গ্রামের তিন মাথা চিন্তিত, বিষাদগ্রস্ত মুখে চেয়ে থাকে। অজ পাড়াগাঁয় মানুষ তারা। পঞ্চায়েত-প্রধানই হোক আর সংস্কৃতজ্ঞ পুরুতঠাকুরই হোক। পুলিশে ধরলে কী করতে হয় না হয়, তেমন জানা নেই। এ ফৈজত তো ছিল না এখানে।
অবশেষে তিনজনে পরামর্শ করে সদরে যায়, উকিল ভাড়া করে।
আমাদের ঘরের ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে হবেই উকিল স্যার।
জোড় হাত করে শেখ দাঁড়িয়ে থাকে যেন উকিল স্বয়ং আল্লার রসুল। গদাধরও জোড়হস্ত। নেহাত বামুন তাই পায়ে পড়তে পারছে না। কিন্তু মুখখানি যারপরনাই কাতর। হারু ঘোষ আসেনি বটে, কিন্তু উকিলের খরচ মেটাতে সবচেয়ে বেশি চাঁদা সে-ই কবুল করেছে। না করেই বা করে কী! গরিবগুর্বো লোক সব। চাষিভুষো। সরকারের কাছ থেকে কিছু জমির পাট্টা পেয়েছে ঠিকই কিন্তু বীজ কই? সেচের জল কই? সার কই? যদি বলো পঞ্চায়েত তো আছে। গরমেন্টও তো দিচ্ছে। দিচ্ছে একশোবার, কিন্তু পঞ্চায়েতের কি একটা হ্যাপা? এই বান ডেকে গেল তো এই আবার রোদের জ্বলুনি। এই ডেঙ্গুর মড়ক তো এই টিউকলে বিষ উঠছে। মানুষ যায় কোথায়? যাক হারান গাঁয়ের মাথা, সে দায়-দায়িত্ব এড়াতে পারে না, চায়ও না। এর বদলে সে যে সারা গাঁয়ের মান্যিগন্যি পাচ্ছে?
শেখসাহেব আর গদাপণ্ডিত কখন আসে, কখন আসে। সারা গাঁ পথ চেয়ে রয়েছে। হারু ঘোষ আপন গোলার পাশটিতে কাঠের চেয়ারে বসে আছে। পরানের বাবা পেছন চুলকোতে চুলকোতে বলে উঠল, কী পিমড়ে, কী পিমড়ে! হারুদাদা কী পিমড়েই না হয়েছে তোমার উঠোনে। এ যে করাতের কামড় গো!
যা বলেছিস নেপু, আমাকেও ক-দিন যেন বড্ড কামড়াচ্ছে! মিনিটা চাদ্দিকে এঁটোকাঁটা ছড়িয়েছে বোধহয়। ওরে ও করালী, কেরোসিন জল ঢেলে উঠোনটা মুছে দিয়ে যা না?
গরম পড়লেই এই বিপদ। পিঁপড়েরও গরম লাগে, সে গর্ত থেকে বেরিয়ে মানুষের বিছানাপাতির ঠান্ডা খোঁজে। আর ফাঁকতালে ঠান্ডা গায়ের গরম রক্ত খেয়ে নেয়। মজা হল এই যে, পুত্রশোকে মানুষ নাকি ক্ষুধাতৃষ্ণা ভুলে অসাড়মতো হয়ে যায়—এমনটাই শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল খুনের আসামি ছেলের কাতর বাবা পিঁপড়ের কামড়টুকুও সইতে পারছে না। ধুত্তেরি ছাই বলে নেপু মণ্ডল কিছুক্ষণ পরেই উঠে পড়ল।
