পিসিমা বললেন, তুই থাম তো মুখপুড়ি। লুচির ফোসকা ছিঁড়ে ছিঁড়ে তুই মড়ার দড়া হয়ে থাকবি তো থাক। দুপুরে গাঁই গোত্তর সব খাইয়ে তোরা কতটুকু দাঁতে কেটেছিস যেন আমি দেখিনি! ঠাকুরকে সব মাছ কালিয়া দিতে দিইনি। এখন সব খা, গরম গরম ভালো করে খা। মন্টু খবর্দার না বলবি না, মেজবউমা, তুমি রন্টু ধনকে জোর করে খাইয়ে দাও তো, তুমি বললে কেমন না খায় দেখি। …দীপু মানিক, ছেলের দৌরাত্মে দুপুরে কিছু খাওনি মা আমি দেখেছি।
অনু বলল, আমায় ধন মানিক কিছু বললে না পিসিমা, খেতেও বললে না। আমি খাব না যাও। পেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না, না?
পিসিমা একমুখ হেসে বললেন, তোকে যে আমি কোলে বসিয়ে খাইয়ে দেব মা। তোর যে আলাদা খাতির! শিবঠাকুরের তো লক্ষ্মী সরস্বতী আছেই, কিন্তু তাঁর একদম নিজের নিজস্ব কন্যেটি যে মা মনসা, তার জায়গা যে ঠাকুরের একবারে কোলে-কাঁখে!
সত্যিই, অনু হবার সময়ে তার মা যায়-যায় হয়েছিলেন। অনেক দিন খাওয়ানোদাওয়ানো তো দূরের কথা, একটু কোলে করাও তাঁর বারণ ছিল। অনুকে পিসিমাই একরকম বড়ো করেছেন।
শুক্লা বলল, পিসিমা বসুন না, এই যে মোড়াটাতে বসুন।
তা বসব বইকি, পিসিমা বললেন, এমন জমজমে আনন্দমেলা বসেছে, দেখব? দুটো চোখ যখন ভগবান এখনও রেখেছেন তখন দেখে সাধ পুন্ন করি।
অতীশ বলল, বাবার শ্রাদ্ধের নিয়মভঙ্গ উপলক্ষ্যে এই জমায়েত। একে তুমি আনন্দমেলা বলছ পিসিমা?
বলব না তো কি! দাদা নিজেও ওপর থেকে দেখে দেখে ঠিক এই কথাই বলছে যে রে, বউদির সঙ্গে হাসতে হাসতে বলছে। আমরা না মলে যে তোরা একত্তর হস না বাবা। সে বেশ গেছে। ভগবান করুন আমিও যেন এমনি যেতে পারি। তখনও তোরা এমনি মেলা বসাবি, আমোদ আহ্লাদ করবি। খুনসুটি করবি…..।
পিসিমা আঁচলের খুঁট নিয়ে চোখের জল মুছলেন।
দিন তিনেক পরে খোঁজখবর করে অতীশ এসে অনীশকে বলল, দাদা একটা ভীষণ মুশকিল হয়ে যাচ্ছে।
কেন রে?
বৃদ্ধাবাস ইজ অল রাইট। কিন্তু ভালোগুলো সবই বেশ মোটা টাকা চায়। কয়েকটা তো আবার প্রথমেই হোক টাকা জমা রাখতে বলছে।
তুই মিশনারিদেরগুলো খোঁজ করেছিলি?
করেছি, কিন্তু পিসিমার স্ট্রিকট ব্রাহ্মিনিজম তো জানিসই। মিশনারি প্রতিষ্ঠানে রাখলে শেষে অন্নজল না ত্যাগ করে।
ভাবালে। অনীশ চিন্তিত মুখে বলল, দেখি আমার সোর্সগুলো ট্যাপ করে দেখি।
শেষ পর্যন্ত অবশ্য অনুর বর রঞ্জিত খবর আনল একটা সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের। পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি হিন্দুই। তবে সব জাতের বৃদ্ধ বৃদ্ধাই তারা রাখে, একেবারে বিনা পয়সায়। জায়গাটা শেয়ালদা লাইনে, একদিন অনীশ অতীশ, রঞ্জিতকে সঙ্গে নিয়ে খোঁজখবর নিয়ে এল। ভালোই মনে হচ্ছে। বহু বড়ো বড়ো লোকের গোপন ডোনেশন আছে, ওরা কিছু নেয় না। নেহাত পীড়াপীড়ি করলে হয়তো ভোনেশন কিছু নিতে পারে। পিসিমার কাছে তারপর ভাঙা হল কথাটা।
দীপু বলল, পিসিমা, তুমি এখন কি করবে?
কীসের কী রে?
না মানে কোথায় থাকবে? কীভাবে? সে কথা কিছু ভেবেছ?
