পিসিমার দাঁতগুলি এই বয়সেও গুটিকয় কষের দাঁত ছাড়া, মোটামুটি আছে। বললেন, আমি কি আর পারি ধন? মানিক আমার! এখন তোমরাই আমার হাত পা, তোমরা আমার চোখ, যদি নিয়ে যেতে পার তো গেলুম। নয়তো এখেনেই বসলুম।
অতীশ বলল, ভালো জ্বালা। থামা দিলে কেন? দাসসাহেব তোমাকে দেখতে চাচ্ছেন যে!
শেষ ব্যাচ সুষ্ঠু বাড়ির ভাইবোন বউজামাই লোকজনকে নিয়ে। পিসিমা তখনও দাঁড়িয়ে থাকতে চাইছেন দেখে অনীশের বউ প্রতিমা জোর দিয়ে বলল, তা হয় না পিসিমা, আপনি এবার গিয়ে একটু শুয়ে পড়ুন।
পিসিমা বললেন, তুই মা পূর্ববঙ্গের মেয়ে হয়ে দুপুরে শোয়ার কথা মুখে আনিস কী করে? আমার শুতে লাগবে না।
খেলেনও না তো কিছু!
বাঃ, দু-দুটো পুরুষ্টু কলা, হাতাভর চিড়ে ভিজে, সন্দেশ! ভেসে যায় রে, ভেসে যায়। তিয়াত্তর পার হয়ে চুয়াত্তরে পড়লুম—একবেলা দুটোখানি যা হোক হলেই এ শরীর চলতে থাকে ঠিক। এখন তো আর শরীরের জোরে চলি না ধন, মনের জোরে চলি।
ছোটো একটি মোড়া টেনে, গুটিসুটি বসলেন পিসিমা একধারে।
শোলপোড়া একটু একটু মুখে দাও মা, শুক্লা, মেজবউমা, ফেলে দিসনি। ভাতের মধ্যে করে একটু গিলে নে মা, দশহরার দিন যেমন কলা গেলো।
অনীশ বলল, এ সব পুরনো আচারবিচার আর নেই পিসিমা, যেটুকু আছে উঠিয়ে দাও।
শুক্লা অতীশকে বলল, দশহরার দিনে কলা গেলা কি গো!
ওসব কলা গেলা ফেলা কি আমি জানি?—অতীশ বলল।
দীপিকা উলটো দিকে বসেছিল, বলল, কেন, তোর মনে নেই মেজদা, দশহরার। দিনে কলার মধ্যে উচ্ছে পুরে মা আমাদের গিলিয়ে খাওয়াত। খুব নাকি ভালো প্রতিষেধক! সত্যিই আমাদের কিন্তু রোগাভোগগুলো কম হত। হপ্তায় দু দিন চিরেতা, দু দিন কালমেঘ। সেসব দিন গেছে! হাত পা ছোড়াছুড়ি, কান্নাকাটি, বাববাঃ!
তিনটে নাগাদ মোটের ওপর খালি হয়ে গেল বাড়ি। আত্মীয়কুটুমরা সব একে একে বিদায় নিলেন। রবিবার বলেই নিমন্ত্রিতরা সবাই এসেছিলেন। অনেক দিন পর সবার সঙ্গে দেখা, খবরাখবর নিতেই সময় চলে যায়। বৃদ্ধেরা সব একে একে যাচ্ছেন। একে একে নিভিছে দেউটি। সে কথা বলাবলি করতে করতে চলে গেলেন সব। ছেলেপিলেরা কেউ এখনও ডেকোরেটরের চেয়ার নিয়ে দাপাদাপি করে বেড়াচ্ছে, কেউ ঘুমে ঢুলে পড়েছে।
অনু এসে বলল, তোর ছেলেকে আমি সামলাতে পারলুম না রে দিদি। হেরে গেলুম। বুবুল একাই থ্রি ফোর্থ চেয়ার তুলে দিল। ডেকোরেটরের লোকগুলো বেকার বসে বসে বিড়ি খাচ্ছে আর দাঁত বার করে হাসছে। চেয়ার সারা হয়েছে এবার টেবিল তুলছে। মানে সেই লম্বামতো কাঠগুলো আর কি!
দীপু পান চিবোতে অলস গলায় বলল, কেন, দাদা, মেজদা কী করছে?
