কমলেশ মুখ থেকে সিগারেটটা না সরিয়েই জবাব দেন, যাই বলুক না কেন? তাতে তোমার কী?
আমার কি? বেশ বলছ তো? আমার মেয়ে নয়?
তুমিও একদিন পঞ্চদশী ছিলে। মুগ্ধ যুবকদের সঙ্গে অনেক অর্থহীন প্রলাপ বকেছ। অনেক অর্থহীন হাসি হেসেছ। ও কিছু না।
প্রলাপ বকেছি? হায় রে! আমাদের বাগবাজারের বাড়ির বারান্দায় সাবেকি চিকটা এখন ঝোলানো আছে, ভুলে গেছ বুঝি?
তা। পাশের বাড়ির ছেলের সঙ্গে প্রেম করতে পারেনি বলে এখন হিংসেয় মেয়ের ওপর টিকটিকিগিরি করছ, এই তো!
সুস্মিতা রাগ করে এগিয়ে গিয়েছিলেন। মিটিমিটি হাসতে হাসতে কমলেশবাবু ক্যামেরা তুলে নিয়েছিলেন। তেরো নম্বর ছবিতে মায়ের রাগত প্রোফাইল। কেন রাগত এণা জানে না।
নামার সময়ে ওরা স্বচ্ছন্দে নেমে গিয়েছিল। ওঠার সময়েই হল বিপদ। বিশেষ করে সুস্মিতার। বাবা-মা ক্রমশই পিছিয়ে পড়ছে। ওরা দুজন টকাটক এ পাথরে ও পাথরে পা রেখে উঠে যাচ্ছে, কী সুন্দর মিহি রোদের দিন। পরিশ্রমে ছোট্ট ছোট্ট দানার মতো ঘাম ফুটছে কপালে।
অত জোরে দৌড়োয় না শফি বলেছিল, হঠাৎ লেগে যেতে পারে। আনন্যাচারাল ব্রিদিং হতে লাগছে তো!
হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়েছিল এণা—আনন্যাচারাল ব্রিদিং না হাতি। আমি আরও জোরে দৌড়তে পারি। নিজে আর পারছেন না তাই বলুন।
আমি পারছি না। হাউ ডেয়ার য়ু! জানো কতবার ট্রেকিং-এ গেছি! ফালুট, সান্দাকফু, রূপকুণ্ড, পাহাড়ে চড়ার কতকগুলো নিয়ম আছে বেবি, সেগুলো ফলো করতে হয়।
নববিবাহিত দম্পতি এসেছে প্রচুর। বোধহয় হনিমুনে। অস্বস্তিকর দৃশ্য চোখে পড়ছে মাঝে মাঝে। অস্বস্তি কাটাতে শফি বলেছিল—দাঁড়াও তোমার একটা ছবি তুলি। ওই উঁচু পাথরটার ওপর ডান পাটা তুলে দাঁড়াও তো!
বাঘের মৃতদেহের ওপর পা রেখে শিকারিরা যেমন দাঁড়ায়? তা আমার রাইফেল কই?
বাঃ, আচ্ছা বলেছ তো! অরিজিন্যালিটি হ্যায়। লেকেন অরিজিন্যআলিটি ইজ সিম্পলি এ পেয়ার অফ ফ্রেশ আইজ।
কোথা থেকে একটা গাছের ডাল জোগাড় করে হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল, এই নাও, এবার আর ছবিটাতে তাল কাটছে না। দিস মাস্ট বি এ পিস অফ মিউজিক।
পাঠাতে মনে থাকবে তো? ঠিকানা দিয়েছি কিন্তু কাল। আর কলকাতায় গেলেই আগে আমাদের বাড়ি।
জরুর। তবে ছবিগুলোই আসল হেডেক কিনা। মেয়েরা ছবি বিষয়ে বেদম লোভী আছে।
সত্যি বলছি। শুধু ছবিগুলোর জন্যে মোটেই নয়। একলা একলা বাড়িতে বোরড লাগে আমার। দারুণ দারুণ বিদেশি ইনডোর গেম আছে। ভালো সঙ্গী না হলে খেলা হয়? মজার মজার বন্ধু আছে। আলাপ করিয়ে দোব। রুম্পাদের রুফ গার্ডেনে মুনলাইট পিকনিক করা যাবে।
শুধু ফটোগুলোর জন্যে নয়, ঠিক? তিন সত্যি লাগাও।
বাবা বাবা! করলুম তিন সত্যি। তিন সত্যিও জানেন? কি ভীষণ সুপারস্টিশাস। গাঁইয়া একেবারে।
ও, আমার বেলা সুপারস্টিশাস! কাল তা হলে—এক শালিক দেখে অমনি কালো মুখ হল কেন?
