ভয়ে, বিস্ময়ে মূক জনতা ফিরে যেতে থাকে, জানে না গিনেস বুকে লিপিবদ্ধ করবার মতো একটা প্রাকৃতিক ঘটনা তারা প্রত্যক্ষ করল আজ। কিন্তু ও কী? স্তব্ধ ভোরের বিস্ময় চিরে তীব্র মড়াকান্না উঠছে না তিন দিক থেকে? কেন? যার যার নিজ নিজ শোবার ঘরে রক্তাক্ত যন্ত্রণাবিকৃত তিনটে আতঙ্কস্থির মৃতদেহ আবিষ্কার করেছে তাদের স্বজনবর্গ।
বস্তুত মানুষ সংখ্যায় অগণ্য, ক্ষমতায় কালান্তক ও বুদ্ধিতে বেস্পতিতুল্য হলেও সেই তিমিরেই থেকে যায় যে তিমিরে অদ্যাপি ছিল, কেননা সে নাকে-তেল কানে তুলো দিয়ে জেগে জেগে ঘুমোয়। কিন্তু পিপীলিকাদি প্রাচীন ঐতরেয়গণ এখনও বাতাসে পাপের গন্ধ পান।
পিসিমা
ব্রাহ্মণ ভোজন গতকাল হয়ে গেছে। এলাহি লোকজন। আজ নিয়মভঙ্গ। নয় নয়। করেও আড়াইশোর কাছে লোক হয়ে গেল। বাড়ি-বর্গে নিজেদের গুষ্টিই তো। পঞ্চাশের ওপরে। তার ওপর এতগুলি কুটুম। পাড়ার লোকও আছে।
অনীশ বলল, ওদের মাছ-ভাত না খাওয়ালে বাবার তো মান থাকতই না, আমাদেরও না। করেছে অনেক।
দীপিকা বা দীপু বলল, একশোবার। বাবা অদড় হয়ে পড়েছিল। তোমরা ছেলেরা তো কোনকালে ভেগে গেছ। পাড়ার এইসব কেষ্টা, বিষ্ণু, গনু, ভোঁদড়— এরা না থাকলে বাবার ডাক্তার বদ্যিটুকুও সময়ে অসময়ে হত কি-না সন্দেহ। পিসিমা মেয়েমানুষ বই তো নয়।
কথার মাঝখানটা অনীশের খট করে লেগেছিল। দীপুটা চিরকালের অপ্রিয়বাদিনী। সে তো স্বীকারই করছে সে করেনি। তার করার অবস্থা ছিল না। কর্মস্থল যদি কারুর হোসিয়ারপুর পাঞ্জাব হয় তা হলে বাবার দেখাশোনার জন্য শ্রীরামপুর ঋষি বঙ্কিম সরণি ঘড়ি-ঘড়ি দৌড়ে আসা নিশ্চয়ই সম্ভব নয়। বরঞ্চ যারা অপেক্ষাকৃত কাছেপিঠে থাকে তাদেরই উচিত ছিল নিজেদের মধ্যে একটা সমঝোতা করে নেওয়া এ ব্যাপারে। দীপিকার টিপ্পনীর উত্তর অবশ্য দিল অনীশের বউ, দীপিকার বউদি। কুমিল্লার মেয়ে, তার কথার বাঁধুনিই আলাদা। বলল, তা দিদি, তোমার বড়দা তো সংসারের সবার সুসারের কথা ভেবে ভেবে কোনকালেই গেছেন, কিন্তু মেয়েরাও তো আজকাল সম্পত্তির ভাগ পাচ্ছে। দেখাশোনার বেলা বুঝি শুধুই ছেলে!
দীপিকা মুখ শুকনো করে জবাব দিল, তোমার যদি আমার ছেলের মতো একটি গুণধর থাকত! তা হলেই একমাত্র বুঝতে বউদি আসানসোল থেকে শ্রীরামপুর য ঘন্টারই রাস্তা হোক, ঘন-ঘন বাপেরবাড়ি আসার ভাগ্যি আমার নয় কেন।
অতীশের বউ শুক্লা আমুদে মানুষ, ঝগড়াঝাঁটি, মনকষাকষি পছন্দ করে না। সে হেসে উঠে বলল, এসে অবধি দেখছি দিদি তুমি সব ব্যাটাকে ছেড়ে বেঁড়ে ব্যাটাকে ধরার মতো বুবুলরামকে ধরেছ। কেন? কী করেছে সে!
