আপনি বুঝি মার্কেট রিসার্চ করেন? স্ট্যাটিসটিকস নেন ঘুরে ঘুরে? ওর দরাদরির বহর দেখে এণা বলেছিল।
তা বলতে পারেন। ডালহৌসি বাদ সব হিল স্টেশন ঘোরা কিনা। ভুটিয়ালোগদের হালচাল সব জানা। আপনার মতন তো এক মাদার নেই আমার যে প্যার সে বানিয়ে দেবেন, নিজের দেখভাল নিজেরই করতে হয়, নিজে নিজেই কিনে নিতে হয় কিনা সব!
বাবা বলল, এণুকে তুমি আপনি বলছ? হাসালে! এখনও রোজ রাত্তিরে আমার কোলে বসে পুরো এক গ্লাস দুধ খেয়ে তবে শুতে যায়। শী ইজ ফোর্টিন, গোয়িং অন ফিফটিন।
ভালো হচ্ছে না কিন্তু বাবা, এণা প্রতিবাদ করল লজ্জায়, রাগে।
সুস্মিতা বললেন, এই শুরু হল। দুজনে যত ভাব তত ঝগড়া। না শফি। এণা মোটেই অমন করে না। তবে বড্ড ভূতের ভয় কিনা! তাই মাঝ রাত্তিরে হঠাৎ লম্ফ মেরে মা-বাবার মধ্যিখানে সেঁটে যায়। যদি ভূতে হাত বাড়ায়।
এণার খুব রাগ হচ্ছিল। মাথা ঝাঁকিয়ে বলেছিল, তোমরা যা খুশি বলতে থাকো, আমিও যা খুশি করতে থাকি। ওই কাটা ফল না কী যেন বিক্রি করছে। লোকটা, ওইগুলো আমি খাচ্ছিই খাচ্ছি।
শফি খুব হাসছিল। ডানদিকে একটা গজদাঁত। হাসলে দেখা যায়।
কমলেশবাবু মোটেই করিৎকর্মা নন সুস্মিতার মতে, সুস্মিতা ভীষণ খরচে কমলেশবাবুর মতে, বাবা-মা সঙ্গী হিসেবে একেবারে হোপলেস, এণার মতে। এণা ইজ টু মাচ বাবা-মার মতে। বাবা বলেছিল, একলা একলা তোমাদের এই ইমপেচ্যুয়াস ইমপিরিয়াল মেজাজের পেয়ারকে সামলানো একটা সুপারহিউম্যান টাস্ক। যা দেখবে তাই কিনতে হবে। আর কী শেমলেস দরাদরি। একশো টাকার জিনিসটাকে বেমালুম বলে দিলে পাঁচ টাকা। আমার পক্ষে যাই বলো মোস্ট হিউমিলিয়েটিং এক্সপিরিয়েন্স!
বাবারই সবচেয়ে বেশি জিনিস কেনা হয়েছিল কিন্তু। মা রাগ করে বলেছিল, ঠিক আছে। শুধু শুধুই যখন কিনছি তখন বিলিয়ে দোব। জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকীর নেমতন্ন তত কম হয় না। তোমার বন্ধুরা—পরিতোষ ভৌমিক, অসীমাংশু চট্টোপাধ্যায় সব পরবে এখন…
তেগবাহাদুরের একটা আলাদা, একক ছবি নিয়েছে এণা। এই যে।
ওদের প্রিয় সাদা ঘোড়াটার নাম তেগবাহাদুর। কেন কে জানে? বারান্দা ছেড়ে আবার ঘরে এসে বসেছে এণা। তেগবাহাদুরের ছবিটা ব্রততীর কাকাকে দিতে হবে, অয়েলে একটা এঁকে দিতে বলবে। ওর এই ডিভানের ঠিক পায়ের দিকে থাকবে। ওর প্রিয় ভঙ্গিই ছিল কেশর ঝেড়ে আকাশের দিকে মুখখানাকে তোলা। ছুঁচোলো মুখটা দিয়ে যেন আকাশটাকেই বিদ্ধ করবে ও। শফি বলত—করবে না কেন? ও তো আসলে পিকাসোর ঘোড়া। ঘোড়াদের ভগবানের কাছে দিনরাত প্ৰে করছে—ও লর্ড, পরের জন্মে যেন এসব সওয়ার ঔর সইস লোগ ঘোড়া হয়, আর আমি যেন মানুষ হই, এ জন্মে ওরা আমার পিঠে চড়ল তো সে জন্মে হম ভি ওদের ওপর চড়ে যাব। শোধ বোধ।
