ক্রমশই লোক জমে, ছেলেবুড়ো, ব্যাটাছেলে মেয়েছেলে যে যেখানে আছে। একটা মৃদু জোঁ-ও-ও মতো আওয়াজ। এত লোকে শ্বাস ফেললেও তো একটা আওয়াজ হয়! বাস, নইলে সব স্তব্ধ। কে মারল, কেন মারল, কখন মারল— এসব প্রশ্ন এখনও ওঠেনি। বীভৎস মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে সব বোবা হয়ে গেছে। এমনকি হাসানের বউ, মা পর্যন্ত। ঠিক যেন বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না। এরা কেউ কখনও খুন হয়ে যাওয়া মানুষ দেখেনি তো! এ যেন একটা সিনেমা! মারপিট, রাগারাগি দেখেছে। কিন্তু হয় গদাধর পণ্ডিত, নয় শেখ আমিন, নয়তো রাশভারী হারান ঘোষ মশাই সেসব থামিয়ে দিয়েছেন। স্তবকবচমালা গড়গড় করে বলে যাবে গঙ্গাজল ছিটোতে ছিটোতে। তুমি কমা দাঁড়ি পাবে না। শেখ সাহেব পঞ্চায়েত-প্রধান—তাঁর কাজই হল গরমেন্টের গ্রান্ট সব ভাগবাটোয়ারা করা, ঝগড়া-কাজিয়া থামানো, ছোটো-আদালত হলেন তিনি গাঁয়ের। আর হারান ঘোষ? প্রচুর গোধনের মালিক। ভূমিসংস্কারে সিলিং এর জমি চলে যাওয়ার পরে উনি দুধের কারবার ফলাও করেছেন। ধনীও বটে, আবার অভিভাবকও বটে সবার, ফাদার-ফিগার যাকে বলে। হারান ঘোবের কথা অমান্য করবে এত বড়ো বেয়াদব এ চত্বরে কেউ নেই। তা ছাড়া সবাই-ই পঞ্চায়েতের মেম্বার। কাদাগোলদিয়া ভাগ্যবিধাতা।
সংবিৎ ফিরে পেয়ে হাসানের মা ছেলের বুকের ওপর ঝাঁপাই ছুঁড়তে যাচ্ছিল। প্রধান তাকে অনেক কষ্টে থামায়।—অমন করো না হাসানের মা। এ এখন পুলিশ কেস। একটি জিনিসে হাত দিলে ফটকে উঠে যাবে, তাদের কাজের অসুবিধে হবে। তুমি তো চাও তোমার ছেলের খুনি ধরা পড়ক। না কি?
খুনি পেলে কি আমার ছেলাটা ফিরে আসবে গো-ও-ও-মদিনার শাশুড়ি আমিনা আর লোকলাজ মানে না, চুল ছিঁড়ে কাপড় ছিঁড়ে একশা করে। হন্তার শাস্তির চেয়ে নিহতের পুনর্জীবনের জন্য তার আকিঞ্চন অধিক। এই উথালপাথাল মড়াকান্নার আসরেই কাটা গাছের মতো ধড়াস করে পড়ে যায় বাক্যহীন হাসান বিবি মদিনা।
এতক্ষণে ব্যাপারটার নিষ্ঠুর নগ্ন বাস্তবটার মুখোমুখি হল সবাই। মুখর হয়ে উঠল শোকে, রাগে, প্রতিশোধ-স্পৃহায়। যথাসময়ে পুলিশ এল, মাপজোক, ফোটো, সরেজমিন তদন্ত যা করার করল। সাংবাদিকও এল ঝাঁকে ঝাঁকে।
কী দেখলেন পরানবাবু?
পরান বেচারি কিছুই দেখেনি। তখনও অন্ধকার, তবে তার চোখ-সওয়া। সে দেখেছে শুধু একজোড়া পা। রক্তগঙ্গার মধ্যে একখানা মুখ, একখানা ধড়। সেই হতভম্ব মুহূর্তে ঠিকঠাক চিনতেও পারেনি যে এ তারই হতভাগ্য সাঙাত।
তবে যে বলছিলেন আপনার দোস্ত হাসান মিঞা?
