ভালো করে হাসো! বাঃ!-ক্লিক।
এখন সেই ছবিটাই দেখছে এণা। দেরাদুনের মামার কাছে পড়েছিল। কয়েকটা ফিল্ম বাদ ছিল, সেগুলো মামাই তুলল, তারপর বলল, আমি ওয়াশ-টোয়াশ করে পাঠিয়ে দোব কমলেশদা। বাবাও যেমন, বলল, ঠিক আছে, ঠিক আছে! এত কুঁড়ে মামা যে ছবি পাঠাতে যুগ কাবার করে দিলে। অক্টোবরের আকাশ আজ তেমনি মুসৌরি নীল, রোদ্দুরে মাঝ দুপুরের মুসৌরি ওম, তেমনি পাহাড়ি সবুজই বুঝি ফলে আছে রাসবিহারীর গাছগাছালিতে। বিকেল তিনটের নির্জনতায় চিউ চিউ করে কী একটা পাখি ডেকে যাচ্ছে ক্রমাগত, সঙ্গে সঙ্গে রাস্তা জোড়া ট্রাফিক সত্ত্বেও ছড়িয়ে যাচ্ছে ক্রোশ ক্রোশ মন-কেমন-করা নির্জনতা। এণার বুকের মাঝখানটায় সেই গোপন বালির বিন্দুটাকে ঘিরে ঘিরে কেমন একটা অব্যক্ত কান্না শরীর নেয়। শুক্তির মধ্যে মুক্তো। অন্যমনস্কভাবে একটা ঢোঁক গিলে ঘুঙুরের ব্যাগটা তুলে নেয় এণাক্ষী। আনমনেই পার হয় রাস্তা। নাচের স্কুল আছে। অন্তরা, লায়লী, কে, সাবিত্রী, উষা…ধা… ক্রেধা…ধিনতা কৎ, ধিনা নানাধা, ধিনা নানাধা, ধিনা। ভীষণ ভিড় বাসটায়। আনমনে বাসে উঠল, টিকিট কাটল। রোববারেও এত ভিড়। হাজরার মোড়। হঠাৎ ভীষণ চমকে উঠল এণা। স্টপে তিন-চারটি ছেলে খুব হাত-মুখ নেড়ে কথা বলছে। ওদের মধ্যে শফি না?শফিদা! শফিদা। এই শফি!
ও দেখতে পাচ্ছে না কেন? শুনতে পাচ্ছে না কেন? এত ভিড় টের পাচ্ছে না তো এণা! মাঝখানে তো কেউ নেই! একবার যেন তাকাল এদিকে! চোখাচোখি হয়েও হল না। কে হবে ও ছাড়া! পাকা পেয়ারার মতো মুখের রং! সোনালি সোনালি গোঁফ! একগাল কোঁকড়া দাড়ি, চওড়া কাঁধের ওপর সেই অশান্ত চুল। বাসটাতে উঠেও উঠল না যে! এণা নামতে চাইল, পারল না। সামনে জমাট মানুষের দেয়াল। যা ছেড়ে দিল। ঠিক সেই সময়ে চোখে চোখ পড়ল।
কী হল রে? ছেড়ে দিলি যে বাসটা? আচ্চা আহাম্মক তো শ্যামলের কথার কোনো জবাব দিল না কল্যাণ। সে শুনেছে। মাইল মাইল জনজঙ্গলের নির্জনতার মধ্যে থেকে শরবিদ্ধ পক্ষীশাবকের চড়া সুরের আর্ত ডাক—শফিদা! শফিদা। এই শফি! হৃদয়জোড়া বিভ্রান্তির মধ্যে দেখতেও পেয়েছে। দেখতে পেয়েছে একটি অপাপবিদ্ধ কিশোরী মুখে স্তম্ভিত বিস্ময়। অভিমান? আশাভঙ্গ। অপমানে নীল মুখখানা।
কিন্তু কী করবে সে? পথের আলাপ ঘরে টেনে আনার কোনো উপায় নেই যে তার। কি করবে সে একটিমাত্র ঈশ্বরদত্ত দীন পরিচয়ের মধ্যে আটকে থাকতে যদি না চায় মন? প্রবাসে তাই তো সে সব সময়ে অজ্ঞাতনামা গরঠিকানা। কখনো বাঙালি ক্রিশ্চান অ্যালফ্রেড বিকাশ মণ্ডল-মুখে শেকসপীয়র, এলিয়ট, হুইটম্যানের ফুলঝুরি, কখনো অমলজ্যোতি সিংহরায় রাঢ় বঙ্গের জমিদারবংশের শেষ কুলপ্রদীপ, প্রাচীন জলসাঘরের স্মৃতি কাফি ঠুংরি, বাগেশ্রী