বিকেল নাগাদ মড়া-পোড়ানিরা সব ফিরে এল। মটর ডাল দাঁতে কেটে, নিম ছুঁয়ে, আগুন ছুঁয়ে যে যার মতো ঘরে গেল। পঞ্চুর ঘরে বাতি জ্বলছে। বউ মেঝে আঁকড়ে শুয়ে। মাথার কাছে মেয়ে দুটি কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়েছে। সুজন পরাণ দুই নাতি অনেক রাতে খুটখুট শব্দ পেয়ে ভূমিশয্যা থেকে উঠে দাঁড়াল। শোকাতাপা শরীর, ঘুম তো সহজে আসে না। যদি-বা আসে একটু আওয়াজেই খান খান হয়ে যায়। পরাণের ওপর আবার নতুন দায়দায়িত্বের দুর্ভাবনা। চাষবাসের বিশেষ কিছুই সে জানে না। তা বলে খুটখুট শব্দ এরই মধ্যে? চোর ডাকাত সব বোধহয় জেনে গেছে, এখন থাকার মধ্যে এক অথর্ব বৃদ্ধ, এক সন্তপ্ত বিধবা আর এক উঠতি বয়সের অকালকুষ্মাণ্ড যে নাকি বাপ-পিতেমোর ধারাও নেবে না, অন্য ধারা নিতে গিয়েও খালি মার খাবে। কুঞ্জমাঝির ভাষায় হেঁয়া।
দুজনে উঠে দাঁড়িয়ে পা টিপে টিপে ঘরের বাইরে আসে, লোহার ডান্ডা থাকে ঘরের কোণে, সেটাকে হাতে তুলে নেয় পরাণ। খুটখাট আওয়াজ আসছে দক্ষিণের দাওয়া থেকে। কুঞ্জর ঘরেই যতেক কাঁচা টাকা। নজর ওদিকেই হবে। দাওয়া ঘুরে পেছনে যেতেই দেখল চাঁদ চালের বাতা ছুঁয়ে দাঁড়িয়েছে। দাওয়া ফরসা। ঠাকুরদাদার ঘরের চৌকাঠে চোর হামাগুড়ি দিচ্ছে, তার বেটপ ছায়া পড়েছে দাওয়ার ওপর।
তবে রে! বিকট হাঁকড়ে উঠল সুজন।
চোরের কানে শব্দ পৌঁছেছে ঠিক। কিন্তু যতটা জোর হাঁক ততটা জোরে নয়। হাত থেকে ঠক করে কী যেন দাওয়ায় পড়ে গেল।
সুজন-পরাণ নীচু হয়ে বলল, একি। কী করছ গো ঠাকুদ্দা, এই দুপুর রেতে।
ফ্যালফেলে দৃষ্টি মাঝির দৃষ্টিহীন চোখে। ধরা পড়ার গলায় বলল, এই যে দাদা দুটো ঘোড়ার নাল, বেশ কালো কালো খয়াটে। ঠাকুরমশাই বলে গেল কিনা তোর বাপ দোষ পেয়েচে, দিষ্টি পড়বে, তাই দোরে নাল দুটো বাবলার আটা দে সেঁটে দিচ্ছিলুম।
পিঁপড়ে
কাদাগোলদিয়া গ্রামে একটা খুন হয়ে গেল। খবরের কাগজে খুন আর ধর্ষণের খবর অবশ্য নিয়ম করেই থাকছে। ব্রেকফাস্ট যেমন নিয়ম, সে চা-মুড়িরই হোক আর চা টোস্টেরই হোক, খুনও তেমন নিয়ম। হোটেলে জিজ্ঞেস করবে—ডিম কি সিদ্ধ না ওমলেট? পোচ না স্ক্র্যামবলড? তেমনি ধর্ষণ কি সিঙ্গল ধর্ষণ না গণধর্ষণ? শুধু ধর্ষণ না তারপরে খুনও? কী ধরনের খুন? গলা-ফলা টিপে, না কুচি কুচি করে কেটে? এইগুলোই হল যাকে বলে ডিটেলের কাজ। এগুলোর দিকেই মনোযোগ চট করে চলে যায়। শুধু খুন-ধর্ষণের খবর এখন বড়ো জোলো হয়ে গেছে। বস্তুত খুনের খবরটার চেয়ে অকুস্থলের নামটা কাগজ পড়য়াদের। আমোদ দিল বেশি। কাদাগোলদিয়া! আচ্ছা উদ্ভট নাম তো! এখন, পিচকুড়ির ঢাল যদি কোনো গ্রামের নাম হতে পারে, ঘোকসাডাঙা বলে যদি কোনো জায়গা থেকে থাকে তাহলে কাদাগোলদিয়া কী এমন দোষ করল? তবু লোকের হাসি থামতে চায় না। কাদাগোলদিয়া! ছেলেমানুষরা বলছে, বলটায় এত কাদা লেগেছে যে কাদার বল বলে মনে হচ্ছে। সেটাকেই কেউ কোনো সময়ে এক শটে গোলপোস্টে পাঠিয়ে দেয়। বুঝলি? কিংবা কাদা বলে একটা ছেলে গোলটা দেয়। কাদা গোল দিয়া।
