গদাধর টিকি নেড়ে বললেন, এ আপনার অন্যাই অন্যায্য কথা উকিলবাবু। গরিব বড়োলোক সর্বত্তর থাকবেই, ও আপনি যতই কেন সাম্য করুন। দেখতে হবে মিলমিশটা আছে কিনা। এই যে আপনাকে সব চাঁদা করে ফি দেওয়া হল, তা কি হত যদি এক মন এক প্রাণ একটি না থাকত! নিজ কথা নিজ মুখে বলতে নাই…কই রে তোরা বল না!
পরানের বাবা নেপু মণ্ডল চোখ মুছে বলল, তা সত্যি কথা বাবু, ও ঘোষমশাই আর পণ্ডিত মশাই-ই আপনার ফিস-এর বারো আনা দিচ্ছেন, আমার পরানকে ছাইড়ে আনার জন্যে।
ভালো—উকিল বললেন, তা এ তো দেখছি মিক্সড গাঁ। হিন্দু-মোছলমান সম্পক্ক কেমন? দুই কমিউনিটি হয়তো ভেতরে ভেতরে খেপে আছে। হাসানের খুন হল গিয়ে দাঙ্গার প্রথম স্টেজ।
কথা শেষ হতে না হতে তড়াং করে উঠে দাঁড়ায় সুরেন, বদর। তেরিয়া গলায় বলে—খবর্দার।
রবিউল, নিতাইপদ, ওমর, কালোবরণ যে যেখানে ছিল যার যার মতো কসম খেলো, ওসব পাপ-কথা আমাদের বলবেন নে। যদি বলো কেন তো আমরা সব এক দরের লোক—পুজোই করি আর নামাজই করি। দুটো ভাতের জোগাড় করতে জিব বেরিয়ে যায়। আবার দাঙ্গা!
গদাই পণ্ডিত বললেন, ঠিকই তো, ঠিকই তো—আসাদ, সুরেন, বদর ঠিক বলেছে। এ গাঁয়ে আমিই একমাত্তর বিশুদ্ধ ভটচায্যি আর সব…
খুন হতে হলে তালে আপনাকেই হতে হয় বলছেন?
উকিল চতুর হেসে পণ্ডিতের দিকে তাকালেন…আপনিই প্রকৃত মাইনরিটি!
খখুন কেন? ওরে বাপরে…এসব কী অলুক্ষুনে কথাবাত্রা আপনার? রামঃ।
গদাই যেমনই ভয় পেয়েছে তেমনই চটেছে।
দুঃখের কথা ভুলে দু-চারজন মুচকি মুচকি হাসতে লাগল। উকিলের ইশারায় এবার শেখ আমিন তার দশাসই চেহারা মেলে উঠে দাঁড়াল। বাজের মতো গলায় বলল, মদিনা বিবি, ময়না-বউ সত্যপিরের কসম খেয়ে বলল দিকিনি এ ব্যাপারে তোমরা কিছু জানো কি না! ভয় কিছু নেই।
দুই বউ ঘোমটার আড়ে এ ওর মুখে চায়। বলে কী! ঘরের মানুষ খুন হল বনজঙ্গলে, আমরা জানব কী?
শেখ আরও গম্ভীর গলায় বলল, পুলিশ সন্দেহ করছে ময়না বউয়ের সঙ্গে হাসানের…
বউগুলি তো ছেলেমানুষ! ময়না-বউয়ের শাশুড়ি এবার একটা বাঁকারি নিয়ে তেড়ে আসে। বাতাসে শপাত করে চালায় আর রক্তচক্ষে বলে, মোদের এক ছেল্যা অক্ত গঙ্গা, আরেক ছেল্যা পুলিশের ঠ্যাঙায়। ইয়ার্কি পেয়েছ শেখ? দেখে নিবো। অন্যের বিবি-বউয়ের দিকে কোন ভামের নজর সে হাঁড়ি হাটে ভেঙে দিব না কি?
লোক সব মুচকি মুচকি হাসল। তেমন কিছু নয়। ও শেখসাহেবের একটু দোষ আছে। বউ মানুষ কি ডবকা মেয়ে একা পেলে দুটো বেশি কথা কন। তা সে দোষ কি আর কারও কারও নেই?
