অবশেষে ভীষণ উদবিগ্ন হয়ে ওরা ইস্ট কোস্টের সবচেয়ে বড়ো আন্তর্জাতিক খবরাখবর কেন্দ্রের প্রাচ্য-বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করল। সেখান থেকে যে সংবাদ কম্পিউটারের পর্দায় ভেসে উঠল তা হচ্ছে এই বিংশ শতকের শেষ দশক থেকে কলকাতা মেগাসিটির পতন খুব দ্রুত ঘটতে থাকে। এক সময়ের প্রাসাদ নগরী, মিছিল-নগরী, হকার-নগরী ক্রমে প্রচণ্ড জনসংখ্যার ভারে বস্তি-নগরী হয়ে যায়। পথবাসী লক্ষ লক্ষ মানুষের মূত্রপুরীষের দুর্গন্ধ প্রবাহের জন্য এ নগরী এক সময়ে প্রস্রাব-নগরী আখ্যাও পেয়েছিল। জঞ্জাল-নগরী নামকরণের কিছুকাল পয়ে আবর্জনার পাহাড় যখন প্রায় সমস্ত নগরীকে ঢেকে ফেলেছে তখন অতি ভয়ানক মহামারিতে কয়েকদিনের মধ্যেই কলকাতা সন্নিহিত অঞ্চল সব মহাশ্মশানে পরিণত হয়। তারপর কালক্রমে তার ওপর ভেঙে পড়তে থাকে একটার পর একটা বহুতল। সেই সঙ্গে আরম্ভ হয় জমিয়ে রাখা নানা ধরনের বোমার বিস্ফোরণ। প্রচণ্ড চাপে কলকাতার আশেপাশে যত নদী ও জলাশয় ছিল তার জল উৎক্ষিপ্ত হয়ে কলকাতা মেগাসিটিকে ঢেকে দেয়। এই জলও সাংঘাতিক কলুষিত। কলকাতার নাম এখন ক্যালহোল। কৃষ্ণ বিবর। ইন্ডিয়ার বেশিরভাগ অংশই ক্রমশ এরকম কৃষ্ণ বিবরে পরিণত হচ্ছে। এর ধারে কাছে গেলেও এই কালো গর্তের মারাত্মক বিষ যে-কোনো জীবিত প্রাণীকে মৃত্যু-আকর্ষণে টেনে নেবে। প্রকৃতপক্ষে, মুমূর্ষ কলকাতার অদম্য সাংস্কৃতিক প্রাণশক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবার জন্যই এই সময়ে নিউইয়র্কের নতুন নাম হয় নিউ ক্যালকাটা।
ওরা এতক্ষণে বুঝল শুধু দুর্গাপ্রতিমা নয়, গোটা ক্যালকাটারই বিসর্জন হয়ে গেছে বহু বহু কাল আগে। বিশেষজ্ঞরা ছাড়া বাকি পৃথিবীর, এমনকি এক সময়ের কলকাতাবাসীরাও আর তার খবর রাখেন না।
পথিক বন্ধু
গাঢ় নীল আকাশ। মেঘলেশহীন। কালোর নানান শেড দিয়ে আঁকা একখানা অতিকায় বোল্ডার। তিনটি বাজ গাছ পেছনে। সারি সারি দাঁড়িয়ে তিনজন। হলুদ কালো সিল্কের শাড়ি পরে একটু ঘাড় বেঁকিয়ে হাসছে মা। পাশে বাবা। অর্ধেকটাই মায়ের পেছনে ঢাকা পড়ে গেছে। সদ্য-কেনা জমকালো স্লিপ-ওভারটা কী চমৎকার এসেছে! বাবার মুখে হোল্ডারে সাদা কাঠি। ঠোঁট চাপা। চোখ দুটো চশমার আড়ালে হাসি-চকচক। বাবা একেবারে পার্ফেক্ট টি. ডি. এইচ। টল, ডার্ক, হ্যান্ডসাম। বাবার হাত ধরে তার স্বাভাবিক ভীষণ আহ্লাদী ভঙ্গিতে ত্রিভঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়ে এণা। নীল জিনস, ভীষণ চওড়া ফ্যাশনেবল বেল্ট, মাস্কাট থেকে। সেজজেঠমণি এনে দিয়েছিল। বেল্টের সামনের কারুকাজগুলো পর্যন্ত নিখুঁত উঠেছে। সরু সরু ঝকমকে দাঁত বার করে গলে গিয়ে হাসছে এণা। ভীষণ ভীষণ খুশি। কানের দু পাশ থেকে ঝুলে থাকা খোলা চুলের মধ্যে দিয়ে জাফরির মতো দেখা যাচ্ছে লাল টপটার নকশা।
ডান হাতে ছবিটা নিয়ে তারিফের ভঙ্গিতে হাতটা সামনে প্রসারিত করল বাবা।
বাঃ, চমৎকার তুলেছে তো ছোকরা! একেবারে প্রোফেশন্যাল হাত। আমাদেরগুলো অত ভালো হয়নি। রঙিন বলেই উতরে গেছে।
মা বলল, তোমার হাতে ছবি এসেছে এই ঢের! মনে নেই বিয়ের পর তিলাইয়ায় কী কীর্তি করেছিলে? নতুন নতুন শাড়িগুলো পরে কতরকম পোজ দিয়ে ছবি তুললুম। সব ব্ল্যাঙ্ক! জানিস এণু, কোনোটাতে আবার ঝুমকো-পরা, আধ-খাবলা গালসুন্ধু একটা কান, কোনোটাতে ভেলভেট জর্জেটে পরা ধড়! উঃ, তোমার জন্যে আমার সবচেয়ে রোম্যান্টিক সময়টার কোনো দলিল রইল না।
আহাহা! তুমি এখন তার চেয়েও কত রোম্যান্টিক হয়ে উঠেছ নিজেই জানো, দুঃখু করছ কেন!
