শেখ সাহেব বললেন, কিন্তু আপনার অভ্যাস নেই, বড্ড যে কষ্ট হবে বাবুমশাই!
তুড়ি দিয়ে সে কথা উড়িয়ে দিয়ে বাবুটি হেসে বললেন, আজই ধপধবে জামাকাপড় দেখছেন, গাড়ি দেখছেন মশাইরা। গোটা জীবনটা যে বনজঙ্গলে চাষিভাইদের ঘরে কাটিয়েছি! তাঁদের কাঁজি আমানিই মেরে দিয়েছি নুন লঙ্কা দিয়ে। ছারপোকা ভরতি চারপাইতেই অঘোর ঘুম ঘুমিয়েছি। সকালবেলা দেখি সারা গায়ে বিজবিজ করে মরে রয়েছে ব্যাটারা। এত রক্ত খেয়েছে, এত রক্ত।
আপনি টের পেলেন না?
টেরটিও পেলাম না। সে ঘুম কি যে সে ঘুম? যাকগে সে কথা, আমি পরানের দাওয়ায় শুয়ে থাকব, হাসানের মা একটু যা হোক দেবে। ওতেই ঢের হয়ে যাবে।
কিন্তু বাবুমশাই আপনার কষ্ট না হলেও ওদের যে কষ্ট হবে গো! পণ্ডিত বললেন।
সে কী? ওদের কী কষ্ট?
ওদের তো নিজেদের চারপাই আপনাকে দিতে হবে। নিজেদের ভাগের অন্ন!…
মহা কোলাহল শুরু হল। শেষ পর্যন্ত অনেক বাগবিতণ্ডার পর ঠিক হল— চারপাই দেবেন হরেন ঘোষ, তার সঙ্গে একপ্রস্ত বিছানা। রাতের খাবার শেখ সাহেব। সকালের জলখাবার গদাই পণ্ডিত। তারপর বেরোবার আগে মধ্যাহ্নভোজটি খাওয়াবেন স্বয়ং হারু ঘোষ। কিন্তু বাবুর এক গোঁ, উনি হাসান মিঞা কিংবা পরান মণ্ডলের দাওয়ায় গায়ে মশার তেল মেখে শোবেনই শোবেন। তা, তাই তাই। বদর, গুছাইত, আসাদ, নিতাই, কালো সব চোখে চাওয়াচাওয়ি করতে করতে ঘরে গেল। এমন ধারার বাবুমশাই তারা কোনো ভোটের আগেই দেখেনি।
মঞ্চ বাঁধা হল। মাইক্রোফোন হল। জাতীয় পতাকা এল।
এই গরিবি, এই ভুখা, এই ব্যামো আর দেখতে পারা যাচ্ছে না। আপনাদের বৃথা স্বপ্ন দেখাব না। বলব না পাকা বাড়ি, নদীবাঁধ, বড় ইস্কুল, হাসপাতাল, গোলাভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ…এসব আমরা চক্ষের নিমেষে করে দেব। কিন্তু দূষণমুক্ত পানীয় জল, সস্তায় শিক্ষা, সস্তায় বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা এগুলোতে আপনাদের জন্মগত মৌলিক অধিকার। কেউ দেবে না। আপনারা বুঝে নেবেন আপনাদের হিসেবের কড়ি। আমরা শুধু পাশে থাকব। যতদূর পারি সাহায্য করব। করবই।
বক্তৃতা প্রতিবারই হয়। লোক জড়ো হয় নিছক কৌতূহলে। কিন্তু এবার জয়জয়কারের মধ্যে দিয়ে বক্তৃতা শেষ হল।
ক-দিন পর পঞ্চায়েতের ভোটাভুটি রুটিনমতো শেষ। নিশ্চিন্দি। বাবুমশাই হাসান মিঞার কবরে নিজের সংবর্ধনার মালাটি এবং পরানের বাবাকে মঞ্চের জাতীয় পতাকাটি দিয়ে গেলেন।
এই সময়ে নতুন ও অভাবনীয় আর একটি শোকের কারণ ঘটল।
খবর এলো পরান কয়েদে আত্মহত্যা করেছে। উঁচু জানলার গরাদে নিজের পরনের শাড়িটি (জেলে যাবার সময়ে বউয়ের একটি শাড়ি পরে গিয়েছিল পরান) বেঁধে ঝুলে পড়েছে।
সারা গ্রাম চুপ। আর কদিন পরই কেস উঠবে। পুলিশ ফটক থেকে হাজতে যাবে পরান। এর মধ্যে কী করল? সে কি মরিয়া প্রমাণ করিল যে সে মারিয়াছে? বেশিরভাগ লোকেরই এখন এই সন্দেহ হচ্ছে। ঠিকই, দুই স্যাঙাত যেন ইদানীং বড্ড গুজগুজ ফুসফুস করত! ওরই মধ্যে সুতোটি লুকিয়ে আছে। পরানের মা আর কাঁদতে পারে না। তার শুকনো তোবড়ানো মুখের দিকে চেয়ে পরানের বাপ বলল, কী জানি বউ, জোয়ান ছেল্যাদের ভেতরে কী হচ্ছে না হচ্ছে বাপে-জ্যাঠায় তার কটুকু জানে?
