শিউরে উঠে দাঁড়ালেন সুস্মিতা। কমলেশবাবু অনেকক্ষণ থেকেই কাচের ওপর চোখ পেতে দাঁড়িয়েছিলেন। উতরাইয়ে নামছেন দুজন। গান্ধি চৌকের দিকে। ঘোড়াঅলা, রিকশাঅলারা অনেকেই খুব চেনা হয়ে গিয়েছিল। রিকশাঅলা বৈজলাল বললে, ডরিয়ে মৎ সাব। বেবি আ যায়গি বলল বটে, কিন্তু কার ঘোড়ার এণা চাপল, কোন দিকে গেল, কিছুই বলতে পারল না। মোড়ের মাথায় দুজনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে। ভাবনার ব্যারোমিটারে পারার অবস্থা বিপজ্জনক।
সুস্মিতা বললেন, চলো, বৈজলালকে নিয়ে খুঁজতে বেরোই।
কোন দিকে যাবে? তিন দিকে তিনটে রাস্তা বেরিয়ে গেছে।
তা বলে তো আর চুপ করে বসে থাকা যায় না।
ছোটাছুটিটা তুমিই করো তা হলে, আমি এখান থেকে এক পা-ও নড়ছি না।
হুয়া ক্যা? বৈজলাল, কমলেশবাবু এবং প্রায় সানেত্র সুস্মিতার সামনে যে ছেলেটি দাঁড়িয়ে, স্পাইকঅলা ট্রেকিং শু পরে দুদিকে দু পা সটান, টেরিউলের চেক-চেক ট্রাউজার্সের পকেটে হাত, বয়স বেশি না হলেও বোঝা যায় বেশ অভিজ্ঞ সে। যে কোনো পরিস্থিতির প্রভু। কমলেশ-সুস্মিতা দুজনেই বেশ ভরসা পেয়ে গেছেন। খুব সম্ভব পাঞ্জাবি-টাঞ্জাবি হবে, পাশ কাটিয়ে চলে গেল না তো? ওঁদের বক্তব্য শেষ হতে না হতেই সামান্য টান-অলা উচ্চারণে বলল, আহা! দিস গার্ল! সফেদ ঘোড়ার পিঠে একেই আমি ঘুমতে দেখেছি ক্যামেলস ব্যাকে। সোচছিলাম কি লোক্যাল মেয়ে, নইলে বারণ করতাম। দাঁড়ান, আমি দেখছি। ঘাবড়াইয়ে মৎ।
কমলেশ আর সুস্মিতা তখন পরস্পরের সঙ্গে কথা বলছেন না। দুজনে দুজনের দিকে পিঠ ফিরিয়ে।
এণার ঘোড়া খাদের বিপজ্জনক ঢালে। নাক বাড়িয়ে নীচে কী খুঁজছে সেই জানে। পিঠ থেকে নামানো ঘাড় পর্যন্ত একটা বিচ্ছিরি বাঁক। হড়কে হড়কে নেমে আসছে এণা। রাশ আঁকড়ে প্রাণপণে শুয়ে পড়েছে ঘোড়ার পিঠে। ছোকরা ঘোড়াঅলাটা সমানে হ্যাট হ্যাট করে চলেছে। এণা কিছু দেখতে পাচ্ছে না খালি নিচে খাদ, পাহাড়ি কুঁড়ে ঘর। ওরই একটার চালে সে ঝপাং করে পড়বে। তারপর গড়াতে গড়াতে গড়াতে…শেষ। হাত-পা-ভাঙা দ হয়ে বেঁচে না থাকাই তো ভালো! মায়ের মুখটা মনে পড়ছে। আছাড়ি-পিছাড়ি করে কাঁদছে। বাবা? পাথর। সামনে একটা শক্ত থাবা দেখতে পেল এণা। ঘোড়ার মুখের কাছে লাগামটা ধরেছে। তারপর এক ঝটকায় তার সাদা ঘোড়া ঘুরে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে মুখ করে ডাক দিয়ে উঠল। এণা দেখল বাদামি ঘোড়ার পিঠে চেক-চেক ট্রাউজার্স চকোলেট উইন্ডচিটার, সবল কাঁধ, দেবদূত?
