খবর দেওয়া ছিল না। নইলে দুই দাদার কেউ না কেউ নিশ্চয়ই স্টেশনে যেতেন। যেন আমি অথর্ব কি পঙ্গু। কতবার বলেছি এসব কোরো না। এক চিলতে একটা সুটকেস হাতে নিয়ে মিনি কি স্পেশ্যাল কি একটা ট্যাক্সি ধরে হাওড়া স্টেশন থেকে মাইল চারেক পথ চলে আসা সমর্থ পুরুষমানুষের কাছে। কিছু না। মাধবী কিংবা পিকলু থাকলেও বা কথা ছিল। কিন্তু দাদারা শোনবার পাত্র নন। মুখে কিছু বলেন না, শুধু ট্রেনটা প্ল্যাটফর্মের গলিতে ঢোকবার সঙ্গে সঙ্গে বড়দার কাঁচাপাকা চাপ-দাড়ি-অলা শেল-ফ্রেমের চশমায় তপস্বী তপস্বী চেহারাখানা, কিংবা ছোড়দার ভারি শরীরের ওপর রদ্যাঁর ভাস্কর্যের মতো বসানো ভারি মাথাটা আমাকে যুগপৎ অপরাধী এবং তৃপ্ত করতে থাকে। সত্যিকারের ভদ্রতা এবং আন্তরিকতার মধ্যে অর্থের কোনও তফাত বোধ হয় নেই। এবারে খবর দিইনি। ঠিকও করলাম হঠাৎ। খবর দেবার সময় ছিল না।
ট্যাক্সি থেমেছে কি না থেমেছে বড়দার ছেলে সৌম্য দৌড়ে এসে দরজাটা খুলে ধরল। চিনে চিনে মুখে ঠোঁটজোড়া হাসিতে সরলরেখা হয়ে গেছে। কী করে বুঝল কে জানে! পেছন পেছন ছোড়দা। হাত থেকে সুটকেসটা কেড়ে নিয়ে বললেন, কী রে, আরও কোনো মাল নেই তো?
হেসে বললাম, আসল মাল রেখে এসেছি। হালকা হয়েই ট্রাভল করা ভালো।
গুরুজনের সঙ্গে ইয়ার্কি মারছিস!
সদর ঘরের জানলা দিয়ে দুই বউদির হাসি-হাসি মুখ উঁকি মারছে। মধ্যিখানে মুনিয়ার কোঁকড়া চুলে ভরা ছোট্ট মাথাটা। দেরিতে উদয় হয়ে মুনিয়াটা মা আর জেঠিমাকে অতিরিক্ত স্নেহের মাখনে সেঁটে স্যান্ডউইচ বানিয়ে রেখেছে। এইজন্যেই বোধহয় আমি আনন্দ লেনের বাড়িতে ঘুরে ফিরে আসি। এই হাসি মুখ, উৎসুক চোখের আদর-চাউনি দেখতে, আমন্ত্রণের উদ্যত হাত ধরে এতগুলো মানুষের বুকের মাঝখানে অনায়াসে পৌঁছে যেতে। এইজন্যেই এখানে এলে মনে হয় পৃথিবীর এই এক জায়গায় আমার মতো হতভাগার জন্যেও ঠাঁই চিরকালের মতো কায়েম হয়ে আছে।
বড়ো বউদি চা নিয়ে এল। ছোটো বউদি খাবার। বললাম, আমাকে মুখ হাত ধোবার অবসরও বোধহয় তোমরা দেবে না। পিসিমার ভাষায় এই অ্যাড়াব্যাড়া কাপড়ে, ট্রেনের, ছত্তিশ জাতের নোংরা মেখে…
খুব হয়েছে, তাড়াতাড়ি করো তো। লেকচার দিতে হবে না। লুচিগুলো ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
বা বা বা! অ্যাদ্দিন পর এলুম আর ঠান্ডা ঠান্ডা চামড়া-চামড়া লুচি দিয়ে অভ্যর্থনা? নাঃ, কদন্নে পুণ্ডরীকাক্ষ করে ছাড়বে দেখছি!
তা কী করব? খবর না দিয়ে এলে আমাদের দোষ! তাও কদিন ধরে তোমার দাদার মনটা সুকু-সুকু করছিল বলেই না রোজ এ সময়টা খাবার-দাবার রাখি। নইলে হরিমটর। তা তোমার ট্রেন লেট করলে আমরা কী করব?