গভীর রাতে শেখ আমিনের সুখনিদ্রা ভঙ্গ হল। কীসে যেন বড্ড কামড়াচ্ছে। টর্চ জ্বেলে দেখবার চেষ্টা করেন। দেখতে পান না। কনুইয়ের ভাঁজে, গলায়, ঘাড়ে, হাঁটুর নীচে, গুহ্যদ্বারে। কী রে বাবা! এমন খাসা বেলুনের মতো লাইলনের মশারি—তার ভেতর ডাঁশ আসবে কোত্থেকে? তবে কি বিবিজান ঠিকঠাক গোঁজেননি? অভিসম্পাত দেন তিনি। ছারপোকা না কি? বাবুমশাইয়ের ছারপোকার গপ্পো মনে পড়ে গেল। ছার হওয়াই সম্ভব। এখানে সেখানে দু চারটে চাপড় মেরে, আঙুল দিয়ে আঁধার পিষে ঘুম যান। দূর ছাই, ঘুম কি হয়। জ্বালিয়ে দিচ্ছে একেবারে। আবার টর্চ জ্বালেন, ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখেন। চক্ষু স্থির হয়ে যায়। বিছানাময় থিকথিক করছে টকটকে লাল বিষ পিঁপড়ে। আতঙ্কে মশারি খুলে বাইরে আসেন হারু ঘোষ। জামা কাপড় ক্রমে ক্রমে খুলে একেবারে নাঙ্গা হয়ে যান। ঝাড়তে থাকেন, মারতে থাকেন, ফু দিয়ে চিপটে, চাপড়ে। কিছুতেই শালারা নড়ে না। চারটে মরে তো চল্লিশটি রক্তবীজ তার জায়গা নেয়। গোঁসাই তাঁর ধর্মপত্নীকে ডাকতে যান, ছেলেমেয়েদের নাম করে চ্যাঁচান, গলা বেরোয় না। মুখগহ্বর দিয়ে, নাসাবিবর কর্ণবিবর দিয়ে শরীরের ভেতরে লংমার্চ করতে করতে ঢুকে যাচ্ছে রক্তলাল পিপীলিকা বাহিনী। অসহ্য যাতনায় মেঝের ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে যান।
ভোরবেলা। ঘরে ঘরে লোক জেগে উঠেছে, দাঁতন চিবোচ্ছে কেউ, বলদে লাঙল জুতছে কেউ, গোরুবাছুর হামলাচ্ছে, পাখ-পাখালি মনের সুখে গলা সাধছে, ঊর্ধ্বশ্বাসে জঙ্গলের দিক থেকে ফিরে আসে তারা, যারা গিয়েছিল। গাড় হাতে, বদনা হাতে। কী রে? কেন গো? না শাড়ির লাল পাড়ের মতো টসটসে লাল, অস্বাভাবিক বড়ো পিঁপড়ের সারি ঢুকছে জঙ্গলে। আসছে গাঁয়ের ভেতর থেকে। একটা নয় দুটো নয়, তিনটে। জঙ্গলের দশ বারো গজ দূরে ত্রিবেণির মতো তিনটি ধারা মিশে যায়। চওড়া হয়ে যায়, আশে তাকায় না পাশে তাকায় না। অনম্য শৃঙ্খলার সঙ্গে ঢুকে যেতে থাকে সেই ঝোপটির তলাকার গর্তে যার ওপাশে পরান আর ওপাশে ছিল হাসান। মাত্র কদিন আগে।