বাবা-মার কথা শুনতে শুনতে কুলকুল করে হাসছিল এণা।
তারপরেই হঠাৎ এণার বুকের মধ্যে জমাট পাথর। বাবা মেলে ধরেছে সেই ছবিটা। গ্র্যানাইটের উটের পিঠ উঁচু হয়ে রয়েছে। নীল আকাশের ক্যানভাসে মস্ত দেওদার সহিস পাশে নিয়ে একটি বলবান সাদা ঘোড়া। লাগাম হাতে, সানগ্লাস চোখে বিশুদ্ধ কিশোরী হাসি হাসছে এণাক্ষী।
এক্সেল বাবা বলল, আগেরটার নাম যদি দাও থ্রি ইন ওয়ান তো এটার নাম দেওয়া উচিত দ্য উইনার্স।
এই দুটোই ওদের রোলিফ্লেক্সে তুলে দিয়েছিল ও।
বাবার চেম্বারে যাবার সময় হল। মায়ের ফোন এসেছে। নতুন অ্যালবামটা এণার কোলের ওপর ফেলে দিল মা, নে, সাজিয়ে ফ্যাল, পেছনে তারিখ টারিখগুলো যেন দিতে ভুলিস না এণু।
ছবি এবং অ্যালবাম কোলে ডিভানের ওপর বসেই থাকে, বসেই থাকে এণা। বিস্বাদ সব। কেন ও জানে না। কী একটা মূল্যবান জিনিস যেন হারিয়ে গেছে, মা-বাবা যেন হঠাৎ ওকে না বলে কয়ে কোথায় চলে গেছে। কবে আসবে জানে না। অন্যান্যবার বেড়াতে গিয়ে যেসব ছবি তোলা হয় সেগুলো নিয়ে হুলস্থল। বাধিয়ে দেয় সে। বন্ধুদের দেখাতে হবে, শমীদি রাজাদা মৌ তুলতুল…কার কোনটা পছন্দ কপি করাও, দফায় দফায়। আরেকবার তাদের মতো ছবিগুলো সাজিয়ে ফেলল সে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। না, একটাতেও নেই। একটাতেও ওর একটা প্রোফাইল পর্যন্ত নেই। হারিয়ে গেল? পুরোপুরিই হারিয়ে গেল তা হলে? প্রথম দিকের গুলোতে তো থাকবেই না। কিন্তু গানহিলের ওপর সেই ঝোড়ো সন্ধ্যায়? গাইডদের মধ্যে পেশাদার ফটোগ্রাফার ছিল, তাকেই তো তুলতে বলা হয়েছিল। তা হলে কেন…। ওরা বলছিল, শিগগিরই ঘরে ঢুকুন। বাতাসে উলটে ফেলে দেবে…। ও বলছিল, একটু, আর একটুখানি দাঁড়িয়ে যাই, শুনতে পাব মেঘ বলছে দত্ত দয়ধবম, দাম্যত, দাও, দয়া করো, দমন করো। একজন ইংরেজ কবি শুনতে পেলেন আর আমরা মেঘের দেশের মানুষ হয়ে দৈববাণী শুনব না? কেম্পটিতে বোল্ডারে বোল্ডারে লাফ দেবার সময় বাবা তোলেনি? কাঠের রিকশায় ওরা যাচ্ছে, পাশে বড়ো বড়ো পা ফেলতে ফেলতে ও, চল চল রে নওজোয়ান, গান গাইছে আবার, বাবার ফরমাশ অবশ্য। রিকশায় ওঠার কথা বলতে বলল, এই বাইসেপস আর এই ছাতি নিয়ে আমি উঠব ওই দুবলা বৈজলালের কাঁধে? শেম! শেম! একেবারে খেয়াল হয়নি কারো যে ওর ছবি থাকছে না একটাতেও? অথচ এণাদের রোলিফ্লেক্সে, তা ছাড়া নিজের ভীষণ দামি কী যেন জার্মান ক্যামেরায় কত্ত ছবি তুলল ও। বারবার মনে মনে ও-ও বলে এণা যেন কেমন লজ্জা পেল। ও তো মা-রা বাবাদের বলে। শুধরে নিয়ে মনে মনে সে বলল, শফিদা। শফি।
