অনীশের গম্ভীর গলা শুনে অনু ঘাবড়ে গিয়েছিল, বলল, অত সিরিয়াস কেন রে দাদা, একটু হাসিমুখে যা বলবি বল না বাবা! তোর রকম দেখে আমার বুক ধড়ফড় করছে!
অনীশ গলা খাটো করে বলল, এই এত বড়ো বাড়িখানাতে পিসিমা এখন একেবারে একা হয়ে গেল, এটা কেউ খেয়াল করেছ? একদম একলা। তিয়াত্তর বছরের একজন বৃদ্ধাকে এইভাবে রাখা ঠিক কি না তোমরা বলো!
দীপু বলল, তাই তো! তা হলে! একটা বিশ্বাসী লোক পর্যন্ত নেই।
অতীশ বলল, বিশ্বাসী লোকের কথা ছাড়ো। বিশ্বাসী অবিশ্বাসী কোনো লোকের হাতেই এত বড়ো বাড়ি এবং একজন বৃদ্ধাকে ছেড়ে রাখা যায় না। একমাত্র উপায় আমাদের কেউ সঙ্গে থাকা। অনু, তুই পারবি!
অনু বা অনীতা বালিগঞ্জ প্লেসে থাকে। স্বামীর নিজস্ব অডিটার্স ফার্ম। সেটা গড়িয়ার দিকে। বাড়িতে শ্বশুরশাশুড়িও আছেন। অনীতা বলল, আমি আসা-যাওয়া করতে পারি। কিন্তু এসে থাকা ইমপসিবল। আমার শ্বশুরেরও চুয়াত্তর হল। শাশুড়ির ঊনসত্তর। তাঁদেরও তো আমাকে চব্বিশ ঘন্টাই দেখতে হয়। শাম্পি মাম্পি মর্ডানে পড়ে। কত কষ্ট করে, কত কাঠ খড়-পুড়িয়ে ওদের ভর্তি করা!
অনীশ বলল, অনুই একমাত্র কলকাতায় থাকে। তারই যখন এসে থাকবার প্রশ্ন উঠছে না, তখন অন্যদের তো কথাই নেই। তা হলে উপায় পিসিমাকেই নিয়ে যাওয়া। আমার দ্যাখ অনিশ্চিত অবস্থা। তিন বছর হয়ে এল, যে-কোনো জায়গার যে-কোনো মুহূর্তে বদলি হয়ে যেতে পারি। যেখানেই যাই, বড়ো কোয়াটার্স পাব। সবই ঠিক। কিন্তু আমাকে সবসময়ে ডেঞ্জার জোন-এ থাকতে হয়, যেতে হয়। রাইকেই আমি হস্টেলে রাখি। প্রতিমাকেও অন্যত্র রাখলে ভালো হয়, তার ওপর পিসিমার মতো একজন পরনির্ভরশীল বৃদ্ধাকে নিয়ে গেলে আমার কিংবা প্রতিমার এক হপ্তার মধ্যে দুশ্চিন্তায় স্ট্রোক হয়ে যাবে। রন্টু তুই কি বলিস!
অতীশ বলল, তুমি তো জানোই দাদা, মাস তিনেকের মধ্যে আমার জার্মানি যাবার কথা। কিষণকে বোর্ডিং-এ রেখে, শুক্লাকেও নিয়ে যাব ভেবেছি। স্ত্রী অ্যালাউড। এরকম সুযোগ ওর জীবনে দু-বার আসবে না। পিসিমাকে নিয়ে গেলে তো সেটা সম্ভব নয়! দীপু তুই তো পারিস? অনু ইতু দু-জনেরই শ্বশুরশাশুড়ি রয়েছেন, অন্যান্য আত্মীয় পরিজনও রয়েছে। তাদের মাঝখানে পিসিমাকে নিয়ে যাওয়াটা তো ঠিক যুক্তিযুক্ত হবে না!
দীপু আমতা আমতা করে বলল, ও নেই। ওর মত না নিয়ে তো আমি কিছু বলতে পারি না। তা ছাড়া ও সাংঘাতিক রাগি মানুষ। এটা আমি লুকোছাপা করি না। তোমাদেরই জামাই, তোমরাই দেখেশুনে বিয়ে দিয়েছ। যেকালে তোমাদের জামাইয়ের পান থেকে চুন খসলে রইরই কাণ্ড হয়, সেকালে তার অনুমতি না নিয়ে পিসিমাকে তার সংসারে নিয়ে যাবার সাহস আমার নেই। তা ছাড়া আমি জানি, অনুমতি সে দেবে না, বাড়িতে থার্ড পার্সন তার একদমই পছন্দ নয়।
অনীশ হতাশ হয়ে বলল, তা হলে?
