রানি, বিমলা দুধার থেকে খিল খিল করতে থাকে।
হাসির কী হল? বলি, হাসির কী হল রে ছুঁড়ি? হ্যাঁ গো বাবাকে জামরুল দিলে
যে বড়ো! অমন ডাঁশা ডাঁশা জামরুল, চুড়ি ভরতি সব সাজানো রইল যে! মাথায় ঘোমটা, রানি বিমলার মা বেরিয়ে এসে বলে, তারপর পেট কামড়ালে?
অবাক করলে, দাঁতে একটা ফুটো নেই, ফাটা নেই, বাটি বাটি ক্ষীর সাবড়ে দিচ্ছে, জামরুল খেলে পেট কামড়াবে? ছিটেলের ঘরের মেয়ে দেখছি?
হিন্ডেলের বাটি ভরতি জামরুল এনে বউ বসিয়ে দিয়ে যায়।
এক ছিটে জল দে রে রানি। মুখ কুলকুচি করি। নইলে মিষ্টি মুখে জামরুলের সোয়াদ পাবনি।
কুলকুচি করে ঢকঢক গেলাস খানেক জল খেয়ে কুঞ্জ জামরুলের গায়ে হাত বুলোয়। আহা কী চিকন গো, এই নাতিনদের মুখের মতো। কামড় দিলেই রসের ফোয়ারা ছুটবে। তার দাঁতগুলি সব অটুট। দু-চারটি কশ ছাড়া ওই সব যাকে বলে একেবারে বিদ্যমান। সারাজীবন দাঁত দিয়ে আখ ছুলে চিবিয়ে খেয়েছে, মাংসের হাড় চিবিয়ে ধুলোতঁড়ি করে দিয়েছে সে কি অমনি-অমনি। দাঁতের বাহার দেখলে এই বয়সেও লোকের চোখ ঠিকরে যাবে। চোখ দুটি আর কান দুটি কেন গেল? সেই সঙ্গে শালোর কোমর, তা কুঞ্জ আজও বুঝতে পারে না। আর একটি জিনিস বোধের অগম্য তার। কার্তিক পড়তে না পড়তেই জাড় অমন জেঁকে বসে কেন? পোষ-মাঘে সে রেজাই গায়ে দিয়ে ঘরে আংরা রেখেও শীতে ঠকঠক করে কেঁপে সারা হয়। জামা-কাপড়-শয্যে সব যেন জলে চুবিয়ে এনেছে। অথচ এই সিদিনের কথা, অঘ্রানমাসের সন্ধেবেলায় মাঠের কাজ সেরে সে গাঙে ডুব দিয়ে এসেছে। নাতি এক বাঁদুরে টুপি এনে দেয় শহর থেকে। সেইটে পরে এখন জাড় খানিকটা সামলেসুমলে আছে। এ ছাড়াও হচ্ছে তলপেটে একটা খামচানি ব্যথা। ডাক্তার বললে এ রোগকে বলে হার্নি। অস্ত্র করতে হবে। অস্তর! আবার অস্তর! হাঁট মাউ করে উঠেছিল সে, চোখের ওপর ছুরি চালিয়ে তো তার দফা নিকেশ করে দিলে, এবার পেটে ছুরি বসিয়ে আমারই কম্মো কাবার করতে চাও নাকি গো, ডাক্তারবাবু?
ডাক্তার হেসে বলেছিলেন, কম্মো কাবার হবে না। কিন্তু যদি হয়ই, তো কি খুড়ো? অনেকদিন তো জীবনটা চেখে চেখে বাঁচলে। আর এই ঘিনঘিনে ব্যথা নিয়ে বাঁচতে ভালো লাগবে?
কুঞ্জ অর্ধেক কথা শুনতে পায় না। এগুলি ঠিক শুনেছে। পঞ্চুকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকে, বলে, পঞ্চু আমাকে খবরদার টেবিলে তুলবিনি। বাড়ি নিয়ে চ। ঘিনঘিনে ব্যথা সে আমার, আমি বুঝব, ও শালোর ডাক্তারকে বুঝতে হবেনি।
পঞ্চু হাসে, জোর করে কে তোমাকে টেবিলে তুলছে?
