ইস্ট কোস্ট কালচাৰ্যাল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওরা দুর্গাপূজা ইন দ্যা স্টেটস ফাইলটা কালকনের কম্পিউটারে আনল। জানা গেল—দ্বাবিংশ শতকের গোড়ার দিকেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও লন্ডনের ভারতীয় বিশেষত বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলে দুর্গাপূজা হয়েছে। তবে একেক জায়গায় একেক দিন। কেউ যদি সেভেনথ ডে বা সপ্তমী পালন করল তো কেউ করল এইটথ ডে অষ্টমী। তবে টেনথ ডে-টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ ওই দিনেই ইমাৰ্শন আর তারপরে গেট টুগেদার। ইমাশনে অবশ্য একটা সমস্যা ছিল, কেন না বড়ো বড়ো জলাশয়ে বিসর্জনের সরকারি অনুমতি মিলত না। যাঁরা নিজেদের জমিতে পুকুর রাখতেন, তাঁরা বিসর্জনের জন্য সেগুলি ব্যবহার করতে দিতেন। পরে পরিষ্কার করাবার খরচটা নিয়ে। কাপড়ের মূর্তি করাই সবচেয়ে সুবিধে ছিল। মূর্তি আঁকা কাপড়টি ভাঁজ করে তুলে ফেললেই হল।
এরপর প্রতিমার রূপ। লেটেস্ট দুর্গাপূজা, যা নিউজার্সিতে হয়েছিল তারই ছবি কম্পিউটারের পর্দায় ভেসে উঠল।
জোহান ভালো করে দেখতে দেখতে বলে উঠল, আচ্ছা গডেস কি ওপর দিকে নীচের দিকে?
রিকির রাগ হয়ে গেল, বলল, তার মানে? নীচের দিকে তো একটা পশু!
জোহান বলল, ভালো করে দেখো অর্ধেক পশু ঠিকই, কিন্তু অর্ধেক মানুষও। তোমাদের গনেশও তো এমনি, স্ট্রেঞ্জ কম্বিনেশন। গ্রিকদের প্যান যেমন।
রযু বলল, স্ট্রেঞ্জ কম্বিনেশন হলে তুমি। দেখতে পাচ্ছ না ওই হাফ হিউম্যান ইমেজটার একটা মস্ত বড়ো গোঁফ হয়েছে! আমাদের তো গডেস!
রিকি বলল, শুনলেই তো, ইনি হচ্ছেন কিলার অব দা বাফেলো ডেমন। বাফেলোর ধড় থেকে যে লোকটা বেরিয়ে এসেছে ওটাই ডেমন। ওর বুকে একটা লানস বিধে আছে। গডেস ওকে হত্যা করছেন।
তখন ইশিকো বলল, দেখো রিকি, আরও একটা পশু কিন্তু রয়েছে। বাফেলো ডেমনের থাইয়ের ওপর থাবা বসিয়েছে। ওটাই গডেস। পশু দানবের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে মাদারও পশু হয়েছেন। ওপরের দিকে ওসব ডেকোরেটিভ আর্ট।
অনন্থ গম্ভীর মুখে বলল, তোমরা কিছুই বোঝনি। ওটা হল লায়ন। গডেস ডুর্গার বাহন মানে মাউন্ট।
লায়ন? সে তো কোন কালে পৃথিবী থেকে লুপ্ত হয়ে গেছে। আমি ভেবেছিলাম। ওটা একটা ডবারম্যান পিনশার।
অনন্থ যতই বলে, লায়ন এই সেদিন পর্যন্ত আফ্রিকার সংরক্ষিত অরণ্যে ছিল, এবং পৌরাণিক কালে লায়ন ইন্ডিয়ায় মেষের মতো চরে বেড়াত, তার কথা কেউ মানতে চায় না। শেষ পর্যন্ত গণভোটে ঠিক হল দুর্গার মাউন্ট হিসাবে একটি হিংস্র ডবারমান কুকুরকেই মডেল করা হবে।
কিন্তু মুশকিল হল আসল দেবীকে নিয়ে। কেউ এ মূর্তি মানতে চায় না, বলে, এ কী? আটটা পা-অলা এ কী স্পাইডার না ক্র্যাব না অক্টোপাস?
