দীনু এসে বলল, টাকা দিন কিছু, বাজার আনি। কেরোসিনেরও ভাঁড়ে মা ভবানী। সে-ও কিনতে হবে।
দুম করে লোডশেডিং হয়ে গেল। উঠোনে শ্যাওলা, তুলসী গাছটা বিরাট ঝাড় হয়ে উঠেছে, তাকে আর ঠাকুর-দেবতা মনে হচ্ছে না, মনে হচ্ছে উড়নচণ্ডী রাক্ষুসি।
অতীশ বলল, সাবধানে বাথরুমে যাস দীপু, উঠোনটা একেবারে… আমি তো পড়ে গিয়ে যা কেলো…উঃ।
দীনু বলল, পিসিমা থাকলে এসব কিছু ভাবতে হত না, দাদা। অন্নপুন্নোর ভাণ্ডার। বাড়িতে লক্ষ্মী অষ্টপহর জ্বল জ্বল করছেন। শ্যাওলা উঠোন, আঁধার-বাড়ি এ আমি আমার জন্মে কখনও দেখিনিকো।
অতীশ ধমক দিয়ে বলল, যা যা তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা কর। বেশি আর লেকচার দিসনি। তোর আবার জন্ম। এ বাড়িতে কদিন আছিস? পাঁচ বছর না সাত বছর?
দীনু বলল, যাঁহা পাঁচ তাঁহাই সাত, ধরুন না গিয়ে দাদাবাবু।
আলো এলে একটা টেলিগ্রাম, আর একটা কিউ এম এস লেখা অন্তর্দেশীয় পত্র অতীশ দু বোনের হাতে তুলে দিল।
টেলিগ্রামটা অনীশের। অতীশের দুর্গাপুরের ঠিাকানায় করা।
অ্যাম ট্রানসফার্ড টু ডেলহি। সেন্ড পিসিমা শার্প বাই দা নেক্সট রাজধানী। অ্যাওয়েটিং ইনফর্মেশন—দাদা।
ইতুর চিঠিটাও দুর্গাপুরের ঠিকানায়। লিখেছে অতীশ-শুক্লাকে।
প্রিয়, মেজদা-মেজবউদি,
পিসিমাকে বৃদ্ধাবাসে পাঠবার প্রস্তাবটা আমাদের গোড়ার থেকেই ভালো লাগেনি। কিন্তু আমি একে সবার ছোটো, তার পরে শ্বশুরবাড়িতে পরিজনও অনেক। তোমাদের জামাই একে মুখচোরা, তায় সেও বাড়িতে সবার ছোটো। আমার পক্ষে পিসিমার কোনো ব্যবস্থা করা নিতান্তই অসম্ভব। কিন্তু যখন থেকে শুনেছি পিসিমাকে এমন জায়গায় রাখা হয়েছে যেখানে দেখতে যাবার পর্যন্ত অনুমতি দেয় না, তখন থেকেই আমার প্রাণ কাঁদছে। এখানে এসে তোমাদের জামাইয়ের সঙ্গে অনেক আলোচনার পর একটা লিগ্যাল পয়েন্ট আবিষ্কার করলুম। পিসিমা বাবার সৎ-বোন হলেও, একই বাবার সন্তান। এবং শ্রীরামপুরের—গ্রেস ডেল বাড়ি বাবা একটু-আধটু বাড়ালেও ঠাকুর্দারই করা। সেই হিসেবে কিন্তু বাড়ির অর্ধভাগ পিসিমার প্রাপ্য হয়। বাকি অধভাগকে পাঁচ ভাগ করে আমরা পাঁচ ভাইবোন নিতে পারি। সেক্ষেত্রে পিসিমাকে আমরা যতটা অসহায় মনে করছি ততটা তিনি নন। বাড়ি বেচে হয় তোমরা পিসিমাকে তাঁর প্রাপ্য টাকায় একটা যথার্থ ভালো প্রতিষ্ঠানে রাখো, যেখানে তাঁকে আমরা দেখতে যেতে পারব, এবং প্রয়োজন হলে নিজেদের কাছে এনে রাখতে পারব। আর তা যদি না হয়, পিসিমা অবলা বলে তাঁকে যদি তোমরা বঞ্চিতই কর, তা হলে আমার ভাগটা আমি দিয়ে দিচ্ছি, তা দিয়েও পিসিমার অনুরূপ ব্যবস্থা হতে পারে। সাত কাঠার কাছে ভদ্রাসন আমাদের। পাঁচ ভাগের এক ভাগ তো লাখখানেক টাকা হবেই! ভালোবাসা জেনো।
ইতি
তোমাদের ইতু
চিঠিটা পড়া হয়ে গেলে দীপু বলল, সত্যিই তো, মেজদা আজকালকার আইনে পিসিমারও তো একটা ভাগ থাকার কথা। এটা তো আমাদের কারো মনে হয়নি। তোর হয়েছিল?
