রীর দপ্তর। আগস্ট মাসের গরমে এই প্রাণান্তকর ছুটোছুটির পর ট্র্যান্ড রোডে কালো জাম। ড্রাইভার-কর্তৃক হেঁটে নিউআলিপুর যাবার প্রচ্ছন্ন পরামর্শ। স্বভাবটা আদৌ রাগি না হলেও শুভব্রতর গায়ের মধ্যে নানান জায়গায় কেমন চিড়বিড় করতে লাগল। একেই বোধহয় বলে গায়ের ঝাল! আচ্ছা একখানা জীবন! সেই ইনফ্যান্ট ক্লাস থেকে ফার্স্ট হতে হতে আসছে। প্রতি বছর ফার্স্ট প্রতি বছর দুশ্চিন্তা–পরের বছরও হবে তো! ক্লাসটিচার প্রোগ্রেস রিপোর্টটা হাতে তুলে দিয়ে চিৎকার করে বলতেন আসছে বছর…। ছেলেরা সমস্বরে স্লোগান দিত আবার হবে। সেই আবার হবে এম-টেক অবধি গড়াল। গড়াবার মূল্যস্বরূপ গেল রাতের ঘুম, দিনের শান্তি। বন্ধুবান্ধব যখন হইহই করে আড্ডা মারছে, সিনেমা দেখছে, ফার্স্ট বয় তখন আসছে বছরের জন্যে মুখ গুঁজে টেবিলে। রাত-আলো ভোরের আলোয় মিলিয়ে যাচ্ছে। শেষ ডিগ্রিটার পরে দম ফেলতে না ফেলতেই পাঁচ হাজারি মনসবদার। তারপরেই গুরুজনেরা উলু-উলু করে গলায় লটকে দিলেন একটি সালংকারা ঢুলুঢুলু চোখ সলজ্জ নায়িকা। নায়িকা খোলসা করে কিছু বলেন না, খালি আভাসে ইঙ্গিতে জীবনযাত্রার মান বাড়িয়ে চলেন। একমাত্র ছেলেটাকে কোনোমতেই দার্জিলিং সেন্ট পলের কমে দেওয়া গেল না। মেয়েটাও মুসৌরি। বিয়ের পরে কাশ্মীরে হনিমুন ছিল। ডাল লেকে নারী জলের শোভা দেখতে দেখতে কণ্ঠলগ্না হচ্ছেন, অঙ্গে নিত্যনতুন কাশ্মীরি শাল, আর তুমি ভাবছ ট্রাভলার্স চেকগুলো তো ফুরিয়ে এল। আর কলকাতায় ফেরার পর দিনই সাইট দেখতে মধ্যপ্রদেশে পাড়ি দিতে হবে।