ডাক্তারের পরামর্শমতো নীচ-পেটে পরবার বেল্টো কিনে দিয়েছে পধু, ঘুমের সময় আর প্রাতঃকৃত্যের সময় ছাড়া পেট সাপটে থাকে। এই তো সবেরই সুসার আছে, শুধু শুধু ছুরি-কাঁচি ইসব কী? শরীর থাকলেই রোগ-বালাই। তা যেমন রোগ তার তেমন ওষুধ! ঘাবড়ালে চলে? বুনো ওলের জন্যে চাই বাঘা তেঁতুল, নয় কী?
দুপুরবেলা দুই নাতিন বেশ করে তেল ডলে দেয়। পিঠটা বড্ড রুখু হয়ে যাচ্ছে। কুঞ্জ পিঠে তেল থাবড়ে দেয় হাত বেঁকিয়ে। পঞ্চুর বউ রাঁধে ভালো, তাকে বলে, পুঁইডগা আর লাউ দিয়ে চিংড়িমাছ অনেক দিন রাঁধো না তো বউমা। বেশ চনকো চনকো চিংড়ি।
বউ বলে, চিংড়ি কই! পোকা মারার ওষুধে চিংড়ি হবার উপায় আছে?
গুগলির ঝোল সে-ও তো অনেক দিন খাওয়াওনি, খেলে পরমাই বাড়ে তা জানো?
রানি-বিমলা হাসির বেগ সামলাতে পারে না। এ ওর গায়ে ঢলে পড়ে। রানি কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলে, কার পরমাই বাড়ার দরকার পড়ল গো অ ঠাকুরদা?
কেন রে ছুঁড়ি? তোর, তোর বাপের, মায়ের, আমার…
ওইটেই আসল কথা। তোমার পরমাইটাই আরও একটু নাম্বা করা দরকার। রানির মা চোখ রাঙিয়ে তাকায়। তাদের বাবা ঠাকুরদার সঙ্গে এ ধরনের তামাশা পছন্দ করে না। বলে, জানিস আমি বাবার কত বয়সের ছালা। ও তো আমারই ঠাকুরদার মতন!
কুঞ্জ তেল-টেল মেখে আবার বলে, আজকাল কি ছাতু আর হচ্ছে না বউমা! প্যাঁজ, রশুন, নংকা দিয়ে বেশ করে একদিন ছাতু রাঁধো তো! তোমার শাউড়ি রাঁধত। এক থাবা ছাতু দিয়ে এক থালা ভাত উঠে যেত।
রানির মা বিরক্ত হয়ে সামনে থেকে সরে যায়। তিনকাল গিয়ে এককাল ঠেকেছে, কোথায় ধম্মোকথা কইবে তা না পুঁই-চিংড়ি, গুগলির ঝোল, ছাতু। ঘোর কলি একেই বলে। বুড়ো মানুষের মনেও ধম্মো নেই।
পঞ্চানন বুঝদার মানুষ। সে স্ত্রীকে বোঝায়, বুঝো না কেন বউ। চোখ নাই, কান নাই যার, তার পরানের সবটুকুখানিই যে জিবে এসে ঠেকেছে গো! এর সঙ্গে ধম্মো অধম্মোর সম্প ক কি? কুঞ্জমাঝি কোনোদিন অধম্মে করে নাই বুড়ো বয়সে নাই বা ভেক নিল।
বউ গজগজ করে, স্পষ্টই বোঝা যায়, ধর্ম-অধর্মের ধারণায় সে তার স্বামীর মতে মত দিতে পারছে না। সে অসন্তুষ্ট গলায় বলে, যত অনাচ্ছিস্টি কাণ্ড।
ফাগুন চোতে আকাশ যেন রক্ত-পলাশ! কাছে ভিতে জঙ্গল, বাগান, চরের মাটি, নদীর পাড়, এমনকি মেঠো হেটো রাস্তার দুধার অবধি সবুজে সবুজ! ন্যাড়া গাছের ডালে ডালে দ্যাখ-না-দ্যাখ কচি পাতা তিড়িং বিড়িং নেচে নেচে বার হয়ে যাচ্ছে। দুই বোনের এক লগ্নে বিয়ে দিয়ে সারল পঞ্চানন। বলল, বাবা, তোমার একটুখানি খালি খালি লাগবে। তোমার বউমার তো শতেক কাজ! তার মাঝে তোমার নাতিনদের মতো হাতে-হাতে মুখে মুখে তো বেচারি পারবে না। একটু বুঝো!