এদিকে পুলিশের হয়েছে মহা ঝামেলা। এ শালা সমানে থার্ড ডিগ্রি খেয়ে যাচ্ছে। জিব বেরিয়ে যাচ্ছে তবু বলবে না মদিনার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক হয়েছিল। ও সি মমতাময় সবজান্তা হাসি হেসে বলেছিলেন, আরে গাড়ল, এতে লজ্জা পাচ্ছিস কেন? এ তো হয়েই থাকে! ইয়ারবকশি বিবি তো এক হিসেবে তোরও বিবির মতন। একটু আধটু ফস্টিনস্টি করেছিস বই তো নয়! তাতেই হাসানের অত খচে যাবার কী হল! একেবারে খুন করব বলে শাসানি! ভোরবেলায় ডাক দিয়েছে যাতে কাকপক্ষীটিও টের না পায়। নাও এখন বোঝো ঠ্যালা, নিজের হেঁসোয় নিজেই খুন প্রসঙ্গত হত্যার অস্ত্র সেই হেঁসোটা বুজিড়োবার কোনো অগভীর জলার কাদা থেকে উদ্ধার হয়েছে, দেখা গেছে ওটি হাসানেরই।
শেখসাহেব, হারু ঘোষ এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছে। তবে কি হাসান কোনো গোপন কারণে আত্মঘাতী হল? গদাধর কথাটা উড়িয়ে দিয়েছে। নিজের ঘাড়ে কোপ দেবে তারপর দশ হাত দূরের কাদায় হেঁসো পুঁতে আসবে এমন আত্মঘাতী এখনও ভবিষ্যতের গর্ভে।
যাই হোক, ও. সি বাবুর কথায় মার-খেয়ে-সর্বাঙ্গের-ছাল-উঠে-যাওয়া পরান ঝেঝে বলে, ও তোমাদের ঘরে হয় গো পুলিশবাবু। দোস্তের বিবির সঙ্গে কথা বলতেই মোরা চোখ নীচে থুই। হাসান শাসানি দিয়েছিল এমন মিছে কথা আমায় মেরে ফেললেও বলতে পারবোনি। ওরে হাসান রে…হাসানের নাম ধরেই ডুকরে ওঠে পরান। এবং ও.সি দাঁতে দাঁতে ঘষে বলেন, বজ্জাতের ঝাড়, কথা বলতেই চোখ নীচে থুই, কলির লক্ষ্মণ!
তবে একটা কেস পুলিশ দাঁড় করিয়েছে ঠিকই। বনবাদাড়, জলাজঙ্গল, কাকপক্ষী ডাকেনি, পরানের হাতে গাড়, হাসানের হাতে হেঁসো, হাসান খুন, পরান আবিষ্কারক, দুজনে ঘরেও পড়শি, জমিজমাতেও পাশাপাশি। দু-জনেই বর্গায় জমি পেয়েছে, সোনা ফলাচ্ছে। পরানের গতর, হাসানের মাথা। একটা না একটা সুতো এর মধ্যেই আছে। আসামি পরান মণ্ডল সদরে চালান হয়ে গেল। পুলিস ফাটকে। কেস উঠবে মহামান্য সরকার বনাম পরানকেষ্ট মণ্ডল। কাদাগোলদিয়া চাঁদা তুলে উকিল দিয়েছে, ঘোড়েল উকিল। হাঁ করলে কথা বুঝে যায়।
বলে, শুনুন মশাই। কোর্টে কেস ওঠবার আগে আমি আপনাদের এখানে জেরা করতে চাই। বলুন দিকিনি গ্রামে কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা আছে কি না।
হায় আল্লা–শেখ আমিন বললেন, হোল কাদাগোলদিয়া এক রং, এক মন, এক প্রাণ। তাতেই না গাঁয়ের এমন রবরবা!
আপনি পঞ্চায়েত-প্রধান আপনি তো বলবেনই। তা ছাড়া রবরবা বলতে তো কিছু আমি দেখতে পাচ্ছি না। একটা ভালো পুষ্করিণী নেই, নদী মজে এসেছে, ক টা মাত্র পাতি কুয়ো, বড়ো চাষিদের কিছু শ্যালো ম্যালো আছে হয়তো, রাস্তায় গোছডোবা কাদা, অর্ধেক লোক মজুর খাটে। আপনি ঘোষমশাই না হয় সম্পন্ন লোক, নিয়মিত মাদার ডেয়ারিতে দুধ সাপ্লাই দিয়ে থাকেন—চোখ মটকে শেখের দিকে চাইল উকিল—আপনার কথাও স্বতন্ত্র। আপনার হাত দিয়েই তো সরকারি টাকার বিলিবন্দোবস্ত হয়। কিন্তু আর সব? বেশিটাই তো হাঘরে-হাভাতে।
