অনীশ বলল, তা বাচ্চাগুলো সব কে কোথায়? দীপুর ছেলেটা তো দেখলুম ইসমাইলের সঙ্গে জোর তর্ক জুড়েছে। ইসমাইল বলছে ওদের গ্রামে নাকি কে এক খুনখুনে বুড়ো আছে, দুশো তিয়াত্তর বছর বয়স। দীপুর ছেলে বলছে তা হতেই পারে না, গিনেস বুকে নাকি ও কোন রাশিয়ান না চীনে বুড়োর নাম দেখেছে।
অনু বলল, সত্যি! বুড়ো হওয়ার কী কষ্ট, না? বাবার কত হয়েছিল গো!
দীপু বলল, তিরাশি। কানে শোনেন না, চোখে দেখেন না, দাঁত নেই যে পছন্দের জিনিস খাবেন।
অনীশ বলল, কেন, বাবার তো বাঁধানো দাঁত ছিল।
প্রতিমা বলল, থাকলে কি হবে, বাবা তো সেটা নিয়মিত ব্যবহারই করলেন না, একটু লাগত, প্রথম দিকে যেমন লাগে। আমার বাবার তো ষাটের কোঠা থেকেই পুরো বাঁধানো। এঁর মাথায় কে ঢুকিয়েছিল ক্যানসার হতে পারে। ব্যাস।
ইতু বলল, চোখের ছানি কাটানো নিয়ে তো সেই সত্তর বছর থেকে বলা হচ্ছে। তখন মা-ও বেঁচে, আমারও বিয়ে হয়নি। খালি এক কথা কটা দিনই বা আর বাঁচব, এই চোখেই আমার চলে যাবে।
অতীশ বলল, সেই সত্তর তিরাশিতে গড়াল। আজকাল এসব অপারেশন কিছু না, দুঘন্টা পরে ছেড়ে দেয়। আমার একবারটি অনুমতি দিলেই নেত্রালয়ে ব্যবস্থা করে দিতুম। করতে তো দিলেন না।
দীপু বলল, শয্যাশায়ী হয়ে পড়েননি, বেডসোর হয়ে যায়নি, সে শুধু পিসিমার জন্যে। দুই ভাইবোনে টুকটুক করতে করতে দুবেলা ছাদে উঠতেন, গাছের পরিচর্যা করতেন। বাবা সোজা-সমর্থই গেছেন। নিরামিষ ছাড়া খেতে ভালোবাসতেন না ইদানীং।
ইতু বলল, আমরা এলে কিন্তু পিসিমার মাছ-মাংস আনানো চাই।
অনু বলল, ইতু, তোর পিসিমার হাতের আলুর তরকারি মনে আছে। আর নটে শাকের চচ্চড়ি?
ইতু বলল, থাকবে না আবার! মজাটা শোন না! আমি তো আগে শাক-টাক খেতুম না! আলুও খুব একটা পছন্দ করতুম না। ওদিকে ভাগলপুরে ওদের বাড়িতে বিহারি বামুন রাঁধে। সে কি জঘন্য ধারণা করতে পারবি না। শুধু অড়র ডাল আর বেগুন-চোখা বলে ওদের নিজস্ব একটা রান্না ভালো করত। আমাদের এদিকের রান্না কিছু পারে না। আমার শাশুড়ি তো আবার অ্যাডভোকেট। এসব দিকে হুঁশ খেয়াল নেই। আমি তিন মাস পরে বাড়ি এসে পিসিমার হেঁশেলে উঁকি দিয়েছি! পিসিমা বলল, যা খেতে বসগে যা, দিচ্ছি। আমি বললুম, যা যা বেঁধেছ একটু একটু দিয়ো পিসিমা। পিসিমা বলল, নটেশাকের চচ্চড়ি তুই খাবি? আমি বললুম, জরুর। ওরে দিদি রে, বউদি রে, সে কি রান্নারে, মুখ ছেড়ে গেল একেবারে। বিকেলবেলা পিসিমা নরম সাদা সাদা পরোটা করে দিল আর আলুর তরকারি। দম নয়, তরকারি। তার কী স্বাদ!
