সইসাবুদ শেষ হলে দীপিকা বলল, আচ্ছা মাতাজি, আপনাদের ভিজিটিং-ডে এবং আওয়ারগুলো আমাদের একটু বলে দেবেন, নোট করে নিই।
মাতাজি মুখ তুলে বললেন, দেখুন, আপনারা একটু ভুল করছেন। এখানে যাঁরা আসেন, তাঁদের তিনকুলে কেউ নেই দেখাশোনা করার বা আর্থিক দায়িত্ব বহন করার। কাজেই আমাদের ওসব ভিজিটিং আওয়ার-টাওয়ারও নেই।
অনীতা হাঁ করে বলল, ভিজিটিং আওয়ার নেই!
না, আপন বলতে যাদের কেউ নেই, তাদেরই একমাত্র এখানে রাখা হয়।
অনীতা সামলে নিয়ে বলল, তা অবশ্য সত্যি দিদি, পিসিমার তো যাকে বলে আপন, তেমন কেউ নেই। ছেলে না, মেয়ে না। নাত-নাতনি কেউ না।
দীপু বলল, আমরা তো যাকে বলে নিষ্পর। পরস্য পর। পিসিমা তো আবার বাবার সতাত বোন, জানিস তো!
ইতু বলল, মা বেঁচে থাকতে আমরা কেউ জানতেই পারিনি কথাটা।
অনু বলল, মায়ের বাহাদুরি আছে, হাজার হোক পরের বাড়ির মেয়ে তো!
দীপু বলল, বাবারও বাহাদুরি।
এইখানেই এ কাহিনি শেষ হয়ে যেত। হওয়ারই কথা ছিল। কিন্তু হল না। একদিন গভীর রাত্তিরে ঘুমাতে ঘুমোতে দীপু হাউহাউ করে কেঁদে উঠল। শব্দে জেগে উঠেছে অসমঞ্জ, তার রাগি স্বামী। ওদিকে দামাল ছেলেও। অসমঞ্জু বললে, আরে মাঝরাত্তিরে এরকম মড়াকান্না জুড়লে কেন? হয়েছেটা কী?
দীপু বাচ্চা মেয়ের মতো কাঁদছে আর বলছে, পিসিমাকে তুমি আমার কাছে রাখতে দেবে কি না বলো, আগে বলো। আমি সারাটা জীবন তোমার কেনা গোলাম হয়ে থাকব। অন হবার পর আমি খেতম না পিসিমা খাইয়ে না দিলে, পিসিমার বুকে হাত রেখে মা মনে করে ঘুমোতুম। সেই পিসিমাকে…..। উ! ওগো, পিসিমা না থাকলে আমি মরে যেতুম। পুঁয়ে পাওয়া হয়ে গিয়েছিলুম। তুমি আমার পেতেই না। অন্য কোনো রা কুসি এসে তোমার এ সংসার সাজাত!
অসমঞ্জ বললে, মাঝরাত্তিরে তুমি এ কী আরম্ভ করলে? পিসিমাকে তুমি তোমার কাছে এনে রাখতে চাও এ কথা তো আগে বলোনি!
বলব কি? তোমার যা মেজাজ, তোমাকে আমি হিটলারের চেয়েও ভয় পাই।
তা হলে আর আমায় বলা কেন। পিসিমা এলে তো চমৎকার হয়, রান্নাবান্নায় তো তিনি একাই একশো। যাও যাও নিয়ে এসো গে, রোজ রোজ আর আমায় নুন কম, মিষ্টি বেশি, আধসেদ্ধ খেতে হবে না। এই জন্যে এত কান্না!
যদি তোমার মা কিছু বলেন?
বলবেন তো ভদ্রেশ্বরে। এখানে তো সে কথা আমাদের কানে আসছে না। আর বলবেন আমার মা বলবেন, সে আমি বুঝব। ওহ তোমরা মেয়েরা না একেন্নম্বরের কুচুটে।
কুচুটে নয় গো কুচুটে নয়, ভিতু। ভিতু।
আচ্ছা তাই তো তাই। এখন ঘুমোও দিকি!