অতীশ বলল, অনেস্টলি বলছি দীপু হয়নি।
বহু রাত পর্যন্ত তিনজনে পরামর্শ হল। মাঝে দীনু দোকান থেকে অখাদ্য রুটি তড়কা এনে দিল। কেরোসিন পাওয়া যায়নি। চারজনের রান্নায় দীনুর খুব একটা উৎসাহও দেখা গেল না। শেষ পর্যন্ত ঠিক হল অবিলম্বে পিসিমাকে আশা নিকেতন থেকে নিয়ে আসা। শ্রীরামপুরের বাড়ি বিক্রির চেষ্টা আপাতত বন্ধ থাক। পিসিমা যতদিন আছেন বাড়ি ভোগ করুন, দীনু থাকবে, দরকার হলে আর একটি লোকও রাখা হবে, ঠিকে। অনু দেখাশোনা করবে। শনি-রবিবার এসে থাকবে। পরে পিসিমার মৃত্যু হলে যা হয় ব্যবস্থা করা হবে।
পরদিন সকালে তিন ভাইবোন নতুন ব্যবস্থার কথা জানিয়ে অনীশ এবং ইতুকে টেলিগ্রাম করে শেয়ালদা চলল।
ট্রেন চলেছে। তিন ভাই বোন অধৈর্য হয়ে স্টেশনের নাম পড়ছে।
অতীশ বলল, দ্যাখ। সত্যিই আমাদের অ্যাকচুয়ালি মা-বাবা আর পিসিমাতে কোনো তফাত নেই। মা-বাবা কোনোদিন করেননি।
দীপু বলল, একটু লেটে বুঝলি মেজদা। পিসিমার মধ্যে আমরা বাবার রক্ত আর মায়ের স্নেহ পেয়েছিলুম।
অনু বলল, মা কীভাবে দিদিমণি বলে ডাকত, সে ডাকটা তোর মনে আছে? বালবিধবা বলে বাবা-মা যেন সমস্ত শক্তি দিয়ে পিসিমাকে আগলে রাখত।
দীপু বলল, আমি আগেরবার বাবাকে বলতে শুনেছি–রুচি তুই আমার আগে যাস। পিসিমা বলছে, অমন কতাও বোলো না দাদা, তুমি আগে যাও, পরে আমি আসছি। আমি গেলে তোমায় দেখবে কে?_আমি গেলেই বা তোকে দেখবে কে শুনি? বাবা বলল। পিসিমা বলল, আমার কথা ছেড়ে দাও। একটু, এই এতটুকুটি হলেও মেয়েমানুষের ভেসে যায়…
আশা-নিকেতনে এখন যিনি তত্ত্বাধানে আছেন, সেই মাতাজি আগের জন নন। হঠাৎ দেখলে বোঝা যায় না। সেই একই রকম সাদা কাপড়, কানের পাশ দিয়ে ঘোমটা দিয়ে পরা। সব কথা মন দিয়ে শুনে বললেন, দেখুন, আপনারা খুব ভুল, খুব অন্যায় করেছেন। আমাদের এখানে আত্মীয়-পরিজনহীন মানুষ ছাড়া নেওয়া হয় না। সমাজের নিয়ম হল পরস্পর পরস্পরকে দেখা। যাঁর দেখবার লোক আছে তিনি কেন দাতব্য-প্রতিষ্ঠানে আসবেন। তাঁর দেখাশোনা যেমন করেই হোক, তার নিকটজনদের নৈতিক দায়িত্ব। কেন আপনারা রেখেছিলেন ওঁকে? বিপদটা কি জানেন? সারা ভারতে ছড়িয়ে আছে আমাদের প্রতিষ্ঠান। শুধু বৃদ্ধ বৃদ্ধা নয়, সর্ব অর্থে অনাথ যারা তাদেরই ব্যবস্থা এখানে করা হয়, আমাদের সাধ্যমত। প্রত্যেককে কিছুটা শ্রমও দিতে হয়। আবাসিকদের আমরা দীর্ঘ দিন এক জায়গায় রাখি না। কয়েক মাস অন্তর অন্তর স্থান বদল করাই। এই আমাদের নিয়ম। এবং তাঁদের কোনো ঠিকানা নিই না। নাম নিই না। একটা নম্বরের পাশে, তাঁদের এখানে নতুন নামকরণ হয়। পুরোনো পরিচয় মুছে ফেলে তাঁরা যাতে নতুন জীবন লাভ করতে পারেন, তারই চেষ্টা করি। তবে আমার যতদূর মনে পড়ছে, সম্প্রতি এখান থেকে ওরকম স্থানবদল হয়নি। আপনাদের দেওয়া এই রুচিশীলা ভট্টাচার্য, নাম আমরা ভেতরে গিয়ে বলতে পারব না। আমাদের নাম আলো, সলিল, বহ্নি, বরুণ, পবন, আগুন—এইসব। কে যে এঁদের মধ্যে রুচিদেবী তা জানি না, জানাতেও পারি না।