কী আর করবে ভাই! কিছুই করেনি। শুধু প্রতিদিনকার রুটিনটা ওর রক্তাক্ষরে লেখা। আজ ভুরুর ওপর ট্যাংরা মাছের কাঁটা। কাল কুঁচকিতে ডিউস বল, পরশু হাত বঁটির ওপর পড়ে দে-গঙ্গা নে-গঙ্গা। এদিকে পাড়া থেকে ওদিকে স্কুল থেকে নালিশের পর নালিশ। যাই হোক না প্রতি বছর ফার্স্ট হয়ে ক্লাসে উঠছে, তাই অত শয়তানির পরও স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেয়নি।–পুত্রগর্বে এই সময়ে দীপুর মুখ চকচক করতে থাকে।
এত দুষ্টু বুবুলরাম? কই দেখলে তো মনে হয় না!
কথাটা অন্য খাতে বওয়াতে পেরে দীপু বেশ খুশি হয়ে গিয়েছিল। সে তো দাদার সঙ্গে ঝগড়া করতে চায়নি। মাঝে মাঝে একটু কুটুস-কামড় দিতে তার ভালো লাগে। সে বলল, দুষ্টু মানে? বলছি না শয়তান! শয়তান! তার ওপরে বালির বস্তায় ঘুষি মারছে দু-বেলা, আমাকে উবু করে বসিয়ে মাথার ওপর দিয়ে শাঁ করে বেরিয়ে যাবে, না কি ক্যারাটে শেখা হচ্ছে। ক্লাবটি তো হয়েছে সোনায় সোহাগা।
দীপুর বোন অনীতা বা অনু দিদির পুত্রগর্বে গর্বিত বোধ করছিল। সাধারণত বোনে বোনে এসব ব্যাপারে একটা সহমর্মিতা থাকে। সে বলে উঠল, মেজবউদি, তুমি শোনোনি, বুবুল অল বেঙ্গল যোগকুমার হয়েছে গত বছর। যোগাসনে চ্যাম্পিয়ন। কী শক্ত শক্ত আসন করে তোমার দেখলে মাথা খারাপ হয়ে যাবে। সার্কাসের প্লাসটিক বডিকে হার মানায়।
শুক্লা চোখ কপালে তুলে বলে, বলো কি অনু, ওইটুকু ছেলের এত গুণ। বুঝতে পারিনি তো! আমরা জানতুম লেখাপড়াতেই ভালো।
মহিলাদের আড্ডা যথারীতি ছেলেদের গুণগানে পৌঁছেছে দেখে অনীশ এই সময়ে বিরক্ত হয়ে ঘর ত্যাগ করছিল। অতীশ এসে বলল, দাদা, তুমি এখানে করছ কি? বাবার বস দাসসাহেব অফিসের আরও কয়েকজনকে নিয়ে এসে সেই কখন থেকে বসে আছেন। দাসসাহেবকে মনে আছে তো!
দাসসাহেবকে মনে থাকবে না, কী যে তুমি বলো রন্টু! উনি তো আমাকে গাইড করেছেন অল্প বয়সে। ওঁর কথাতেই তো আমি কমপিটিটিভ পরীক্ষার দিকে যাই। ডাকবে তো আমাকে!
লম্বা কোঁচাটা সামলাতে সামলাতে ন্যাড়া মাথায় সন্ন্যাসী সন্ন্যাসী চেহারার দুই ভাই অবিলম্বে শশব্যস্ত বেরিয়ে গেল।
ছোটো বোন ঈশিতা বা ইতুর সঙ্গে দালানেই ঠোকাঠুকি হয়ে গেল দাদাদের। সিঁড়ি দিয়ে উঠেই দোতলার বড়ো হলঘর, নিমন্ত্রিতরা সেখানেই বসেছেন। ইতু তাঁদেরই আপ্যায়ন করছিল। দাদাদের সঙ্গে দেখা হতে হাত মুখ নেড়ে বলল, এই যে গৌর-নিতাই ওরফে জগাই-মাধাই, কোথায় যাওয়া হচ্ছে দু-জনের হন্তদন্ত হয়ে! ফার্স্ট ব্যাচ বসাতে হবে সে খেয়াল আছে!
অতীশ বলল, তুই তো এক্সপার্ট, যা না, দীপু অনু বউদি এদেরও ডেকে নিয়ে যা, শুক্লাটাকে ডাকিস না। উলটোপালটা করবে।