আপনার মা-বাবা কান্নাকাটি লাগিয়েছেন। জলদি চলুন।
ঘোড়াঅলাটাকে সাঙ্ঘাতিক ধমক।
এই প্রথম এণাকে কেউ আপনি বলল।
কী রাগারাগি! বকাবকি! এণার সঙ্গে মা-র। ঘোড়াঅলা ছেলেটার সঙ্গে বাবার। উদ্ধারকর্তা হেসে বলল, বকাঝকা করে ফায়দা কি অ্যান্টিজি? ঘুমতে গেলে একরম কিছু কিছু হবেই, নেই হোনেসে ঘুমবার চার্ম থোড়াই আছে। জলে না নামিলে কেহ শিখে না সাঁতার…ইয়ে এক বাত হ্যায় না?
সুস্মিতা ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, তুমি খুব বাংলা বলতে পারো তো! কিছু মনে
করো না…পাঞ্জাবি…না!
উঁহু। গুজরাটি মুসলিম। মাদার ল্যাঙ্গোয়েজ সাপোজড টু বি উর্দু। জানি না। পশ্চিমবঙ্গে মানুষ। স্কুলে সেকেন্ড ল্যাঙ্গোয়েজ বাংলা ছিল। বাংলা বলতে আমার কিছু অসুবিধা নেই।
মা বলল, পশ্চিমবঙ্গে দু-তিন পুরুষ কাটিয়েও তো অবাঙালিরা ভালো বাংলা বলতে পারে না। তোমাকে উৎসাহী বলতে হবে।
বললাম না, সেকেন্ড ল্যাঙ্গোয়েজ বাংলা ছিল। আমি তো রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র সবই অরিজিন্যালে পড়েছি। যত ভালো পড়ি, তত ভালো বলি না। আরও অনেক প্রোবাদ-সুভাষিত জানি অ্যান্টিজি। অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট, নাচ নেই জানে তো উঠানকাই গলতি হ্যায়, ঠিক কি না?
মিটিমিটি হেসে সুস্মিতা বললেন, কলকাতার কোথায় থাকো তোমরা?
থাকি না, থাকতাম। ওয়েলিংটন। এখনও আস্তানা আছে সেখানে। লেবার প্রোবলেমের জন্য বাবাও ব্যাবসা গুটিয়ে দিল্লি গেলেন। আমাকেও ওখানে জে, এন. য়ুতে ঢুকতে হল।
কীসের ব্যাবসা তোমাদের?
আমাদের কি? বাবার। কেমিক্যালসের। ক্যা চিজ মুঝে মালুম নেই, অ্যান্টিজি। ইন্টারেস্ট নেই। ডক্টরেট করব। বাইরে যাব। ব্যাবসা ছোটো ভাই দেখতে হয় দেখবে। ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস নিয়ে পড়ছি।
ঠিক কি নাম যেন বললে তোমার?
সৈয়দ শফিয়ুজ্জামান। শফি বলবেন।
হোটেলে ফিরতে ফিরতে বাবা বলেছিলো, বেশ ছেলেটি।
মা বলেছিল, বাংলা সম্পর্কে মমতা আছে এরকম অবাঙালিদের ওপর তোমার বরাবরের দুর্বলতা।
উঠে দাঁড়াল এণা। কেমন অস্থির অস্থির লাগছে। ভেতরে যেন ফিউজটা জ্বলে গেছে। সব অন্ধকার। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। স্বর্ণদি বলল, আঙুরগুলান খাইতে ভুলছস এণু? বরফে রাখি? খাস। বকা খাইবি নইলে…
ক্যাশমিলনের এই মেরুন কার্ডিগানটার জন্য পঁচানববুই প্রায় দিয়েই দিয়েছিল মা। শফি বলল, কী করছেন? এ সোয়েটারবালি, সোচা সব নাদান, ক্যা?
আশাতীত কম দামে ভালো ভালো জিনিস কিনেছিল ওরা। শফি বলেছিল, চোখে লাগলে কিনে নিন, আন্টিজি। অন্য হিল স্টেশনে এরকম ফ্যাশনেবল জিনিস পাচ্ছেন না। কোনো কোনো সময় আবার বলত, দিয়েই দিন যা চায়। আফট্রল পভার্টিলাইনের নীচে তো। জ্বালানির জন্যে তামাম পাইনবন সাফ করে দিলে। এ ডিফরেস্টেশন হোনে সে ক্যা হোগা ফিউচার মে, মালুম?