অনু বলল, আমার শ্বশুরবাড়িতে তো ফি বছর একঝুড়ি করে খাজা যায়। আমাদের আশেপাশে তো জ্ঞাতি ভাশুর-দেওররা থাকে, তাদের ভাগ দিই। এমন হয়েছে পুজোর ষষ্ঠীর দিন থেকে ওরা সব বলতে থাকবে বউদি, বউদি, অনীতা, অনীতা এবার পিসিমা খাজা পাঠাবেন তো! এমনি হ্যাংলা!
অতীশ বলল, এ আর বেশি কথা কি! দুর্গাপুরে যখন আমার প্রথম পোস্টিং হয়, পিসিমাকে নিয়ে গিয়েছিলুম। শি সুন বিকেম আ পপুলার ফিগার। ছাত্ররা, কলিগ-রা সব আমাকে যত না চেনে, পিসিমাকে চেনে তার চেয়ে অনেক বেশি। আরে আমার পরিচয়ই হয়ে গেল পিসিমার ভাইপো, ওই খাজা গজা, মালপো, আচার আরও কী কী সব তোদের আছে! বেগতিক দেখে একদিন বললুম, পিসিমা তোমাকে আনলুম আমার খাওয়াদাওয়ার অসুবিধে দূর করবার জন্য, এদিকে তুমি সারা দুর্গাপুরের খাওয়াদাওয়ার ভার নিয়ে বসে আছ? এরকম রান্না রাঁধলে তো আমাকে পথে বসতে হবে। পিসিমা হেসে বলল, কেন? কেউ খেতে চাইছে? পি আর সেন ছিল একেন্নম্বরের পেটুক, বুঝলি! ও-ই ধরেছিল। পিসিমা আমাকে অভয় দিয়ে বললে, দাঁড়া আমি দেখছি কী করা যায়। সেদিন বিকেলে পি আর সেন এসেছে, পিসিমা এক প্লেট রসবড়া দিয়ে বললে, পিনাকী, ক-দিন ধরেই বাবা খুব একটা সাধ জাগছে তোমাকে নিয়ে। পি আর সেন বলল, বলুন পিসিমা, এ ভাইপো আপনার হুকুম তামিল করতে সব সময়ে হুজুরে হাজির। বলুন, ক-বার বাজার যেতে হবে? পিসিমা বলল, তা একটু যেতে হবে বাবা। তোমার বাড়িতে আমার হাতে একদিন সবাইকে খাওয়াবে এই আমার সাধ বাবা। পি আর সেন পড়েছে এদিকে ফাঁপরে। কিন্তু এত ভালোবাসত পিসিমাকে সঙ্গে সঙ্গে পিসিমাকে কোলে তুলে নিয়ে ধেই ধেই নাচ। আমাকে এতটুকু খাটতে পর্যন্ত হয়নি। ক্যামপাসসুদ্ধ কলিগ-কে খাইয়েছিল পিসিমার হাতে। ধন্য ধন্য রব চারদিকে।
দীপু বলল, পিসিমা তো তা হলে বুদ্ধিও ধরে খুব। আই কিউ টেস্ট করলে নিশ্চয় অ্যাবভ অ্যাভারেজ হবে।
অনীশ বলল, তা তো হতেই পারে। মারই তো দেখেছি কী ভীষণ স্মৃতিশক্তি, যে-কোনো ঘটনার সাল তারিখ অবিকল বলে দিতে পারত। কবে ইতু কী মজার কথা বলেছিল, রন্টু কোথা থেকে এশিয়াটিক কলেরা নিয়ে এল, আমার বন্ধুরা আড্ডা মারতে মারতে মাকে কবে কি বলেছিল, সব মা মুখস্ত বলে দিত। সাংঘাতিক মেধা। আমাদের দেশের অনেক বয়স্ক লোকের মধ্যেই এটা পাবি। অরিজিন্যাল ব্রেন পাওয়ারটা যাবে কোথায় বল? তা পিসিমা এখন কোথায়?
একটু শুতে পাঠিয়েছি জোর করে, অনু ইতু বলল।
অনীশ বলল, একটা খুব জরুরি কথা আছে, এখনই সেটা সেরে নেওয়া ভালো। জামাইরাও সব থাকলে ভালো হত। যাক সে, নেই যখন আমাদের নিজেদের মধ্যেই ব্যাপারটার নিষ্পত্তি হওয়া দরকার।
