এই ঘরে ডন দিতুম। মুগুর ভাঁজতুম। সে মুগুরগুলো সৌম্য ব্যবহার করলে অমন পলকা চেহারা হত না ছেলেটার। ওই টেবিলে লক্ষ করলে এখনও দেখতে পাওয়া যাবে জটিল অঙ্ক ভাবতে ভাবতে কত অন্যমনস্ক কাটাকুটি করেছি। পৈতৃক বাড়ির অংশ আমি নিইনি। দাদারা বদলে আমাকে টাকা দিয়েছেন। সেই নগদ টাকা দিয়ে নামি কোম্পানির নিরাপদ শেয়ার কিনে আমি আমাদের তিনজনের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করেছি। কিন্তু আমায় সাবেক ঘরটা বউদিরা সযত্নে গুছিয়ে রেখেছে। এটা এখনও সুকুর ঘর। এতো মায়া! বলে, ঘরটুকু না থাকলে তুই আর আসবি না সুকু। অন্য সময় সৌম্য থাকে বোধহয়। ওর ডাক্তারির বই-টই টেবিলের ওপর দেখেছি। অ্যানাটমি, মেটিরিয়া মেডিকো। কিন্তু আমি এলে কেউ বিরক্ত করে না। নিজের সমস্ত বসবাসের চিহ্ন সৌম্য বেচারি নিঃশেষে তুলে নিয়ে যায়।
এ ঘরের গোপনীয়তা আমার নিজের সংসারেও কোথাও নেই। সেখানে মাধবীর সঙ্গে ভাগের কারবার। বারোয়ারি বৈঠক, অংশীদারির শোবার ঘর। এমন নির্জন বারান্দা সেখানে নেই, নেই এমন পুর্ণকুম্ভ শূন্যতা। জানলার প্রত্যেকটা গরাদ এখানে নীরবে আমার সঙ্গে কথা বলে, ঘরের প্রত্যেকটি কোণে হারানো দিনের কণ্ঠ গমগম করে। সওয়াল জবাব চলতে থাকে মেঝের সঙ্গে, ছাদের সঙ্গে। স্বল্প আসবাবকটা আলাপচারিতে যোগ দেয়।
কেন তুমি চলে গেলে?
নদীর স্রোত আর সময় তো চলেই যায়!
সময় যাক, তুমি কেন গেলে?
সময় দিয়েই যে তৈরি জীবন, সময় দিয়েই তৈরি শরীর।
কিন্তু তুমি তো গিয়েও পুরোপুরি যাওনি?
কেন? কেন? কেন, সুকু?
কিন্তু ছটকুন আচমকা কী যেন একটা বলে গেল! রঞ্জু মোটা হয়ে গেছে? সেই কঞ্চির মতো ফিনফিনে রঞ্জু মোটা! ভাবতে পারছি না। সুলত্ব অনেকের অঙ্গে, অনেক প্রসঙ্গে সয়ে যায়, মীনামাসিমা এক সময় ডিগডিগে রোগা ছিলেন। কণ্ঠার হাড়ের গর্তে টেনিস বল ঢুকে যেত, এখন মীনামাসিমার ঘাড় নেই, কণ্ঠা নেই, বুক-পেট-পিঠ আলাদা করে চেনা যায় না। রঞ্জুর বেলা স্থূলত্ব সইবে না। স্থূলত্ব রঞ্জুর বেলা অশ্লীল। চুল নাকি পাতলা হয়ে গেছে! বাহান্ন বিঘের চওড়া কালো রাস্তাটা যুগল শিরীষের তলা দিয়ে যেখানে লাল কাঁকরের পায়ে চলা মেঠো পথটার সঙ্গে মিশেছে সেখানে অব্যবহৃত কুয়োর পরিত্যক্ত চাতালে ওই তো রঞ্জু প্রাণপণে স্কিপিং করে যাচ্ছে, যেমন ওকে প্রথমে দেখেছিলুম মোটা বেণীটা সপাং সপাং করে পিঠের ওপর চাবুক মারছে! লাল আকাশে কালো বিদ্যুৎ, নীলের কোলে কিশোরী বিজলি চমকে যাচ্ছে। তির্যক, নিটোল। আদিম পৃথিবীর বুকে প্রথম বৃক্ষের জন্মের মতো বিস্ময়কর!
