কে গেলি? নারান? উঠে আয় দিকি একবার!
সুবুচনীর মা নাকি গো? বউমার কাছে এয়েচ? বেশ বেশ।
এই পর্যন্ত। সম্পন্ন চাষি। ঘরে চিড়ে, মুড়ি, সরষের খোল অপর্যাপ্ত। চিকিৎসার ত্রুটি হতে দেয়নি ছেলে। সদরে যেতে হলে নদী পার। সেভাবেই একে একে দুটি চোখেরই ছানি অস্ত্র হল। প্রথমে কালো ঠুলি, তারপর বেশি পাওয়ারের চশমা উঠল নাকে। কালো ডাঁটির। চলল ওইভাবে বছর ছয়েক। তারপর ধীরে ধীরে আবার সব আবছা হচ্ছে। দিনের বেলাতেই যেন মনে হয় সাঁঝ নেমে গেছে। ভুরুর ওপর হাত দিয়ে মানুষ ঠাহর করতে করতে সে বলে, কইরে রানি, বিমলি! গেলি কই? পিদ্দিম দিলি নে যে বড়ো…
পিদ্দিম দোব যে পাখপাখালির ডাক শুনতে পেয়েছ? বলি অ ঠাকুদ্দা।
তা পাইনি, ডিমের মতো চুকচুকে হয়ে আসা মাথাটি নাড়তে নাড়তে কুঞ্জ বলে। রান্নাশালের পেছন দিক থেকেই আরম্ভ হয়েছে তার ন কাঠা সাত ছটাকের বাগান। সন্ধের ছায়া নামলেই তার আম জাম জামরুল পেয়ারা গাছ সব ঘরফিরতি পাখির প্রচন্ড কলরোলে ঝমঝম করতে থাকে। তা সেও যেন আজকাল রূপনারায়ণ, কংসাবতী, মুণ্ডেশ্বরীর জল পার হয়ে তার তীব্রতা অনেকখানি হারিয়ে ফেলে তবে আসছে কুঞ্জ মাঝির ভোঁ লাগা কানে। কান দুটি তার আগেভাগেই গেছে। মেয়ের ঘরের নাতি সুজন বেশ লেখাপড়া করেছে, সে বলে ইস্টোন ডেফ।
যে ডাক্তার ছানি অস্তর করেছিল সেই দেখল আবার, দেখে-টেখে হাতের যন্তর নামিয়ে বলল, চোখের নার্ভ সব শুকিয়ে গেছে তোমার বাবার। জরায়, বার্ধক্যে, বুঝলে কিছু?
এজ্ঞে, তার কোনো চিকিচ্ছে বার হয়নি? পঞ্চাননের ভাবটা যেন চিকিচ্ছে বার হয়ে থাকলে সে তার বাপকে জেনিভা-টেনিভা পাঠাবে।
ডাক্তার বললে, না। বার হয়নি। নার্ভগুলির পরমায়ু ফুরিয়ে গেছে। আর পঁচানববুই তো পার করল তোমার বাবা, অনেক তো দেখলও। দেখবে যে, এখন আর দেখবার আছেটাই বা কী? যেদিকে তাকাও খালি দুঃখ, দুর্দশা, দুর্নীতি।
পঞ্চা বিড় বিড় করে বলে, দেখতে চাচ্ছে যে! বড্ডই দেখতে চাচ্ছে। ডাক্তারবাবু। বুঝেন না কেন, হাত বুইলে বুইলে মুখের চামড়াগুলো আমার তুলে নিচ্ছে বুড়ো।
পঞ্চা! পঞ্চা! তুই পঞ্চই তো রে!
হ্যাঁ গো হ্যাঁ। তোমার সন্দ হচ্ছে কেন আজকাল?
কানে শুনিনে বাবা। তোর হেঁয়াটা গলা ভারী করে আমার ঠেয়ে টাকা পয়সা নিয়ে যায়। আজ এক কুড়ি, কাল দু-কুড়ি…।
ভোলো কেন? তার মুখ বুলোও?
বুলুই তো!