বউদিদের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা এইরকমই। নিজের ভাইবোন নেই। এই জ্যাঠতুতো দাদাদের সুখী পরিবারের জন্য কোনোদিন বুঝতে পারিনি। জ্যাঠাইমার কোলে-পিঠে মানুষ। কোনোদিন বুঝিওনি এঁরা আমার সহোদর নন।
ট্রেনের কাপড় ওরা ছাড়তে দিল না। শুধু মুখ হাত পা ধুয়ে আসবার ছুটিটুকু দিল। আমার মুখচোখ নাকি বলছে আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে। আসলে এক সময়ে দারুণ শরীরচর্চা করতুম। তখন আমার শরীরের যত্ন, খাওয়া-দাওয়ার নানান খুঁটিনাটির হাঙ্গামা দুই বউদি পুইয়েছে। ওরা মনে করে এখনও আমি সেই হেভিওয়েট লিফটার সুকুমারই রয়ে গেছি যে গব্যদুগ্ধের বরাদ্দ ছাড়াও সয়াবিনের প্রোটিনের জন্য বউদিদের নিত্য জ্বালিয়েছে।
সবে লুচিতে বেগুনভাজা মুড়ে একটা কামড় দিয়েছি কি দিইনি, বড়ো বউদি দ্বিতীয়বার চা আনবার জন্যে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়িয়েছে, ছটকুন অর্থাৎ ছোটো বউদি হঠাৎ চুপিচুপি গলায় বলল, জানো সুকু, রঞ্জুটার না এমন বিশ্রী চেহারা হয়ে গেছে!
এমন চমকে দিয়েছে যে জিভ কামড়ে ফেলেছি। ছটকুন অপ্রস্তুত। ঢোঁক গিলে বলল, খারাপ বলতে অসুখ-বিসুখ কিছু মনে করো না। বিশ্রী মোটা হয়ে গেছে। দ্বিতীয় বাচ্চাটা হবার পর থেকেই বেটপ একেবারে। চুলগুলোও যে কী করে অমন পাতলা হয়ে গেল! সে রঞ্জু বলে চিনতে পারবে না, মাইরি বলছি।
এই ছটকুনের একটা মস্ত দোষ। কথায় কথায় এই মাইরি বলা। ছোড়দা থাকলে ধমক দেন। আমার কিন্তু খুব মজার লাগে, মেয়েলি মুখে গুরুগম্ভীর চালে ওই মাইরি বলা। তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে উঠে পড়লুম। ছটকুন কাঁচুমাচু মুখে বলল, রান্না রেডি হতে বেশ দেরি, রোববারের বেলা সুকু, আর দুখানা লুচি নিলে না? যাও, তবে, এখন নাক ডাকিয়ে ঘুমোওগে যাও!
ঘুমোব। শুধু কদিন পর। কতদিনের নিঘুম রাত উশুল করা ঘুম। এখন ঘুম জানি না, জাগাও জানি না। পর্দা ফেলে দিয়ে এখন চুপচাপ বসে থাকব। জানলার ধারে, বারান্দার দিকে মুখ করে। এই বারান্দার পাড়ে ইয়ো-ইয়োর মতো পাক খেতে খেতে কেটেছে আমার বাল্য। এই বারান্দা চিরে দুরন্ত কৌতূহলী পায়ে দৌড়ে অদৃশ্য হয়ে গেছে কৈশোর। এখন আমার পরিণত যৌবন এই বারান্দায় কুমির-পিঠ পেতে কিছুক্ষণ ক্ষান্তির রোদ পোহাক। ছোটো ছোটো তীক্ষ্ণ চঞ্চপাখিরা আসুক সব, মস্তিষ্কের ফাঁক-ফোকর থেকে টেনে বার করে ফেলে দিক স্মৃতির ভুক্তাবশেষ। যা পুষ্ট করেছে, লালিত করেছে, অতীতের সেই স্বাস্থ্যকর স্মৃতি গভীর সুখে পরিপাক করি। যা ভেতরে প্রবিষ্ট হতে চাইল না, সেই উঞ্ছ-উদ্বৃত্ত নিয়ে কী করব?