ব্রেকফাস্টের পর ও রোজ এণাকে তেগবাহাদুরের পিঠে চড়তে নিয়ে যাবেই। প্রথম দিনের সেই অভিজ্ঞতার পর এণা ভয় পেত। শফি বলত, ঝান্সি কী রানি বনবার এমন চান্স কভি মিলবে না। ডরবে না একদম। ঠিক পেরে যাবে। মঞ্জিলকে লিয়ে দো গম চলু তো মঞ্জিল সামনে আ জায়ে। তোমার মঞ্জিল মুন ভি হোতে পারে। সত্যিই! পিয়ালি শুটিং ক্লাবে যায়, রত্না পাল ক্রিকেট খেলে, স্বাতী মিত্র রোয়িং করে কত প্রাইজ এনেছে,এণার মা বাবা ওকে খেলাধুলো কিচ্ছু করতে দেবে না। কেন? ক-দিনেই মন্দ শেখেনি কিন্তু। জকিদের ভঙ্গিতে সামনে ঝুঁকে দাঁড়িয়েও পড়ত মাঝে মাঝে। তখনও ও বলত, দ্য মোস্ট বিউটিফুল অ্যানিমল ইন দা ওয়ার্ল্ড। হোয়াট গ্রেস! পোয়েটিক! হিরোইক!
ময়দানে মাউন্টেড পুলিশগুলোকে দেখলেই মন খারাপ হয়ে যায় এখন। কী ভাগ্যবান লোকগুলো! দাবা খেলার সময়েও ওই ঘোড়ার চালেই বেশিরভাগ ওকে মাত করত শফি, বলত, দেখছ তো, ঘোড়াদের সঙ্গে আমার কি পার্ফেক্ট আন্ডারস্ট্যান্ডিং! অ্যান্ড দেয়ার আর মোর থিংস ইন হর্সেস দ্যান আর ড্রেমট অফ ইন ইয়োর বুকস অন চেস!
এই ছবিটা কেম্পটির পথে, বাবা তুলেছে। কত নীচে ফলস। ওপর থেকে মানুষগুলোকে ছোটো নাইলনের ডলের মতো দেখাচ্ছে। দুটো রুপোলি ধারায় নেমে গেছে প্রপাত।
শাড়ি ভিজে যাবে বলে মা নামল না কিছুতেই। বাবা তো কুঁড়ের বেহদ্দ। অন্তত দশ হাত দূরে ক্যামেরা কাঁধে দাঁড়িয়ে। বোল্ডারগুলোর ওপর নাচতে নাচতে এগিয়ে যাচ্ছিল এণা। ধা ধিনা, না তি না, তেরে কেটে ধুন, কৎ, তে ধাগে…।
কী মজা না? আপনি আগে কটা ফলস দেখেছেন?
কতো! হুড্র, উর্সি, ভিক্টোরিয়া, নর্মদা ফলস, যোগ এখনও বাদ আছে কেদার যেতে কত ঝরণা ফলস, র্যাপিডস, ক্যাটার্যাক্টস!
উসি আমিও দেখেছি, ছোটবেলায়। এটা একদম অন্যরকম, না?
নেচারে তো কভী ডুপ্লিকেট পাবে না। অর্ডারি চীজ নেই তো! মানুষ ভি ডুপ্লিকেট হয় না। আমরা সব অলগ অলগ ফলস আছি।
উরি বাবা! কবি না ফিলসফার?
স্ট্যান্ড ক্লোজ টু দা সাবলাইম, অ্যান্ড ইউ আর বাউন্ড টু বি বোথ।
আচ্ছা আচ্ছা। তা আপনি কী রকমের ফলস সাব?
আমি? অফ কোর্স নয়াগ্রার মতো। দুর্দান্ত আওয়াজ। টপ স্পিডে ঝরে যাচ্ছি। লেকেন উইনটার আনে দো। থেমে যাবো অচানক। ঝটসে জিরো ডিগ্রির নীচে যাবে টেম্পারেচার। বাস। অ্যাবসলুট সাইলেন্স।
ভীষণ অহংকারী তো দেখছি।
সুস্মিতা বললেন, কী এত বলাবলি করছে গো ওরা? অত কিসের হাসি?