ছেলেমেয়েরা সবাই উপস্থিত। পিসিমা অবাক চোখে চেয়ে বললেন, একটা নয়, দুটো নয়, পাঁচ-পাঁচটা ছেলেমেয়ে আমার। তিয়াত্তর বছর বয়সে আমার ভাবনা আমি ভাবব?।
ছেলেমেয়ে সকলেই চুপ করে রয়েছে। অতীশই শেষে বলল, ঠিক আছে। তোমার ভাবনা আমরা ভাবব তো? ভাবতে দিচ্ছ তা হলে! শোনো তবে, তোমার জন্যে শ্যামনগরে একটা খুব ভালো প্রতিষ্ঠান দেখা হয়েছে। সেখানেই তুমি থাকবে। ওরাই তোমার দেখাশোনা করবে। আমরা যে যখন পারি মাঝমধ্যেই যাব, দেখে আসব। হিন্দুদের জায়গা পুরোপুরি, কেরেস্তান-টান, ম্লেচ্ছ-টেচ্ছ ব্যাপার নয়, তুমি নিজের মতো থাকতে পারবে।
পিসিমা অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন। বিস্ময়ে তাঁর মাথা থেকে ঘোমটা খসে পড়েছে। হাবলা মুখে তিনি বললেন, পতিষ্ঠান? পতিষ্ঠান আমার কী করবে রন্টু? এ বাড়িতে, এই ড্যাস গল-এ আমি থাকতে পাব না? বাড়িটার নাম গ্রেস ডেল। পিসিমা বরাবর উলটোপালটা বলে এসেছেন। ওই উলটোপালটা নামটাই তাঁর প্রাণাধিক প্রিয়।
অপ্রস্তুত মুখে অতীশ বলল, থাকতে পাবে না কেন? কিন্তু এখানে কে তোমার দেখাশোনা করবে? সেটাই তো হচ্ছে মুশকিল। বয়সটা তো তোমার বাড়ছে? না কমছে! এত বড়ো বাড়ি দেখাশোনা পরিচ্ছন্ন রাখা চাট্টিখানি কথা না কি? সেরকম বিশ্বাসী লোকই বা কই?
কেন রন্টু, দীনু রইল। তোরা মাস গেলে দুশো একশো যে যা পারিস দিতিস, বাবা থাকতে যেমন দিচ্ছিলি! আমার ভেসে যেত। তোরা এদিকে এলে সব আমার কাছে আসবি। খাবি, থাকবি।
তারপর তোমার অসুখবিসুখ করলে?
আমার কিচ্ছু হবে না ধন। ভগবানের আশীর্বাদে আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে যাব। দীনুও রইল।
দীনুকে আমরা অতটা বিশ্বাস বা নির্ভর করতে পারছি না পিসিমা। ফসল কাটার সময় হলেই তো ও দেশে চলে যাবে, দু মাস তিন মাস বেপাত্তা। শেষকালে দেখবে এ বাড়ি জবরদখল হয়ে যাবে। ওই দীনুই সাহায্য করবে তাদের।
তা হলে?
তা হলে যা বললুম, খুব সুন্দর জায়গায় থাকবে তুমি, আমি জার্মানি থেকে ফিরে তোমায় নিয়ে যাব যখন, দাদার সুবিধে হলে দাদাও নিয়ে যাবে। আপাতত তো এ ছাড়া অন্য উপায় দেখছি না।
পিসিমা কিছু বললেন না। অনীশ-অতীশের কাজ ছিল। বেরিয়ে গেল। বাইরে বাড়ির দালাল। ওদিকে মিউনিসিপ্যালিটিতে যেতে হবে, মিউটেশনের জন্য কী কী করা দরকার…। সবই তো এই ক-দিনের মধ্যে! প্রতিমা রাইকে নিয়ে পাড়া বেড়াতে বেরিয়েছে। তার মেয়ের মাথায় ঈষৎ সোনালি চুল, টকটকে রঙ, সুন্দরী না হলেও জৌলুস-অলা চেহারা। সে মিরান্দা হাউজে পড়ে। শ্রাদ্ধ উপলক্ষ্যে এসে সেই ছোট্ট এতটুকু রাইকে এত বড়ো, এত সুন্দর দেখে পাড়ার অনেকেই মুগ্ধ। তাদেরই অনুরোধে এই সামাজিক নিয়মরক্ষা। শুক্লা কিছুক্ষণ বসেছিল, হঠাৎ মনে হল কিষণকে অনেকক্ষণ দেখেনি, কে জানে বুবুল দুরন্ত ছেলে তার সঙ্গে মিলে কি বদবুদ্ধি করছে! সে কিষণ কিষণটা কোথায় গেল বলতে বলতে উঠে গেল। দীপু বসে বসে নখ খুঁটছিল, তিন বোনে সামান্য আগে পরে পিসিমার ঘর থেকে সন্তর্পণে বেরিয়ে গেল। পিসিমা ছোটো মোড়ার ওপর বসেই রইলেন, বসেই রইলেন। তাঁর মুখের ওপর দিয়েই সন্ধে গড়াল, রাত হল। কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে পিসিমার দশটি বছর বয়স বেড়ে গেল।