কিন্তু অন্যে অপরে হাসছে বলেই তো কাদাগোলদিয়ার লোকে হাসতে পারে না। খুনটা তাদেরই গ্রামের প্রান্তিক বনবাদাড়ে হয়েছে কিনা! কোনো গুন্ডা বদমাশও নয়। গেছে এক মাঝারি চাষি বাড়ির চালাকচতুর করিৎকর্মা ছেলে হাসান। সব দিকে নজর ছিল হাসান মিঞার তা যদি বল।
বডি আবিষ্কার করে, পরান মণ্ডল। সে ভোরের দিকে মাঠ সারতে গিয়েছিল। যেমন যায়। সবাই জানে পরান রাত থাকতেই যায়। ঝোপের আড়ালে কার পা দেখে উঁকি মারে কে রে? নিজের আবরু ক্ষুণ্ণ হওয়াটা সে ভালো মনে করেনি। তা তারপরেই মাঠ মাথায় উঠেছিল। লুঙ্গি হড়কানো অবস্থায় সে দিগবিদিক জ্ঞানহারা হয়ে ছুটেছিল, খখুন। খখুন…
পুকুরের ধারে আছড়ে পড়ে অজ্ঞান হয়ে যায় পরান। খুন হওয়া কাউকে তো সে কখনও দেখেনি! আশ্চর্যের কথা হলেও কাদাগোলদিয়ার এই প্রথম খুন। কিছু কিছু লোকে তার চিৎকার শুনতে পেয়েছিল, কিন্তু কোথায় কে আগডুম বাগড়ম চ্যাঁচাচ্ছে ভেবে কিছু লোক আসেনি, কিছু আবার ভয় পেয়েছিল, খুনটা হয়ে গেছে এখন ঘটছে এইটা না বুঝতে পারাই তাদের ঠকঠকানির কারণ। কিছু লোক অবশ্য বেরিয়ে আসে, যেমন শেখ আমিন, মৃত্যুঞ্জয় মাঝি, রজব মণ্ডল, গদাধর পণ্ডিত, সুরেন গুছাইত। এঁরা দায়িত্বশীল ব্যক্তি, কলজেতে হিম্মত আছে। সহসা ভিরমি খান না।
কী হয়েছে রে পরান? কী বলছিস, এ কী দাঁতে দাঁতে লেগে গেছে যে! জল ঢাল, জল ঢাল, চামচে আন, চামচে আন!
কী হয়েছে বাবা!–শেখ আমিন মাথায় হাত বুলিয়ে স্নেহস্বরে জিজ্ঞাসা করেন, ভয় পেয়েছ? কেন?
বাক্যশূন্য পরান দূরে জঙ্গলের দিকে কম্পিত আঙুল তোলে।
অতঃপর দল বেঁধে সবাই জঙ্গলের দিকে চলে, সে জঙ্গলের নাম বুজিডোবার জঙ্গল। কাদাগোলদিয়া নামটা ব্যাখ্যা করা কঠিন, কিন্তু বুজিড়োবাটা তুলনামূলকভাবে সহজ। একটা বড়ো পুকুর বুজে বুজে জায়গায় জায়গায় দক হয়ে গেছে। সেই আধবোজা পুকুরের সৌজন্যেই হয়তো গাছ-আগছার এত বাড়বাড়ন্ত এখানটায়। আর তাই এই নাম।
হাসান পড়ে আছে, চিৎপটাং একেবারে। কোপটা গলার পেছনে, অর্ধেকটা হাঁ হয়ে রয়েছে। সামনে থেকেই বোঝা যাচ্ছে, রক্ত কালচে বেঁধে আছে চারপাশটায়। চোখ যদিও খোলা, তবু মনে হয় না খুনিকে দেখতে পাওয়ায় কোনো ভয়ভীতি বা বিস্ময় সে চোখে আছে। পেছন থেকে ঝোপ বুঝে কোপ, সঙ্গে সঙ্গে ধড়মুণ্ডু ফাঁক। পিঁপড়ে ধরে গেছে লাশে, ডাঁশ ডাঁশ লাল বিষ-পিঁপড়ে।