মোটেই না।
মোটেই হ্যাঁ।
আজ্ঞে না। আমি আসলে ভীষণ আশ্চর্য হয়ে গেছিলাম। মুসৌরিতে শালিক দেখে অবাক হবো না। মনে হচ্ছিল ওটা আমাদের পার্কের শালিকটাই। রোজ যেটা রাধাচূড়ার ডালে বসে কটর কটর করে!
হতেই পারে। দোস্ত তো! তোমার ট্রেনটার সাথ সাথ উড়েছে বেচারা।
ছবিগুলো একমনে দেখছে এণা। কখনও চলে যাচ্ছে মিউনিসিপ্যাল গার্ডেন, কখনও গান হিল। বিদ্যুত্বর্ষী আকাশের তলায়, দেওদার বীথিকার পথে পথে বহু দূর। পায়ের তলায় ঘোড়ার নালে শব্দ উঠছে। ফুলকি বেরোচ্ছে। ছোটাও। ঘোড়া ছোটাও। জোরে আরো জোরে! কী বিস্ময়কর বাঁক নিয়ে পথ নেমে গেছে লালবাহাদুর শাস্ত্রী ইনস্টিট্যুটের দিকে। রংবেরঙের মোমের ফুলের মতো বিরাট বিরাট গ্লাডিওলাস ফুটে আছে ঝাড়ে ঝাড়ে। আলো হয়ে আছে কাচঘর। রবারের বোট ভাসছে লেকের জলে। সবুজ দোপাট্টা উড়ছে বোটবিহারিণীর। শফি বলেছিল–ওদের নিয়ে গোমুখ যাবে। পথ যেমনি দুর্গম। তেমনি সুন্দর। ওয়াইল্ড বিউটি। জ্যোৎস্নারাতে গঙ্গোত্রী গ্লেসিয়ার যা দেখায় না!
আসবার আগের দিন ঠিক সাড়ে সাতটায় হাজির। সেই চেক চেক গরম প্যান্ট। চকোলেট উইন্ডচিটার। তখনও প্রচণ্ড শীতের কম্বল মুড়ি দিয়ে পড়ে আছে হোটেল। এণা বলেছিল—বেডটির লোভটাও বুঝি ছাড়তে পারলেন না? বাবা! বাবা! অ্যাত্তো সকালে কেউ কাউকে ঘুম থেকে তোলে? তুললে পাপ হয়।
বাবা বলল, ঘুমো না তুই কত ঘুমোবি। তবে মনে রাখিস, আগামীকাল এরকম সময় আমরা দেরাদুনগামী বাসে চড়বার জন্যে রেডি হচ্ছি। শেষবারের মতো যা দেখবার দেখে নে।
হোটেল থেকে বেরিয়েই মা বলল, আমাদের একটা ফ্যামিলি গ্রুপ তুলে দাও তো শফি! ও একটাতেও থাকছে না।
রাস্তার বাঁকে সেই ছবি। মা-বাবার বুকের কাছে হারের লকেটের মতো দুলছে এণা। ঝকঝকে হাসি। তারপরই বাবার ক্যামেরাটা নিয়ে দুজনে ক্যামেলস ব্যাক। বাবা-মা রেস্তোরাঁর সামনে কালভার্টের ওপর বসে রইল। তেগবাহাদুরের পিঠে ওরা দুজন। সেই প্রথম দিনকার স্পটটাতে এসে রেলিফ্লেক্স তুলে নিল শফি। পেছনে আকাশ, দেওদার, নীল, কালচে সবুজ।
প্রথম দেখা যেখানে, শেষ দেখাও সেখানেই হোক, কী বলো এণা! লাস্ট রাইড টুগেদার…
এণার মনটা হঠাৎ বড্ড খারাপ হয়ে গিয়েছিল।
কেন? আজ তো সারাদিনই আমাদের সঙ্গে থাকবার কথা। বেশ তো!
সহী বাত। কিন্তু তোমার সঙ্গে এই শেষ দেখা, ঠিক কিনা? তোমার শব্দটার ওপর অস্বাভাবিক জোর। চোখে চোখ। এণা চুপ। তোমার শব্দটা ঘিরে তৈরি হচ্ছে অজানা, নিবিড় একটা অদ্ভুত গোপন অনুভূতির অবয়ব। সানগ্লাসের কুয়াশার আড়ালে এই প্রথম আরেক রকম শিশির জমছে।
