উলটোপালটা করবে, না নিজের বউকে আড়াল করছ বাওয়া!, ইতু ভঙ্গি করল।
যা, যা, ইয়ার্কি মারিস না। নিয়ে গিয়েই একবার মজাটা দ্যাখ না—মাসিকে কেমন মামি বলে, কাকাকে দাদা, উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপালে মজাটা নিজেই টের পাবি।
অতীশ আর দাঁড়াল না, দাদা এগিয়ে গেছে, সেও কোঁচাটা হাতে তুলে নিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোল। দাসসাহেবরা অনেকক্ষণ বসে আছেন। বাড়ির বড় ছেলে অনীশ যখন ফার্স্ট ক্লাস অনার্স নিয়ে বি এসসি পাস করল তখন এই দাসসাহেবই তাঁর রাশভারি গাড়ি চড়ে এক বাক্স কেক নিয়ে থিয়েটার রোড থেকে শ্রীরামপুর এই সারাটা পথ উজিয়ে এসেছিলেন। গমগমে গলায় পুরনো বাড়ির অলিগলি ভরে দিয়ে বলেছিলেন, দেখবেন রাখহরিবাবু, ছেলেকে যেন আবার এম এসসি-তে ভরতি করবেন না। কমপিটিটিভ পরীক্ষায় বসান।
সে কী? অত ভালো রেজাল্ট করল ছেলেটা, পড়াব না!
কেন? কেরানিগিরি করতে! না দুশো পঁচাত্তর টাকার মাস্টারি করতে! অনীশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসের পরীক্ষায় বসবে এই আমার হুকুম। এম এসসি-টি ভুলে যাও। বাঙালির ছেলে অল ইন্ডিয়া কমপিটিশনে ক্রমশ পেছিয়ে পড়ছে রাখহরিবাবু। মাদ্রাজি, ইউ পি, এমনকি বেহার থেকে পর্যন্ত সব অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসে যাচ্ছে, আর এই বইয়ের পোকা বঙ্গসন্তান সব ফ্যারাডে আর এডিসনের ভূত মাথায় পুরে দিন আনছে দিন খাচ্ছে।
অনীশ যে সময়ে আই পি এস হয়েছিল সেসময়ে মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে সত্যিই এ লাইনে চিন্তা করত না। মধ্যবিত্ত বাবা তো নয়ই। অশীতিপর দাসসাহেবকে মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম করতে করতে অনীশের সেই কথাই মনে হচ্ছিল।
থাক, থাক, দীর্ঘায়ু হও বাবা। দাঁত পড়ে, চুল খুইয়ে এককালের সাহেব মানুষটি এখন খুব ঘরোয়া বাঙালি বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। ঝুলন্ত মুখগহ্বরে সব সময়েই যেন কী চিবোচ্ছেন। হাতে লাঠি। ধবধবে ধুতিপাঞ্জাবির ভেতরে কোনো মানুষের শরীর আছে কি না সন্দেহ হয়।
তোমাদের পিতৃদেব সেন্ট পার্সেন্ট সৎ মানুষ, সৎ নাগরিক ছিলেন বাবা। কর্তব্যপরায়ণ, স্বার্থশূন্য, পরহিতৈষী। স্ত্রী বিয়োগের পরও তাঁকে দশ-দশটা বছর এভাবে বেঁচে থাকতে হল কেন জানি না। সবই মঙ্গলময়ের ইচ্ছা।
অনীশের শ্বশুরমশাই উপস্থিত ছিলেন, বললেন, আমার বেয়ান রত্নগর্ভা ছিলেন রাধামোহনবাবু। ছেলে মেয়ে কটি সবই তো তাঁর দয়ায় সংসারে সুপ্রতিষ্ঠিত। তিনি যেখানে যেমন রেখেছেন, সেখানেই থাকতে বাধ্য তো সব। যথা নিযুক্তোহস্মি, তথা করোমি। তবে দেখাশোনা সব বাবাজিরা পালা করেই করত। তার ওপরে সবার মাথায় ছিলেন আমার আরেক বেয়ান। এদের পিসিমা। দাদাকে দু হাতে আগলে রেখেছিলেন, এদের গর্ভধারিণীর অভাব জানতে দেননি। যাওয়া-আসা একরকম নিত্যই করতুম কি না! পানটি হেঁচা, সময়ে ফলের রস, চা, শরবৎ, বেলের মোরববা, ইসবগুল। একেবারে তেরেকেটে ধা, তালে বাঁধা, তাল কাটার কোনো উপায় নেই।