অনন্থ প্রাণপণে ব্যাখ্যা করতে লাগল, তোমরা গডেস কালীরও তো চারখানা হাত দেখেছ। এই গডেসের আট নয়, দশ হাত। পা লংড্রেসে ঢাকা বলে দেখা যাচ্ছে না। দশ হাতে দশ রকম অ্যান্টিক ওয়েপনস। শিল্পী একটু বাড়াবাড়ি করেছেন ঠিকই, হাতগুলোকে মুখের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, বডি বলতে কিছু রাখেননি। কিন্তু…।
কেউই মানতে চাইল না। রিকি, রযু, আর্ভিন পর্যন্ত না।
সত্যিই, একটা ফ্রেমের আধখানা জুড়ে বাফেলো-ডেমন এবং লায়ন না ডবারমান। বাকি আধখানারও আধখানায় দেখা গেল কয়েক রকম পৌরাণিক পাখি–ময়ূর, পেঁচা এবং রাজহংস যারা অনেকদিন আগেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। পরিষ্কার চেনা গেল একমাত্র র্যাট মহোদয়কে। ইনি এখনও আছেন বহাল তবিয়তে। মাঠে-ঘাটেও আছেন। ভাষাভঙ্গিতেও আছেন। সরস্বতী ও লক্ষ্মীকেও ওরা খুঁজে বার করতে পেরেছিল। লক্ষ্মীকে তাঁর পিগি ব্যাংক দিয়ে আর সরস্বতীকে দ্য গ্রেট রভিশঙ্কর সিটার দিয়ে।
অবশেষে ঠিক হল দেবী যখন প্রতীকী, তখন বিমূর্তভাবেই তাঁকে কল্পনা করা হবে। ফ্রেমের তলার দিকে থাকবে মহিষ ও উবারম্যান। দুদিকে যথাক্রমে ইঁদুর পেঁচা ও ময়ূর-হংসরাজ। গ্রাফিকস টার্মিনাল থেকে বিভিন্ন প্রজাতির পশু পাখিগুলো স্কেচ করে নেওয়া হবে। ওপর দিকে দুর্গার প্রতীক হিসেবে থাকবে একটি লানস। লক্ষ্মীর প্রতীক পিগি ব্যাংক ও সরস্বতীর প্রতীক দা সিটার। স্থানীয় শিল্পী লিন চ্যাং হালদার এরকম একটি বিষয়বস্তু পেয়ে দারুণ উল্লসিত। মরা গাছের ডাল এবং গুঁড়ি, টয়লেট ব্রাশ, ফেলে দেওয়া রঙের টিউব, সিনথেটিক কেন, কাঠকাঠরা, রবার এবং এক ধরনের প্লাস্টার দিয়ে তিনি একটি নতুন ধরনের ভাস্কর্যের পরিকল্পনা করেছেন। বিমূর্ত হতে পারে, কিন্তু লুপ্ত প্রজাতির পশু, পাখি, পুরাণ, ইতিহাস, শিল্পবোধ, ধ্যানধারণা ইত্যাদি সম্পর্কে ভাস্কর্যটি দর্শকদের মধ্যে নানা প্রশ্ন চিন্তা ও ঔৎসুক্য জাগাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
জমজমাট ভাস্কর্যই হল। গোল ফ্রেমের মধ্যে পশু-পাখি-যন্ত্র-বাদ্য সব মিলিয়ে একটা ভয়-বিস্ময় জাগানো সংহতি। কেন কে জানে এই পুজো মাইক্রো পুজো বলে খুব খ্যাতি পেল। আকারে যথেষ্ট বড়ো, সেদিক থেকে মাইক্রো হতে পারে না। চিন্তার ওয়েভ-লেনথে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কোনো কম্পন জাগিয়ে দিয়েছে কি না তা ও কেউ বলতে পারল না। কিন্তু সবাই বলতে লাগল মাইক্রো-পূজা, মাইক্রো-পূজা। যেন একটা হুজুগ।
খ্যাতি হল। কিন্তু মূল সভ্যদের মনে অশান্তি আর যেতে চায় না। ওল্ড এজ হোম থেকে অনন্থের ঠাকুর্দার বাবা ভীষণ অসন্তুষ্ট হয়ে সেলুলার ফোন মারফত বিপ বিপ করে তাঁর অসন্তোষ জানাচ্ছেন। অতিবৃদ্ধ মানুষটি কিছুই প্রায় করতে পারেন না। খালি মাথাটা এখনও মোটামুটি পরিষ্কার আছে। এইভাবেই তিনি তাঁর ঘনীভূত অসন্তোষ জানাচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত নাইনথ ডে-তে ওরা ঠিক করল আসল ক্যালকাটার পুজো একবার ওরা দেখবে। অন্ততপক্ষে ইমার্শনটা যেন ঠিকঠাক হয়। এঞ্জেল স্যাট ফোর স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ওরা কলকাতা দেখবার চেষ্টা করল। প্রথমে কিছুই দেখতে পেল না। অন্ধ তমস। এ কি রে বাবা! খুব নাকি আলোর কারসাজি হয় ওখানে পুজোর সময়ে? সে সব কই? বারে বারে চ্যানেল ফ্রিকোয়েন্সি অ্যাডজাস্ট করে, বারে বারে শুধু ওই একই দৃশ্য ফিরে ফিরে আসে। নিস্তরঙ্গ ঘন কালো জল।