উকিলবাবু বললেন, আহা রাগ করছ কেন পরানের মা। আমি সত্য বার করবার চেষ্টা করছি। সত্যি-সত্যি কি কাউকে দুষেছি! যাক, এখন তা হলে দাঁড়াল—এ গাঁয়ে পার্টিপুটি নেই, হিন্দু-মোচলমান নেইকো। পিরিত-আশনাই তা-ও নেই, জমিজিরেত নিয়ে হল্লাগুল্লা কিছু না, তবু শেষ রাতের ঝুঝকো আঁধারে একটা লোক খামোখা খুন হয়ে যায়। কেউ তাকে খুন করেছে পেছন থেকে, তারই হেঁসো দিয়ে তারপর সেটি দশ হাত দূরে কাদায় নিক্ষেপ করেছে, কিংবা পুঁতে দিয়ে এসেছ। আর হবি তো হ সে লাশ প্রথম দেখল কি না তারই স্যাঙাত। ভূতে করে গেছে বোধহয়!
দেখো সব, সাক্ষীসাবুদ নেই, তবু পরিস্থিতি যা দাঁড়াচ্ছে মার্ডার ইন ডিফেন্স দাঁড় করানো যেতে পারে। কোনো কারণে হাসান পরানের ওপর ক্ষিপ্ত ছিল। সে পরানকে আক্রমণ করতে আসে, পরান জোয়ান বেশি, সে হেঁসো কেড়ে নিয়ে হাসানের গলাতেই বসিয়ে দেয়। তারপর যা-যা করবার করে। আত্মরক্ষার খাতিরে খুন করলে ফাঁসি হবে না, যাবজ্জীবনও হবে না। কিন্তু কথাটি তো বাবাজিকে স্বীকার করতে হবে! ইতিমধ্যে আবার যদি সাক্ষীসাবুদ বেরিয়ে পড়ে, পড়তেই পারে, তা হলেই সর্বনাশের মাথায় পা। এখন গ্রামের মাথা যারা আর পরানের বাপ তোমরা তাকে কবুল করাও। তারপর দেখছি তার সাজা কমানোর জন্যে কী করতে পারি।
পরানের বাপ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে, কাজটি সে করেনি, তবু তাকে কবুল যেতে হবে?
কী করে জানছ করেনি?
আমার ছেল্যাকে, তার স্যাঙাতকে আমি জানব না?
আরে বাবা, জোয়ান ছেলেদের ভেতরে কী চলছে না চলছে সে আন্দাজ করা কি বাপ-জ্যাঠার কম্মো —উকিল ডিবে থেকে জোড়া পান বার করে মুখে পোরে।হাসান কেন হেঁসো নিয়ে জঙ্গলে যায়? শৌচকার্য করতে কি হেঁসো লাগে?
এই সময়ে দূর শহর থেকে একটি বাবুমশাই আসছিলেন সাদা অ্যামবাসাডর চড়ে। পরনে পরিষ্কার বাঙালি ধুতি পাঞ্জাবি। আধ মাইলটাক দূরে দাঁড় করাতে হল গাড়ি। খারাপ রাস্তা। কাদা, কাঁটা জঙ্গল খুব। জিপ নিয়ে এলেই হত। ধুতি-পাঞ্জাবি হাঁটু অবধি তুলে বাবুটি এলেন, সঙ্গে কিছু সঙ্গীসাথি। হাসি-হাসি মুখখানি, দেখলেই বোঝা যায় মনটা সাদা, খুব মায়াও শরীরে। গাঁয়ে অতিথ। সব ঘটনা গোড়ার দিকে শুনে বললেন, ঘোষমশাই, আমায় মাফ করবেন, আমি আপনার বাড়িতে থাকতে পারছি না।
কেন? কী অন্যাই আমি করেছি বাবু?
আরে না না, অন্যায় করবেন কেন? হাত তুলে হারু ঘোষকে আশ্বস্ত করেন তিনি, এলাম একটা শুভ কার্যে আর তার আগেই এমন মর্মবিদারক ঘটনা ঘটে গেল? আসলে আমি হাসান আর পরানের ফ্যামিলির সঙ্গে থাকতে চাই। ওদের এই দুঃখের দিনে…তিনি চুপ করে গেলেন।