তাই নাকি! তাই নাকি! দাসসাহেবের সচল মুখ আরও সচল হয়ে উঠল।
তা হলে তো রাখহরিবাবুর অশেষ পুণ্য। আমি তো একটি মাত্র কন্যার কানাডায় বিয়ে দিয়ে মনে মনে দিন গুনি দাদা, গৃহিণীর তিরোধান যেন সইতে না হয়। জপের মালার মতো জপি দিনরাত। আহা, উইডোয়ারের দুঃখে শেয়াল কুকুরও কাঁদে, জানেন তো দাদা! তা সেই পুণ্যবতী ভগ্নীটি আমার কই! তাঁকে দর্শন করে চক্ষু সার্থক করি একবার।
দাসসাহেবের সামান্য ভীমরতি হয়েছে সেটা অনীশ অতীশ দু ভাই-ই বেশ বুঝতে পারছিল। কিন্তু নখদন্তহীন এই ব্যাঘ্রই একদিন দোর্দণ্ডপ্রতাপ এবং এ বাড়ির গার্জেন এঞ্জেল ছিলেন স্মরণ করে অনীশ বলল, রন্টু, পিসিমাকে একবার আনো।
শ্রাদ্ধের দিন এসেছিলেন দাসসাহেব, তাঁর পুরোনো মরিস মাইনরে চেপে। কিন্তু সেদিন এরা ভাইয়েরা সবাই কাজে ব্যস্ত ছিল। ষোড়শোপচার শ্রাদ্ধ। একেবারে শাস্ত্রবিধিসম্মত। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পুরোহিত। তিনি কোনো কাজে একবিন্দু আপস সইবেন না। কাজে কাজেই সেদিন এত কথাবার্তা আপ্যায়নের সুযোগ ছিল না। কীর্তন শুনে, প্যালা দিয়ে, শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের কাছে মিনিট দশেক বসে লিমকা আর রাজভোেগ খেয়ে ফিরে গিয়েছিলেন বৃদ্ধ আর সবাইয়ের মতো।
অতীশ পিসিমাকে দোতলার মেয়েদের ঘর থেকে সিঁড়ি নামিয়ে বড়ো দালান পেরিয়ে আনতে আনতে গলদঘর্ম হয়ে যাচ্ছিল। এর চেয়ে যদি দাদাসাহেব তার বউ শুক্লাকে আনতে বলতেন কাজটা আরও সহজ এবং মনোজ্ঞ হত। শুক্লা সপ্রতিভ, পরিহাসপটু, সুশ্রী, সুশ্রী কেন রীতিমত সুন্দরীই। আজ বারো দিন পর নখ-টখ পালিশ করে চুলে শ্যাম্পু দিয়ে, সিঁদুর টিপ পরে, নতুন গোল্ডেন সিল্ক টাঙ্গাইল পরে দেখাচ্ছে দারুণ! টকটক করে আসত, টুকটুক করে কথা বলত। কিন্তু এই পিসিমাকে নিয়ে যেতে তার দম বেরিয়ে যাচ্ছে। একেই তো তিয়াত্তরের ওপর বয়স হয়েছে। মাথাটি সাদা কালো কদম ফুল। বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বিচির মতো এক পেল্লাই সাইজের মাড় খড়খড়ে থান পরিয়েছে ভাইঝি আর ভাইপো বউয়েরা মিলে, পায়ে বাত, দাদাটি গত হবার পরই পিসিমা যেন হঠাৎ করে আশি পেরিয়ে পড়েছেন। জড়ভরত পুঁটলির মতো। চোখ চলে না, পা চলে না। অতীশ বিরক্ত হয়ে বলল, তোমার কি কুশ পা না কি গো, পিসিমা! এত ফ্যাশনের কাপড়ই বা তোমাকে পরাল কে! এ যে কুইন এলিজাবেথের গাউনের মতো চারদিক থেকে ফুলে রয়েছে! যাচ্চলে!