এই পুলিশি এবং সাংবাদিকি জেরার উত্তরে মূখ পরান কী বলবে? চিনতে না পারা! ছুট দেবার আগের ভগ্নাংশ মুহূর্তে চিনতে পারা, চোখ ও মনের এবং তাদের পেছনের মস্তিষ্কের এই জটিল ব্যবহার সে ব্যাখ্যা করে বলতে পারে না।
আমি খুন করিনি গো। আমি কিছু জানি না-চিকরে, ডুকরে ওঠে পরান। সবাই চোখ চাওয়াচাওয়ি করে, পুলিশ কঠিন চোখে তাকিয়ে থাকে। সাংবাদিক লেখে—কাদাগোলদিয়ার হাসান মিঞাকে হত্যার অপরাধে তার প্রতিবেশী ও বন্ধু পরান মণ্ডলকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। উদ্দেশ্য বোঝা যাচ্ছে না। প্রেমে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে।
গ্রেপ্তার করা আর প্রমাণ করার মধ্যে অবশ্য আসমান-জমিন ফারাক। কিন্তু খবরের কাগজ পড়া লোকেরা বড়ো কুঁড়ে। তাদের একটা খবর দিলেই সেটা গল্প করে গিলে নেবে, তারপর যখন-তখন উগরোতে থাকবে। যাক একটা খুন হয়েছে, খুনিও পাওয়া গেছে। মিটে গেল। তার কী-কেন নিয়ে লোকে ক-দিন মাথা ঘামাবে? তদ্দিনে আর কতকচাট্টি খুন ধর্ষণ তো খবরে এসেই গেছে!
এদিকে পরানের জেরা চলছে।
হাসানের বউ মদিনার সঙ্গে তোর আশনাই ছিল?
এমন কথা বললে তোমার জিব খসে পড়বে গো পুলিশবাবু।—এক লাথি বুটের।
এক সীমানা তোদের জমিনের। মাঝের শিমুল গাছটা নিয়ে অনেকদিনের মনকষাকষি। হাসানের মা বলেছে।
চাচির জিব খসে পড়বে গো এমন কথা বললে। শিমুল গাছ? শিমুল গাছ দিয়ে কী হবে গো! তেমন ছায়া পজজন্য নি। দুকুরবেলা শিমুলতলায় খেতে বসতুম মাথায় ভিজে গামছা বেঁধে। এত রোদ্দুর, এত রোদ্দুর, যেন শলার মতো ফুটতেছে।…
গ্রামের বোর্ডও বিশ্বাস করতে পারে না, পরান এমন কাজ করেছে। সে ষণ্ডাগন্ডা ঠিকই, রাগিয়েছ কি মাথায় খুন চেপে যাবে। বউকে সে যে মাঝে মধ্যে পিটুনি দেয়, ছেলে প্রাইমারিতে ফেল করেছিল বলে যে তাকে সে চোরের ঠ্যাঙানি দিয়েছিল, একথা সবাই জানে। কিন্তু মানুষটা এমনিতে খুবই নিরীহ। উপরন্তু পরান-হাসান মানিকজোড়। পরানের গতর আর হাসানের মগজ এই দুটি খুব ভরসার জিনিস এদের।
গদাধর পণ্ডিত বললেন, পরান এ কাজ করতেই পারে না।
শেখ আমিন বলেন, করবেই বা কেন? ধরো ভোরের বেলা মাঠ সারতে গিয়ে কোনো তু কথায় কাজিয়া লেগে গেল। মারামারি করবে? তো বদনা দিয়ে করুক। হেঁসো পাবে কোথায়? হেঁসো নিয়ে যাবে কেন?
হারান ঘোষ মোটা মানুষ। তায় ভয়ও পেয়েছেন বিলক্ষণ, হাঁপিয়ে-হুঁপিয়ে বললেন, সেকালে আগে থেকে একটা রাগ পোষা ছিল বলতে হয়।
গ্রামের মাথারই যখন এমন ধন্ধে পড়ে গেছে তখন অন্যে পরে কা কথা। মাঝখান থেকে হাসানের মদিনা আর পরানের ময়না কেঁদে বুক ভাষায়। হাসানের মা শয্যা নিয়েছে। পরানের বাপ দু-বেলা প্রধানের বাড়ি হাঁটাহাঁটি করছে।আর কেউ না জানুক, আপনি তো জানো পরান আমার হাট্টা-কাট্টা হলে কী হয় ভারি মায়াবি মানুষ, তার ওপর ভীতু, শেখ সাহেব ওকে আমার ছাইড়ে আনো।