গতবারেও ছটকুন বলেছিল, জানো সুকু, রঞ্জুটা যে কী কালো, শ্রীহীন হয়ে গেছে, তুমি ধারণাই করতে পারবে না। তেমনি বুড়োটে। এখন দেখলে তোমার পিসিমা মনে হবে।
আমার চোখের সামনে রঞ্জুকে কে থাবড়া থাবড়া কালি মাখিয়ে দিতে লাগল! এ যেন শুধু বাঁদুরে রঙের বীভৎস এক হোরিখেলা। রঞ্জুর দাঁতগুলো, তাই থাকে কেন? খসে পড়তে লাগল ঝরঝর করে, মাথা থেকে চুলগুলো কোনো অদৃশ্য চুম্বকের টানে লোহার তারের মতো ছিটকে ছিটকে যেতে লাগল। আমার চারপাশে যেন রাক্ষসীর চুলের স্তূপ। রঞ্জু, কেশহীনা দন্তহীনা কদর্য রঞ্জু বেলুনের মতো ফুলতে লাগল। ফুলতে ফুলতে ফটাশ। মনে মনে বলতে চাইলুম—সুরঞ্জনা, সুরঞ্জনা, তুমি আজ মৃত। তারপরেই দেখলুম সমস্ত ঘরে বিদেহী রঞ্জুর শব্দহীন রূপদ্যুতিময় হাসি তরঙ্গে তরঙ্গে ছড়িয়ে যাচ্ছে। রঞ্জনার হাতের অশরীরী মুদ্রা বঙ্কিম বিভঙ্গে ঘরের কোণে কোণে মঙ্গলঘটের মতো স্থিত। যতই মারি সুরঞ্জনাকে আমি মেরে ফেলতে পারি না। ও আবার বেঁচে ওঠে। নতুন শক্তি নিয়ে নবোদগত যৌবন নিয়ে। ওর এই অনন্ত যৌবন নিয়ে বেঁচে ওঠা অহোরাত্র আমায় মারছে, আবার এই মৃত্যু না থাকলে আমি যে কেমন বাঁচা বাঁচতুম, তাও জানি না। সুরঞ্জনার স্মৃতিভারহীন সে কেমন লঘু, নিরর্থ জীবন?
হাতের কাজ সেরে দুপুরবেলায় দুই বউদি উলটুল নিয়ে আমার ঘরে এসে গুছিয়ে বসল। দাদাদের সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। সৌম্য রবিবাসরীয় আড্ডায়। মহিলামহলে আমিই একমাত্র হংসমধ্যে বক। বউদিদের মতে অবশ্য নিছক মেয়েলি আচ্ছা খুব ক্লান্তিকর। একজনও অন্তত পুরুষ থাকা চাই, নইলে ভারসাম্য থাকে না।
কী সুকু, টোয়েন্টি-নাইন হবে?
খুকিদের খেলা ছেড়ে এবার একটু সাবালক হও বউদি।
এ জন্মে আর হল না রে।
শিখিয়ে দিচ্ছি ব্রিজ, তাস দাও।
শেখাতে চাইলেই শিখছে কে রে?
নাঃ বউদি, হোপলেস তোমরা। ইনকরিজিবল। তিনজনে তবে আর গোলামচোর ছাড়া হবেটা কি?
মুনিয়াটা অনেকক্ষণ জেঠিমার কোল ঘেঁষটে বসেছিল, নতুন গল্পের বই হাতের মুঠোয়, নতুন পুতুল কোলের ভেতর আঁকড়ে ধরে। খেলা দেখতে দেখতে চোখে ঘুমের ঢল নামল। ছটকুন বলল, আচ্ছা দিদিভাই, আমি বললে সুকুটা বিশ্বাস করতে চায় না, তুমিই বলো তো রঞ্জু কীরকম খিটখিটে খটখটে মতো হয়ে গেছে
আজকাল? বড়ো বউদি বলল, কিছু মনে করিসনি মিতু, মায়ের পেটের না হলেও হাজার হোক তোর বোনই তো, শ্যামলীর বিয়েতে দেখলুম যেন জয়ঢাক। তার ওপর সবসময় গলা বাড়িয়ে চ্যাঁচাচ্ছে।
আমি আস্তে বললুম, তোমরা থামবে?
বড়ো বউদি বলল, থামব বইকি। মিতু কথাটা তুলল তাই। ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্যেই রে সুকু। কে যে পরে কী দাঁড়াবে সে গোড়ার রকমসকম দেখে খানিকটা বোঝা যায় বইকি। রাখ তো ওসব। তোদের খবরাখবর এখনও ভালো করে শোনাই হল না। এই মিতু, রাখ তো তাস। মাধবীকে কতদিন দেখিনি। পিকলুর ছবি এবারেও আনিসনি তো?