স্টেশনেই অনুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল দীপুর। এখন ওদের পাঁচজনের কাছেই শ্রীরামপুরের বাড়ির চাবি ভেতরের কোল্যাপসিবল গেটের। বাইরে দরজার চাবি দীনুর কাছে। যতদিন না বাড়ি বিক্রিবাট্টা হয়, সে-ই কেয়ারটেকার।
অনু অবাক হয়ে বলল, দিদি তুই?
দীপু বলল, অনু তুই?
অনুর চোখ ছলছল করছে। বলল, কাল রাতে স্বপ্ন দেখছি একটা খুব রোগা না-খেতে পাওয়া বেড়ালছানা, তাকে শাম্পি পাঁচিলের ওপাশে ফেলে দিচ্ছে, হঠাৎ বেড়ালটা মিউ মিউ করে ডেকে উঠল করুণ স্বরে। তার পরেই দেখলুম সেটা বেড়াল নয়, পিসিমা। দিদিরে, আমি পিসিমাকে বৃদ্ধাবাসে ফেলে রেখে থাকতে পারব না। ভগবান তা হলে কখনো আমাকে মাপ করবেন না। মায়ের সূতিকার সময়ে পিসিমাই তো আমায় বাঁচিয়েছে। পিসিমাই আমার আসল মা। অনু কেঁদে ফেলল।
দুই বোনে এক রিকশায় মনের কথা বলাবলি করতে করতে বাড়ি চলল। দীপু বলল—তোর অসমঞ্জদাকে আমি সত্যি বলছি অনু এত দিন শুধু ভয়ই করে এসেছি। মারাত্মক ভয়। মোজা রিপু নেই, ছুড়ে ফেলে দিল, ডালে নুন নেই, ছুড়ে ফেলে দিল, বুবুলের স্কুল থেকে ডেকে পাঠিয়েছিল, আসতে দেরি হয়েছে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে চলে গেল। বাপরে! সেই লোক! আজ এই প্রথম ওকে শ্রদ্ধা করলুম, ভালোও বাসলুম বলতে পারিস।
অনু বলল, অনেক ভেবে ঠিক করলুম, যতদিন না বাড়ি বিক্রি হয় আমি এসে থাকব। দ্যাখ, এতদিন আমি শাশুড়ির ছেলেকে দেখেছি, কিছুদিন উনি আমার মেয়েদের দেখুন। শাম্পি-মাম্পি শুক্রবার রাতে এ বাড়ি চলে আসবে, রবিবার আবার বাবার সঙ্গে চলে যাবে। ওদেরও একটু আত্মনির্ভরশীল হওয়া ভালো, এইট তো হল। তারপর বাড়ি বিক্রি হলে, আমার ভাগটা দিয়ে আমি পিসিমাকে আমাদের বাড়ির খুব কাছে, একটা মাদ্রাজি পরিবারে পেয়িংগেস্ট রাখব। পেয়িংগেস্ট মানে-মেজানিন ঘর, একট রান্নাঘর, বাথরুম ওরা দেয়, পিসিমা নিজের রান্না নিজেই করে নেবে। পিসিমার সুন্দর কুলিয়ে যাবে। আমি তো সব সময়ে দেখাশোনা করতে পারবই।
শ্রীরামপুরের বাড়ির দরজা খুলে দিল অতীশ স্বয়ং। খুলেই অবাক হয়ে বলল, কী ব্যাপার রে? তোরা জয়া-বিজয়া কোত্থেকে?
মেজদা তুই?
আরে, আর বলিসনি, দুর্গাপুরে পৌঁছে থেকে শুক্লা গুম হয়ে আছে। কাল মহা কান্নাকাটি জুড়ে দিল। বলে, আমি জার্মানি যাবো না। ভাগ্যে থাকলে আমার হবে। না থাকলে না-ই হল, আমি অমন ফরেন-হ্যাংলা নই। তুমি ঘুরে এসো। পিসিমা আর কিষণকে নিয়ে আমি থাকব এখানে। তার পরে আবার আরেক কাণ্ড।
কি কাণ্ড?
আয়, ভেতরে আয়, দেখাচ্ছি।
ভেতরে যেতে যেতে অনীশ চেঁচিয়ে বলল, দীনু ভালো করে কাঁচা তেজপাতা ভিজিয়ে চা কর। একটা তরকারি কিছু চড়িয়ে দে। দিদিরা দুজন এসেছে।
