রঞ্জু হাসতে থাকে—সত্যি, পাখি দেখার চোখ যাদের আছে তারা ছাড়া আর কেউই পাখি দেখতে পায় না, জানো না? আলোর মধ্যে অদৃশ্য হয়ে থাকলেও দেখে, অন্ধকারের আড়ালে থাকলেও দেখে।… আর তা ছাড়া এই ভরদুপুরবেলা এখানে দেখার লোক কই?
তুমি অত্যন্ত অশালীন হয়ে যাচ্ছ রঞ্জনা।
উলটো দিক থেকে একটা নিম্নশ্রেণির লোক মাথায় ঘাসের বোঝা নিয়ে কীসের তাড়ায় কে জানে ঊধ্বশ্বাসে দৌড়ে আসছে। রঞ্জুকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে চলে গেল। আমি বাঘের মতো গিয়ে তাকে ধরলুম, তারপর ব্যায়াম-করা চওড়া হাতের পাঞ্জায় একটা ঘুসির বোমা ফাটালুম তার রগে—উল্লুক, বেতমিজ, বেয়াদব। লোকটা অবাক হয়ে এক পলক তাকিয়ে পালটা গালাগাল আরম্ভ করল। তখন লাগালুম কষে চড়, থাপ্পড়, লাথি। লোক জমে গেল। ভদ্রমহিলার শ্লীলতাহানির চেষ্টার দায়ে অবশেষে তাকে এক বাইকধারী সার্জেন্টের হাতে সমর্পণ করে গনগনে মুখে বিবর্ণ রঞ্জুর দিকে তাকিয়ে বললুম, এখনই দেখছ কি? তোমাকে আমি ঘরে বন্ধ করে রাখব। ছাদের দরজায় তালা লাগাব। জানলায় লোহার জালি। প্রচণ্ড রাগের মাথায় খেয়াল করিনি রঞ্জুর মুখে জোঁক লাগছে, কণ্ঠনলিতে দাঁত বসিয়েছে রক্তচোষা বাদুড়।
পরদিন ওকে নির্দিষ্ট জায়গায় পাইনি। পরদিনও না। তারপর সোজা ওর বাড়ি। ছটকুনের মেসোমশাই বললেন, সে কি সুকুমার, রঞ্জু যে ওর বন্ধুদের সঙ্গে রাজগিরে এক্সকারশনে গেল। তোমার বলে যায়নি? ওখান থেকে বেনারস যাবে, চুনার যাবে, লম্বা প্রোগ্রাম যে ওদের এবার!
পিঞ্জরাবদ্ধ বাঘের মতো ছটফট করছি ক্রোধে। বেনারস থেকে ছোট্ট চিঠি। সম্বোধন নেই। সই নেই।
এতদিনের সম্পর্ক ভাঙতে কী হয়, যে ভাঙে সেই জানে। ছেড়ে দাও আমায়। নিজেও শেষ হবে, আমাকেও শেষ করবে। কোনো কিছুর খাতিরেই আমি সন্দেহভাজন আসামিনি হয়ে অমূল্য জীবন লোহার গারদে আটক কাটাতে পারব না।
বহু ক্ষমাভিক্ষা, অনুনয়-বিনয়, প্রতিশ্রুতি। টলাতে পারলুম কই? আর একবারও সে দেখাই করল না। আত্মীয়স্বজন কারও মতামত গ্রাহ্য করেনি। কারণ বলেনি কাউকে। কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নয়। খালি বলেছে ব্যথার গলায় ভালো লাগছে না, ভালো লাগছে না। ছোটো বউদি আজও জানে না ঠিক কী ধরনের মনান্তরের ফলে আমাদের সম্পর্ক ছিঁড়ে গেল। আমার প্রতি মমতায়, বোনের প্রতি বিতৃষ্ণায় কত কী-ই যে বলে যায় বেচারি ছটকুন। বোধহয় ভাবে ওর বিরুদ্ধে আমার মনটাকে তেতো করে দিতে পারলে সেই তিক্ততায় আমার এ বিষক্ষত সেরে যাবে। সবই বুঝি। শুধু বুঝি না কতটা সত্যি কতটা মিথ্যা এই সব রটনা।
কতগুলো দীর্ঘ বছর কেটে গেছে। এখনও মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়। মাঝরাত তো নয় যেন মাঝগাঙ। হাবুডুবু খেতে খেতে জেগে উঠি। রঞ্জু! রঞ্জু! ডুবন্ত মানুষের আর্ত চিৎকার কেউ শোনে না, ডুবন্ত মানুষের উদ্যত হাত ধরে টেনে কেউ ডাঙায় তোলে না। মাঝ নদীতে ভরাডুবি। অপঘাত। বকুল ঝরছে। তার খসছে। উল্কাপিণ্ড ফেটে গেল। রঙের ফানুস পুড়ে যায়। রজনি তামসী। দেবী পশ্চিমাস্যা। অমাবস্যার কালো আকাশে কালো বরফের চাদরের মতো সুরঞ্জনা বিছিয়ে আছে।
শ্রীহীনা, রুক্ষভাষিণী, স্থাঙ্গিনী রঞ্জুকে একবার দেখতে পেলেই কি মহাকালের ধ্যানভঙ্গ হবে? এ ধ্যান কি রূপের ধ্যান? অপঘাত ঠেলে ফিরতে পারব ডাঙায়? ফিরতে পারব ভাঁটির প্রবল টান এড়িয়ে জীবনের কাছে?
