যার বলবার কথা সে বলল। এখন যার শোনাবার কথা সে তো শোনেনি। এমন দিনে রানি-বিমলা দুই বোন ঠাকুর্দাদার দুই পাশ থেকে পাকা চুল তোলবার ভান করত, ও মা, মা, ঠাকুরদা, কোথায় যাব গো! তোমার যে কাঁচা চুল উঠছে গো, খুশি হয়ে উঠত কুঞ্জ, অবাক নয় কোনোমতেই। এটাই যেন স্বাভাবিক।
কটা? কটা? গুনে দেখ তো দিদি!
একটা ছিঁড়ে তোমায় দেখাব?
উ হু হু প্রবল প্রতিবাদ তুলত কুঞ্জ, পাঁচ কুড়ি পুন্ন হলে নতুন পাতার মতো নতুন চুলও গজায় রে, শরীল নতুন হয়ে ওঠে। দেখছিস না গাছপালায় সব পাতাপুতি হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াচ্ছে!
তুমি দেখতে পাচ্ছ?
তা একরকম পাচ্চি বইকি! বলরামচুড়োয় কেমন কালচে সবুজ পাতার টুপি এসেছে। মানুষেরও অমনি হয়!
হবেই তো দৃঢ় আত্মপ্রত্যয় কুঞ্জর, আবার কোমর সোজা করে দাঁইড়ে লাঙল ধরবুনি? হেঁয়াটা তো সদরে দোকান দিচ্ছে, না পয়সা জলে দিচ্ছে! পঞ্চার পাশে কে দাঁড়ায় দিদি! পঞ্চাটা আমার খেটে খেটে হেলে গেল।
হেলে কিন্তু পঞ্চানন যায়নি। চোত মাসের সকাল ন-টা থেকেই কাঠ ফাটে। ভাঁটরোর গ্রামাঞ্চলটুকু সবুজে সবুজ, তবু একটুখানি ছায়া ছায়া। কিন্তু ভ্যানগাড়ি নিয়ে বাজার হাটে বেসাতি করতে গেলে নৌকোয় নদী পেরিয়ে আগে পড়বে মাঠ। তাতে আদিগন্ত কোথাও জিরেন নেই, বাস রাস্তায় একবার ঠেলে উঠতে পারলে ভ্যানগাড়ি শনশনশন চলবে, তখন কোনো বড়োসড়ো গাছের ছায়ায় দুদন্ড গামছা ঘুরিয়ে হাওয়া খেয়ে নেওয়াও যেতে পারে। পঞ্চার গাড়িতে কাঁচকলার কাঁদি, কাঁটালি কলা, এঁচোড়, থোড়, পাকা পেঁপে, কাঁচা পেঁপে, সজনে ডাঁটা, বেগুন, লঙ্কা, নেবু! সব কুঞ্জর বাগানের।
সন্ধে ঘুরে গেল। তুলসীতলার পিদিমটি নিবুনিবু। অন্ধকার ঘোর হচ্ছে। আনাচে কানাচে ঝিঝির প্রবল প্রতিপত্তিতে ঝিনিঝিনি খত্তাল বাজাতে শুরু করে দিয়েছে, কুঞ্জ বলল, পঞ্চা যে এখনও এল না বউমা। ছেলে বাড়ি না থাকলেই সে সন্ধে থেকেই কোমর বেঁকিয়ে বেঁকিয়ে ঘর বার করে।
বউ বললে, বেরুতে একটু বেলা তো হল, মাংসটা কাটল, কুটুল, রাঁধল, তবে না বেরুননা। গাড়ি চুড়ো করে আনাজপাতি নিয়ে গেছে বাবা। ভাঙা হাট অবধি না দেখে কি আর সে আসছে! তুমি খেয়ে নাও।
খাব কী গো? হেঁয়াটা আসুক।
সে যদি আসে এখন তেতপ্পরে। চান না করে ভাতেও বসবে না। তুমি বুড়ো মানুষ। এখনই তো চুলছ দেখছি …..
তালে দিয়েই দাও। মাংসটা আছে তো?
মুখ টিপে হেসে বউ বলে, আছে গো আছে, আর কারুর না থাক তোমার আছে। তা চোতের গরমে দুবেলা মাংস, খাবে তো?