দাদা মেজদা কি এ তল্লাটে আছে না কি? দাদা তো শ্বশুরকে স্টেশনে পৌঁছে দিতে গেল। মেজদাও…..
শুক্লা বলল, এই মেজদি আমি আছি কিন্তু এখানে। বেফাঁস কিছু বলে ফেলল না বাবা।
অনু মুখ ঘুরিয়ে তাকাল। ইতু হাসছে। বলল, আমরা তিন বোনে যা বলি মুখের সামনেই বলি, আড়ালে বলি না মেজবউদি।
শুক্লা হেসে বলল, আমরা কিন্তু বুবুলরামকে নিয়ে আরম্ভ করেছিলুম।
দীপু বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, সে চেয়ার-টেবিল তুলছে তো! ঠিক আছে। তুলতে দাও। যে ভবিষ্যতে যা হবে তার মহড়া আগে থেকেই শুরু হয়ে যাওয়া ভালো।
অনু বলল, তোর ছেলে কি ডেকোরেটর হবে। না কেটারার হবে রে?
দীপু বলল, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হবে ভাই। ওর দ্বারায় আর কিছু হবে না।
শুক্লা বলল, বাপ রে, ক্লাসে প্রতিবার ফার্স্ট হয়ে ওঠা ছেলেকে নিয়ে তুমি এত। ভাবছ?
দীপু বলল, ক্লাস ফোর স্টাফের মধ্যে আই কিউ কম আছে বলে মনে করো নাকি? একেক জন আছে ঠিকমতো গাইড্যান্স দিলে অনেক এঞ্জিনিয়ার ডাক্তারের ভাত মারতে পারত। আসলে প্রবৃত্তি, বউদি প্রবৃত্তি। এঁটো পাত তুলতে যার প্রবৃত্তি সে ভবিষ্যতে এঁটো পাতই তুলবে। কেন, এতগুলো ছেলেমেয়ে তো রয়েছে, দাদারাই না হয় বড়ো হয়ে গেছে, কিন্তু তোমার কিষণ অনু শাম্পি-মাম্পি কেউ আর শূন্য চেয়ার, এঁটো টেবিল তুলছে, এঁটো পাত তুলছে?
ইতু বলল, আমার ছেলের অ্যাকটিভিটি বাদ দিলি কেন দিদি? দ্যাখ ও কিসের রিহার্সাল দিচ্ছে।
ইতুর ছেলের বয়স সাড়ে সাত মাস। সে এখন সবে ঘুম ভেঙে উঠে বড়োকর্ম করে মুখটা ভেলে ছিল। ইতু হেসে গড়িয়ে পড়ে বলল, দ্যাখ তোর ফর্মুলা অনুসারে আমার ছেলেটা সারাজীবন এই-ই করবে।
দীপু হাত বাড়িয়ে বোনের পিঠে একটা কিল বসাল। শুক্লার হাসতে হাসতে চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে গেছে, বলল, বাববাঃ। ইতুটা পারেও। দেখি, তোমাদের দাদারা আর দিদিভাই কোথায় গেল।
ইতু চেঁচিয়ে বলল, দাদার সঙ্গে রা আর দিদিভাইটা বাদ দে মেজবউদি। তুই কাকে খুঁজতে যাচ্ছিস আমরা সবাই জানি।
সকলে হাসতে লাগল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর শুক্লা সত্যিই চারজনকে ধরে নিয়ে এল। অনুর বর আজ আসতেই পারেনি, দীপুর বর শ্রাদ্ধানুষ্ঠান দেখে আসানসোল ফিরে গেছে। একমাত্র ইতুর বর, বাড়ির ছোটো জামাই, জামাইদের মধ্যে উপস্থিত ছিল।
অতীশ এসে কোঁচা গুটিয়ে সবার মাঝখানে জমিয়ে বসে বলল, বলো এবার তোমরা কে কী বলবে। অনেকক্ষণ ধরে আমাকে খোঁজাখুঁজি হচ্ছে শুনছি।
দীপু বলল, খুঁজছিল আসলে শুক্লা, কিন্তু তুই যখন এসেই গেছিস তখন ধর আমরাও তোকে খুঁজছিলুম। কদিন পর ভাইবোনেরা মিললুম বল তো! কথায় বলে রাজায় রাজায় দেখা হয়, বোনে বোনে হয় না। আমাদের শুধু বোনে বোনে নয়, ভাইবোনেও দেখা হয় না রে!