অতীশ বলল, তা হলে একটাই উপায় বাকি রইল। অনেক ভালো ভালো বৃদ্ধাবাসে হয়েছে আজকাল। তারই একটাতে দেখেশুনে নিয়ে দাও।
অনীশ বলল, বাড়ি? বা
ড়ি বিক্রি করে আমরা পাঁচজনে ভাগ করে নেব, শ্রীরামপুরে তো আর কেউ থাকতে আসছে না। আমি দুর্গাপুরেই জমি কিনেছি। বাড়িটা তা হলে আরম্ভ করে দিতে পারি, এ-বাড়ি বিক্রির টাকাটা পেলে।
অনীশ চিন্তিত মুখে বলল, বাড়ি তো সত্যিই আমারও দরকার। আমি হয়তো শেষ পর্যন্ত দিল্লিতেই সেটল করব। টাকাটা পেলে আমারও সুবিধে হয়। তবে পাঁচ ভাগ করে আর শেষ পর্যন্ত কী বা থাকবে?
দীপু অনু নীরবে চোখ চাওয়াচাওয়ি করল। দীপু বলল, ভাগ ছেড়ে দেওয়ার কথা যদি বলো, তা হলে তোমাদের জামাইদের উপস্থিতি দরকার।
অতীশ বলল, বাজে বকিসনি। বাড়ির ভাগ থাকলে তোদেরই থাকবে। জামাইদের তো আর ভাগ নয়। যা বলবার তোরা অনায়াসেই বলতে পারিস।
ইতু বলল, শ্বশুরবাড়ির হাত তোলা হয়ে থাকি। পাঁচ ভূতের বাড়ি। ওর পর্যন্ত রোজগারের পাইপয়সা শ্বশুরের হাতে তুলে দিতে হয়। হাতে নিজস্ব টাকা না থাকার কী কষ্ট সে আমিই জানি।
অনু বলল, যা বলেছিস। আমারও সেই এক কথা। চাবি শাশুড়ির কাছে, কর্তৃত্ব তাঁর, খাটুনি আমার। কখনো যদি হাতখরচ কিছু দিল তো তার ডেবিট-ক্রেডিট দাখিল করো, জার্নাল মেনটেন করো। বাব্বাঃ।
দীপু বলল, দেখো বড়দা-মেজদা ভদ্রেশ্বরের বাড়ি ওদের পৈতৃক। সাত ভাইয়ের ভাগ। বুঝতেই পারছ কী অবস্থা। তিন ভাই বাইরে থাকে। বাকি চার ভাই ভদ্রাসন কামড়ে পড়ে আছে। এদিকে এলেও তো বরাবর আমি বাবার কাছে উঠি। শ্বশুরবাড়ির ভাগ পেয়ে তাতে জমি কিনে বাড়ি তুলতে হলে আমাকে এক জন্ম ঘুরে আসতে হবে। এ বাড়ির ভাগের টাকাটা পাই তো আসানসোলে হোক, ভদ্রেশ্বরে হোক, যেখানে তোক একটা মাথা গোঁজার আস্তানা করার কথা ভাবতে পারি।
অনীশ বলল, ঠিক আছে। ঠিক আছে। তবে ওই কথাই রইল। সবাই বৃদ্ধাবাসের খোঁজ করতে থাকো, আমি আর দিন সাতেক আছি, এরই মধ্যে যা হয় ব্যবস্থা করতে হবে।
এই সময়ে দরজায় শব্দ হল। পিসিমার কদমফুল মাথাটি দেখা গেল, তিনি দরজাটা হাট করে খুলে দিয়ে বললেন, দীনু আয় বাবা, এখানে আমার চাঁদের হাট বসেছে। বড়ো বউমা ধন আমার, দীনুর ট্রে থেকে চা-গুলো সব ঢেলে ঢেলে তুলে তুলে দাও তো মা!
প্রতিমা, ইতু দুজনেই উঠে পড়ল। প্রতিমা চা ঢালছে, আর ইতু কাপগুলো এগিয়ে এগিয়ে দিচ্ছে। দিতে দিতে ইতু বলল, এ কী পিসিমা, মাছভাজা, পাপড়ভাজা এসব কী কাণ্ড? পানতুয়া! দুপুরের অত খাওয়ার পর!
