কেন যে ছটকুন এভাবে বারবার রঞ্জুর প্রসঙ্গ তোলে। প্রথম প্রথম তুলত না। বহু বহু দিন এ বাড়িতে রঞ্জু কবরস্থ ছিল। মাধবী এসেছে। পিকলু এসেছে। পুনের সংসার স্থায়ী হয়েছে। কোনোদিন এ বাড়িতে মৃতের পুনরুত্থান হবে ভাবিনি। সে জীবিত ছিল একটিমাত্র মানুষের নিদ্রাহীন রাত্রির গূঢ়ৈষায়। বছর তিন আগে ছটকুন হঠাৎ অপ্রাসঙ্গিকভাবে এলোমেলো খানিকটা রঞ্জুর নিন্দে করে গেল। খুব নাকি গুমুরে হয়েছে, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে না। আমি যতই লুকোতে চাই, এইসব করুণ হৃদয় মহিলা জেমস বন্ড কেমন করে নির্ভুল জেনে গেছে রঙ আমার হর্য, রঞ্জ আমার বিষাদ, রঞ্জ আমার চোখের তারায়, রঞ্জ আমার। হাতের পাতায়, নিশ্বাসে, প্রশ্বাসে, এখনও, এখনও। ওরই জন্যে আমি অফিসের কাজের নাম করে একা একা উদভ্রান্তের মতো ছুটে আসি। অবোধ বালক যেমন মায়ের পরিত্যক্ত শাড়ির মাতৃগন্ধে সান্ত্বনা পায়, কলকাতার হাওয়ায় তেমনি আমি সুরঞ্জনার দেহগন্ধ পাই। শুধু একবার দেখব। দেখা হয় না। বড়ো ভয় করে। রঞ্জু যে আমার ছিন্ন অঙ্গ, আমি অন্ধ। রঞ্জু আমার দৃষ্টিশক্তি হরণ করে হারিয়ে গেছে। হে ঈশ্বর, বিমূর্ত আলো দাও। আমি আর একবার রঞ্জুকে প্রত্যক্ষ করি। এত বড়ো জীবনের পরিসরে আর কেউই যে আমার পরিপূর্ণ আপন হল না। বড়ো ভয়! রঞ্জু মোটা হয়ে গেছে। কণ্ঠে আর সুরবাহার বাজে না। তার চাইতে ও সেখানে থাক যেখানে আছে। ভেতরে এবং বাইরে। রঞ্জুর ছবি গোপন অ্যালবামের পাতায় সেঁটে বহনক্লান্ত, রাহুগ্রস্ত আমি আবার কি ফিরেই যাব?
সন্ধের দিকে বেরোলুম। একটু ঝিরঝিরে মতো বৃষ্টি হয়ে গেছে। রাস্তাগুলো অশ্রুময়। গাছের ডগা থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরছে। কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটের দু ধারে পসরা। পলিথিনের ঢাকা সরিয়ে ফেলছে হকাররা। মানুষ হাঁটার জায়গা নেই। কম্বলিটোলা দিয়ে বেরিয়ে শোভাবাজারের দিকে হাঁটা দিলুম। আবার মুখ ফিরিয়ে জোড়াবাগান। পার্কের পূর্বকোণে রায়চৌধুরীদের রঙিন কাচওয়ালা বারান্দায় ইলেকট্রিকের আলো পড়ে রঙ চলকাচ্ছে। কোথাও যাব না। সর্বত্র যাব।
লোডশেডিং হয়ে গেল। সমস্ত উত্তর কলকাতা নিচ্ছিদ্র অন্ধকারে হারিয়ে গিয়ে অন্ধকারেই জেগে উঠল আবার। প্রত্যেকটি বাড়ির, পার্কের, রাস্তার, যানবাহনের প্রেত তাদের দ্বিতীয় অস্তিত্বের জানান দিয়ে আমার দ্বিতীয় অস্তিত্বকে হাতছানি দিয়ে ডাকতে লাগল। ভয় কি? বেরিয়ে আয়। কতকাল আর চোখ ধাঁধানো আলোর অন্ধকারে চাপা থাকবি? আমি খুব প্রাণবন্ত এক আত্মবিশ্বাসী, তরতাজা, টগবগে যুবককে আমার ভেতর থেকে সবেগে বেরিয়ে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের ফুটপাথ ধরে দক্ষিণমুখো ছুটে যেতে দেখলুম। খুব ঝকমকে দাঁতে সে প্রাণখোলা হাসি হাসছিল। হাতে একটা ব্যাডমিন্টন যাকেট। চৌরঙ্গির অন্ধকার চিরে তন্বী আলোর রেখা জেগে উঠছে। এতে ক্ষীণ যে ভয় হয় হারিয়ে যাবে। রঞ্জনাকে পাশে নিয়ে আমার অতীত হাসতে হাসতে এগিয়ে যাচ্ছে। চিবুক উঠছে, নামছে। বেলকুঁড়ি থেকে শব্দের সৌরভ।
তারপরেই সেই অতীত, যা এখনকার আমার থেকে বহুগুণে সত্য এবং জীবন্ত, একটা ডবলডেকার থেকে ভীষণ রুষ্ট মুখে রঞ্জনাকে হাত ধরে নামাল।
লোকটা কী রকম বিশ্রীভাবে তোমার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল, রঞ্জু, তুমি তো কিছু বললে না?