তারানার টুকরা হয়ে গলা দিয়ে বেরিয়ে আসে। কখনো এমনি গুজরাতি মুসলিম সৈয়দ শফিয়ুজ্জমান। প্রতারক? শহরতলির স্টুডিয়োতে তালা ঝুলিয়ে যখন সে একা একা বেরিয়ে পড়ে তখন তো গৃহত্যাগী বৈরাগীর মতোই ফেলে দিয়ে যায় এখানকার পরিচয়। সন্ন্যাসীরা অন্য নাম নেন না? সেও তো একরকম পরিচয় বদলের নেশা! এক পরিচয়ে যে বড়ো ক্লান্তি! পথের ঝুলি বেদিয়ার আলখাল্লা আবার পথেই নামিয়ে দিয়ে আসে মফসসলের ফটোগ্রাফার কল্যাণময় বিশ্বাস। ঘনিষ্ঠতা, বিশেষত কলকাতার লোকের সঙ্গে, সাধারণত এড়িয়ে চলে সে। এবার বড়ো ভুল হয়ে গিয়েছিল। উতরাই ভাঙতে ভাঙতে গ্র্যানাইটের দেয়ালে ফুটে ছিল হলুদ গোলাপ। চার পাপড়ির ছোট্ট ফুল! হেঁড়েনি ছোঁয়নি। শুধু চোখ মেলে চেয়ে দেখেছে। অ্যালবামের পাতায় বন্দি হয়ে থাক দু পাথরে দুই পা, পাহাড়ি গাছের ডাল হাতে পঞ্চদশী সেই ভ্রমণসঙ্গিনী। স্রোতের পাথর কি চার দেওয়ালের মধ্যে কুড়িয়ে আনতে আছে? জলের তলায় জেগে জেগে ওরা দূর আকাশের স্বপ্ন দেখে। জাগরস্বপ্ন ভাঙাতে নেই।
পরমা
কর্মস্থল পুনে। কলকাতায় জন্ম হলেও কর্ম নয়। পনেরো বছরেরও ওপর প্রবাসে কেটে গেল। এখানে আর আমার শেকড় থাকার কথা না। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক বৃক্ষের মতো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে বুঝি ভিন্ন মাটিতে রোপণ করা যায় না। নিজস্ব মাটির গন্ধ তাকে ভেতরে ভেতরে পিছু হাঁটাবেই। বুকের মধ্যে আনচান ঘুমের মধ্যে বোবায় ধরে। কোনো মহাজলধির অন্ধকার গর্ভগৃহ থেকে পাতালশঙ্খের ধবনি আবর্তিত হতে হতে উঠে আসে, জলকল্লোলের মধ্যে পিষ্ট হতে থাকে অস্তিত্ব। আঁকুপাঁকু করে জেগে উঠি। প্রাণপণে বর্তমানের, সচেতনের ভাঙা পাড় আঁকড়ে ধরি, যা নাকি অবচেতনের অনুপাতে আইসবার্গের দৃশ্যমান এক অষ্টমাংশের। মতোই অকিঞ্চিৎকর। নিজের পায়ের ছাপ ধরে ধরে মাঝে মাঝেই তাই ফিরে আসি বর্তমানের অব্যর্থ শরসন্ধানে, যদি অতীতের বিক্ষিপ্ত হারানো তিরের ফলাটা বিদ্ধ করে আনতে পারি। কিন্তু পারি না। যা নিজেরই হৃৎপিণ্ডের গভীরে প্রোথিত তাকে কি নিজ হাতে তোলা যায়? কেউ কি পেরেছে?
এবার আসাও বিশেষ করে সেই বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে। মূলের সঙ্গে যোগ সর্বস্তরে হওয়া চাই। নইলে বৃক্ষ বাঁচে না। প্রত্যেকবারই অনেক ব্যবহারিক উদ্দেশ্যের তলায় এই জরুরি আসল উদ্দেশ্যটা চাপা থাকে। কোনোবারই কাজটা হয়ে ওঠে না। এবার আমার সেই প্রয়োজন আমার সমস্ত অস্তিত্বের টুটি টিপে ধরেছে। আর সবুর সইছে না। ভালো করে নিশ্বাস নিতে পারি না। ফাউন্ড্রির গরমের মধ্যে বসে অন্য এক গৃঢ়তর তাপ আমায় দগ্ধায়, থেকে থেকে দম আটকে আসে।