শ্যামবাজারের মোড় থেকে শহরতলির বাস নিলুম। অভিজ্ঞ দুপুর এখন শান্তিপর্বের শরশয্যায়। তাকে ঘিরে সমস্ত প্রশ্ন চুপ। পশ্চিম দিগন্তে শেষকৃত্যের মহাপ্রস্তুতি আরম্ভ হচ্ছে। দক্ষিণ শহরতলির সুদূরতম প্রান্তে যখন পৌঁছলুম কামনারঙের শিখাগুলি তখন ভষ্ম উদগার করছে। লাল মাটির রাস্তায় আবিরের মতো ছড়িয়ে আছে কৃষ্ণচূড়ার মঞ্জরি। ঝিরিঝিরি পাতার কাঁপনের মধ্যে দিয়ে অস্থির দিঘির মতো চাপ চাপ আকাশ। দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি বাগানঘেরা ছোট্ট বাড়িটা। আটলান্টিকের মাঝ-মধ্যিখানে যেন নোঙর ফেলে দাঁড়িয়ে আছে একলা জাহাজ। এখুনি ভোঁ বেজে উঠবে, বোগেনভিলিয়ার বেগুনি মাস্তুল উঁচিয়ে পালতোলা মাটির জাহাজ চলতে আরম্ভ করবে। শুনেছি ওই বাড়ির দোতলাটা পুরোই স্টুডিয়ো। রঞ্জুর স্বামী শিল্পী। উত্তর দিকের দেয়ালে কাচের ওপর অস্তরাগ প্রতিফলিত হয়ে আকাশের চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। আমি কি ওঁর সামনে গিয়ে এমনি উদভ্রান্তের মতো দাঁড়াব? দাঁড়াব সিকন্দরের সামনে শৃঙ্খলিত পুরুর মতো মাথা উঁচু করে? ভিক্ষুকের মতো দাঁড়াব গিয়ে কাঙাল চোখে? শিল্পীদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় থাকে। উনি কি বুঝতে পারবেন আমি কে? উনি আমাকে কীভাবে নেবেন? আমিই বা ওঁকে, আমার ওই মেঘলোকবাসী প্রতিদ্বন্দ্বীকে কোনোদিনই যাঁকে সম্মুখ সমরে চূড়ান্ত দ্বৈরথে পেলুম না, তাঁকে কীভাবে নেব? ভাবতে ভাবতে বাগানের গেটে হাত বেধে গেল। খুলতে গিয়েও খুলতে পারলুম না। দূরদূরান্ত শব্দে কাঁপিয়ে ট্রেন চলে গেল। পেছু ফিরে দাঁড়ালুম এসে এক জোড়া অশ্বথের তলায়। কোলের কাছে মাতৃগর্ভের মতো কোমল অন্ধকার। অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে রইলুম সেখানে। যেন আমি জন্মের জন্য অনন্তকাল প্রতীক্ষারত অজাত ভ্রূণ।
গোধূলি গিয়ে সাঁঝ। সাঁঝ পেরিয়ে সন্ধ্যা। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। শহরতলি কাঁপিয়ে ঝিঝির তানকর্তব শুরু হয়ে গেল। মুক্তাঙ্গনে লক্ষ নর্তকীর নূপুরশিঞ্জিনী। বেগবান হাওয়ার সমৰ্থ সঙ্গত। ঘড়ি দেখতে ভুলে গেছি। আকাশে চাঁদ নেই। শুধু তারার আলোয় জেগে আছে অলৌকিক জাহাজ বাড়ি, তারার আলোয় দাঁড়িয়ে আছে ত্রিকাল-সাক্ষী অশ্বখ। কতক্ষণ পর জানি না, কাঁকর-ভাঙার মৃদু আওয়াজে চমক ভেঙে গেল। তারার জ্যোৎস্নায় দেখলুমকী আশ্চর্য! কী পরমাশ্চর্য! সুরঞ্জনা আসছে! ছটকুন কী যেন বলেছিল? বড়ো বউদি কী যেন দেখেছিল? সুরঞ্জনা তো অবিকল তেমনি আছে! মাথার ওপর কালপুরুব, পায়ের তলায় দিবারাত্রির গতিভঙ্গে ঘূর্ণিত হচ্ছে পৃথিবী, আলোকলতার আকর্ষের মতো বাহু দুলছে, ফুলন্ত ডালের মতো বঙ্কিম ঠামের বাঙ্য় চলনভঙ্গি, সর্পিল বেণি সেই বহু বছর আগেকার কুমারী নদীর ভঙ্গিতে গ্রীবার পাশ দিয়ে পথ কেটে বুকের কমনীয় অববাহিকায় শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে ছড়িয়ে পড়েছে। দেখলুম উনিশ বছরের তরুণী সুরঞ্জনা অকুঁদাবুদ আলোকবর্ষ দূরের কোন ছায়াপথ থেকে ম্যারাথন যাত্রা করে অর্বুদবুদ আলোকবর্ষ দূরের কোন জ্যোতির্লোকের দিকে অন্তহীন চলেছে। ত্বরাহীন। আত্মমগ্ন। প্রেক্ষাপটের প্রান্তে আমাকে ও দেখতে পাচ্ছে না। আমি যে স্থাবর। আর এই মহাস্থবির ও ওই চিরপ্রচলার মাঝখানে শুধু আপূৰ্যমাণ, অচলপ্রতিষ্ঠ মহাশূন্য, মহাকাল।
পরমায়ু
কুঞ্জ মাঝির চক্ষু দুটি গেল। পুরোপুরি নয়। রোদ থাকলে চোখে একটা লালচে আভা ঠাহর হয়। মানুষজনের চেহারার আদলটুকুও ধরতে পারে।