কই আমি তো বুঝতে পারিনি। অত ভিড়ের মধ্যে বোঝা যায় না কি?
বেশ বোঝা যায়। ভালোই বুঝতে পারছিলে।
মানে?—রঞ্জনার চোখে আহত বিস্ময়।
আকাশের মেঘ মিলিয়ে এসেছে। মেঘ ফুঁড়ে রোদ্দুরের তির। গোধূলির আকাশে হেলান দিয়ে সুরঞ্জনা গান গাইছে। গোধূলি-লগ্নে কার আগমনির গান।
রঞ্জু তোমার কলেজ গেটে কাল ওটা কে তোমার সঙ্গে কথা বলছিল?
মনে করার চেষ্টায় রঞ্জুর জ্ব কুঁচকে গেছে। কে বলো তো?
ওই তো ঝাঁকড়াচুললা, মোটা ঝুলপিঅলা…
ওঃ, ও তো রীমার দাদা। আমার স্কুলের বন্ধু রীমা, চেনো তো? ওর সেই ফোটোগ্রাফার দাদা! লাইফ ম্যাগাজিনের ফোটোগ্রাফি কমপিটিশনে প্রাইজ পেল!
কী চায়?
কিছু তো না! রীমাকে নিতে এসেছিল, কাকে যেন এয়ারপোর্টে সি-অফ করতে যাবে।
তোমার সঙ্গে অত কীসের কথা?
রঞ্জু অবাক হয়ে বলল, বা রে, রীমা আমার পুতুলখেলার বয়সের বন্ধু, এইটুকু বয়স থেকে ওদের বাড়ি যাচ্ছি। ওর দাদা আমার সঙ্গে দেখা হলে কথা বলবে না?
নিঃশব্দে চা খেয়ে যাচ্ছি। সুরঞ্জনা আরও গান গাইছে। সন্ধ্যার আকাশ সুরে ভাসিয়ে। কিন্তু কানে আর মধু ঢালছে না। রসহীন, শুষ্ক, নিরর্থক গান সব।
যাবার সময় আড়ালে ডেকে বলে গেলুম, কলেজ গেটে কি আর কোথাও কোনো ঝুলপি-মোচঅলা ফন্দিবাজকে আমি যেন আর তোমার সঙ্গে কথা বলতে না দেখি। আর কাল থেকে তোমার ট্যাকসিতে নিয়ে বেরোব।
ট্যাকসি কেন, সুকুদা? পালকি নয়? ওপরে দু পরত ঘেরাটোপ, দু-পাশে দুই আসাসোঁটাধারী বরকন্দাজ। আর তুমি চলবে রাঙা ঘোড়ায় চড়ে টগবগিয়ে আমার পাশে পাশে…
সারা শরীরে রঞ্জু নাচের ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
রঞ্জু তোমার আঁচল ঠিক করো।
কী ঠিক করব? ঠিকই তো আছে।
উড়ছে, উড়ছে, এক্ষুনি উড়ে যাবে।
বাঃ, দমকা হাওয়ায় ওড়বাব জন্যেই তো আঁচল। তখনই তো একমাত্র নিজেকে পাখি পাখি লাগে।
হুঁ। আর রাস্তাসুল্লু লোক তোমার পাখি-ওড়ানো দেখুক।