আমার যে খাটা-খোটা ফাটা বুড়োটে চামড়া, আর তারটা যে মিহিন টের পাও।
কুঞ্জ এইবার রেগে ওঠে। তুই কতো বড়োটা হলি যে বুড়োটে চাম হবে? শুখো চাম তোর শত্তুরের হোক।
এত দুঃখেও হাসি আসে পঞ্চাননের। যে বাপের পঁচানববুই পার হতে যায় তার ছেলের চামড়া এখনও কিশোর ছেলের মতো হবে? আবদার মন্দ নয়।
পঞ্চানন ঠাকুরের দোর-ধরা ছেলে। চারটি পর পর নষ্ট হয়ে অনেক কষ্টের ওই একটিই ছেলে কুঞ্জর। পাঁচ পাঁচ খানি ধুমসো ধুমসো মেয়ের পরে। মড়ঞ্চে পোয়াতি বলে সে সময়ে পঞ্চুর মা-র কী অচ্ছেদ্দাটাই না হয়েছিল। চাঁদপানা মুখ দেখে বিয়ে দেওয়া, সেই বউ যদি পাঁচ ছ বছরেও গর্ভ না ধরে কি মরা ছেলের জন্ম দেয় তো তার খোয়ার কুঞ্জ কেন ধম্মেঠাকুরের বাবা এলেও আটকাতে পারবে না। তারপর যদি বা হল, হতেই থাকল। ধুমবো ধূমবো মেয়ে সব। একটু একটু করে বড়ো হয় আর গাছকোমর বেঁধে নাকে নোলক, কপালে টিপ, কই মাগুরের মতো খলবলিয়ে খেলে বেড়ায়। কতখানি বয়েস পর্যন্ত কুঞ্জ মাঝির একার হাতে জমি, জিরেত, খেত, খামার, হেলে-বলদ, গাই-গোরু। চারটে-পাঁচটে মুনিষ দিনরাত হাঁ-হাঁ করছে। মুরুক্ষু সুরুক্ষু মানুষ খাটুনির ভাগটুকু না হয় সামলাল, কিন্তু ধরিত্তির মা যে তুষ্ট হয়ে সোনা তুলে দিচ্ছেন হাতে তার হিসেবপত্তর সে রাখে কী করে? কোমরের গেজেতে পয়সাকড়িগুলো তার শুধু ঠুসে রাখাই সার। চালানের অভাবে কত আনাজপাতি তার ফি বছর নষ্টই হতে থাকত। এখন দেখো, কেমন সব গোনা-গাঁথা। লাল খেরোর খাতা, কানে কলম, কড়া-ক্রান্তি হিসেব ছেলের, এক কানি এদিক ওদিক হবার উপায় নেই।
কুঞ্জ মাঝির শব্দহীন বর্ণহীন ভুতুড়ে জগতে পঞ্চই একমাত্র মানুষ। মানুষটি মাঝে মাঝে তার মানসপটে দেবতাই হয়ে ওঠে। এক জমির থেকে তিন তিনটি ফসল অবলীলায় ওঠায় যে, ভ্যানগাড়ি কিনে বাগানের ফুল-ফুলুরি নিজ হাতে চালান দিয়ে মুঠো মুঠো টাকা আনে আর বাপের গেঁজে ভরতি করে যে, সে ছেলে দেবতা নয় তো আর কী? কোমর ভরতি টাকা, তা হোক না কোমর ভাঙা, চৌদিকে এমন টাল হয়ে থাকা সবুজ, না-ই বা চোখে দেখল এত সুখ শরীরে সইলে হয়। দুগগোপুর থেকে জল ছাড়লে দাওয়ায় উঠে আসে, সত্যি কথা। কদিন নৌকোর ওপর দোল-দোল দুলুনি। গরমেন্টের রিলিফ সরকার এসে বলে গেল, আপনারা এ গ্রাম ছাড়ন, এসব জল-নিকেশি জায়গা। আমাদের কিছু করবার নেই। পঞ্চা গাঁয়ের পাঁচজনকে একত্তর করে বোঝাল, নিজের হাতে গড়া ভূঁই কেউ ছাড়ে?
এখন গরমের দিনে বউমা ঘন দুধের মধ্যে বাড়ির ভাজা ডবকা ডবকা মুড়ির ধামি উপুড় করে দেয়, তাতে কলমের আমের ঘন রস, গন্ধে নীল ডুমো মাছি ওড়ে। দুই নাতনি দু-দিক থেকে ঝাপটে ঝাপটে বাতাস করে। গ্রাস মুখে তুলে কুঞ্জ মাঝি হাপুসহুপুস মা লক্ষ্মীর পেসাদ পায় যেন। লক্ষ্মী তো নয় গণেশ। সিদ্ধিদাতা গণেশ ঠাকুরটি তার মানুষের রূপ ধরে দাওয়ায় পায়ের খসখস শব্দ তুলে উঠে আসে, গামছা ঝাড়ে, বলে, কী গো বাবা? খাচ্ছ ক্ষীর-মুড়ি? খাও, খাও বেশ করে খাও।