চোতের গরম? কোথায়? সাঁঝ হতে না হতেই তোমার চোত পালিয়েছে, ফুরফুর করে গাঙের হাওয়া দিচ্ছে এমন! …
দাওয়ায় পাতা করে বুড়োকে এনে গুছিয়ে বসিয়ে দিয়ে যায় বউ। কাঁসার বড়ো বাটিতে মাংস। আজ অনেকদিন পর গাঁয়ে খাসি কাটা হল, পঞ্চা তার নিজের ভাগ পাতা মুড়ে নিয়ে এসে নিজেই টুকরো টুকরো করেছে, নিজেই বেঁধেছে, কবে ঝাল দিয়ে। খেতে খেতে ঝালে টকাটক আওয়াজ তোলে কুঞ্জ। চোখ দিয়ে জল পড়ে। কিন্তু সোয়াদ কী? মুখ যেন ছেড়ে গেল।
ভাত-টাত ঝোল মেখে শেষ করে সবে দাঁত বসিয়েছে একখানা হাড়ের ওপর জুত করে, বাইরে লোকজনের আওয়াজ পাওয়া গেল। লণ্ঠন তুলে বউ সদরে আলো দেখায়। চার পাঁচজন জোয়ান লোক ভ্যানগাড়ি থেকে পঞ্চাকে নামিয়ে দাওয়ায় রাখলে। মাঠের মধ্যেই নাকি ভ্যানগাড়ি থেকে উলটে পড়েছিল। হাটফিরতি লোক দেখতে পেয়ে তক্ষুনি আবার হাসপাতালে নিয়ে গেছে, ডাক্তার দেখে বলেছে, ইস্টেরোক। হাসপাতালে ভরতি করার জায়গা নেই। ওষুধ পত্র দিয়ে, উঁচ ফুঁড়ে, যা করবার করে ছেড়ে দিয়েছে। এখন কী কী খাওয়াতে হবে না হবে গোপাল কর্মকার পঞ্চার বউকে সব বুঝিয়ে বলছে।
হাড়টা এতক্ষণে ভালো করে ভাঙতে পেরে গেছে কুঞ্জ। ভেতরের রসটুকু জিভ সরু করে চুষতে চুষতে বলছে, পঞ্চা এলি? সঙ্গে কে যা! নিধু নাকি? শালো খচ্চর তুমি খাসির রাঙের লোভে লোভে কুঞ্জ মাঝির ঘরে রাত দুপুরে সেঁদিয়েছ। তোমায় আমি চিনি নে?
নিধু বললে, খুড়োকে আর ভেঙে কাজ নেই।
গোপাল বললে, রাখ, রাখ সেঞ্চুরি করতে যাচ্ছে, এখন আর হ্যান নেই ত্যান নেই ছাড়। বল বুড়োকে। হাড় ছেড়ে উঠুক। পঞ্চাদার অবস্থা একদম ভালো নয়। দেখলি না চোখের পাতা টেনে টর্চ মেরেই ডাক্তার ছেড়ে দিল। রাত কাটবে না। সুজন, পরাণ সব খবর দে।
ভোর রাতের দিকে পঞ্চানন অজ্ঞাতলোকে যাত্রা করল। বেচারির জ্ঞান আর ফিরে আসেনি। সরু-মোটা গলার হাহাকারে গগন ফাটছে। কুঞ্জবুড়ো দুই হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে রয়েছে। সারাদিন একই ভাব। পাড়া ভেঙে সান্ত্বনা দিতে এল সব! মেয়েরা পড়েছে কুঞ্জর বউকে নিয়ে। বুড়োরা পড়েছে কুঞ্জকে নিয়ে। মাধব ঠাকুর পুরুতও বটে, জ্যোতিষীও বটে, বললে, মুখ তোলো কুঞ্জ, কোমর সোজা করে তোমাকেই তো এখন দাঁড়াতে হবে গো! কুঞ্জ কোনোমতে দুই ঠ্যাঙের মধ্যবর্তী গহ্বর থেকে ডিমের মতো মাথাটি তুলে বলে, হাত পা আমার পাতা পাতা হয়ে যাচ্ছে ঠাকুর, বুকের মধ্যেটা ঘোর যনতন্না, শরীলটা আর বশে নেই গো!
আহা, অমন জলজ্যান্ত ছেলেটা ঠিক দুককুরে…গেল, শরীর আর বশে থাকে কুঞ্জ! তবে ছেলে তোমার দুপোয়া দোষ পেয়েছে। বিহিত করো, নইলে বাড়িতে আরও ক-টা অমঙ্গল অপঘাত কেউ আটকাতে পারবে না।
