এ ক-মাসে অন্তত ছখানা চিঠি সবসুদ্ধ জে. এন. ইউতে পাঠিয়েছে এণা। একটারও জবাব আসেনি। খুবই আশ্চর্য। ইউনিভার্সিটির ঠিকানায় পাঠালে কি চিঠি যথাস্থানে বিলি হয় না? এই তো ওর মামাতো দিদি নবনীতা যাদবপুর ইউনিভার্সিটির হোস্টেলে এসে উঠেছে সম্প্রতি। গার্লস হোস্টেল বলে আন্দাজে একটা চিঠি ছেড়ে দিয়েছিল সে। দেরি হলেও পেয়ে গেছে তো ঠিক! কে জানে! জে. এন. ইউ তো বিশাল ব্যাপার হোস্টেলের নাম-ঠিকানা, রুম নম্বর-টম্বরগুলো কেন যে জেনে নেওয়া হল না! কিন্তু ও? ও-ও তো লিখতে পারে। ওর কাছে রয়েছে এণাক্ষীদের বাড়ির ঠিকানা ডিরেকশন সব। বাবা-মা কতবার করে আসতে বলেছে ওকে। খুবই আশ্চর্য! মা-বাবাকে বলতে আজকাল কেমন বাধোবাধো ঠেকে। বন্ধুদেরও! কেন এণা জানে না। কেন যে এণার জগতে প্রাইভেসি বলে বিচ্ছিরি অচেনা একটা ব্যাপার ঢুকল! কিছুদিন আগেও এটা ছিল না।
কিন্তু মুখ শুকনো দেখলেই এখনও মা জিজ্ঞেস করবে, কী হয়েছে রে এণু? মাকে এড়ানো মুশকিল। কী আবার হবে, কিচ্ছু না। মাকে কেন যেন বলা যায় না প্রথম বাহারি চিঠিগুলোর জবাব না পেয়ে রাগ করে শেষে একটা অন্তর্দেশীয় পত্র ছেড়েছিল সে, প্রেরকের জায়গায় নাম-ঠিকানা দিয়ে দিয়েছিল নিজের। ফেরত এসেছে সেটা। কথাটা কাউকে বলতে পারেনি সে। অন্তরা, লায়লী, পিউ, কাউকে না। এমনিতেই তো ওরা খ্যাপায়, কোথায় গেল রে তোর বয়ফ্রেন্ড? উবে গেল না কি? সাবলিমেশন? শুনেলও রাগ ধরে। আর ওই এক হয়েছে বয়ফ্রেন্ড বয়ফ্রেন্ড! ও তো শফিদা! অন্তরার সেই সম্রাট রায়ের মতো নাকি! ডিস্কো নাচে। কী রকম গাড়ি-বারান্দা-অলা-চুল! কি বিচ্ছিরি তাকায়! অন্তরার আড়ালে আবার ওর সঙ্গে কী রকম গদগদ গলায় কথা কয়! বয়ফ্রেন্ড! দূর। কিন্তু কোথায় যেন একটা অপমানবোধ জমে। প্রত্যাশা পূরণ হয়নি পনেরো বছরের জীবনে এমনটা আর কখনও হয়নি যে! ইশশশ! ও কি আবার ঘুরতে চলে গেল? ঘোরাই তো ওর হবি। বলেছিল, পারলে পেঙ্গুইন আর নীল তিমিদের সঙ্গেও মোলাকাত করে আসব আইসবার্গের পিঠে চড়ে। জে, এন, ইউ কি ছেড়ে দিল? কেমন একটু খেয়ালিও যেন ও। আবার ও? এণাক্ষী জিভ কাটল। শফিয়ুজ্জামান। শফি।
বিছানার ওপর ছড়িয়ে রয়েছে তেত্রিশখানা মুসৌরি। যেন পোস্টার-কালারে আঁকা। অফ সিজনের কী সুন্দর নিরিবিলি হোটেলটা! কী সস্তায় পুরো একটা সুইট! ঘরের সামনে চওড়া গোল বারান্দা। খাদের ওপর ঝুলে আছে। গোল গোল ঝুড়ি চেয়ারে নরম কুশনে পিঠ দিয়ে বসলেই কাচের ওপারে পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে অদ্ভুত আলো-আঁধারি। বড়ো বড়ো মেঘের ছায়া বিশাল হয়ে বিছিয়ে রয়েছে তলায়। ইচ্ছে করে ছুট্টে গিয়ে ওই মেঘের ছাতার তলায় দাঁড়াতে। পাক খুলতে খুলতে চকচকে রাস্তা নেমে গেছে কত দূর। গোছা গোছা গ্রামের গাছপালা ঘরবাড়ির মধ্যে থেকে একটা একবগগা পাহাড়ি নদীর মতো মনে হয় রাস্তাটাকে। রাত্তিরে অনেক নীচে অর্ধবৃত্তাকার আলোর নকশা। শফি বলত, কালো চোলিতে জরির বুটির মতো চমকাচ্ছে দেখো দুন ভ্যালি। উর্বশী মেনকা কোই হবে, নাইট ড্রেস পরেছে কালো, দারুণ না? বম্বের কুইন্স নেকলেসটা এবার গলায় ঝুলিয়ে দিলেই হয়।
গত বছর দার্জিলিঙে এদের একদম ভালো লাগেনি। ঠিক ম্যালের ওপর একটা ভীষণ পশ হোটেল ছিল সেটা। দোতলার রাস্তার ওপর ঘর। সারা দিনরাত আশপাশের রেস্তোরাঁ থেকে ঝমাঝঝম বাজনা। আনারস আর খোয়াক্ষীর দিয়ে কী সাংঘাতিক মাংস রান্না করত একটা! খেয়ে সবার পেট খারাপ। বাবা বলেছিল, কান-মাথা-পেট আপসেট করবার জন্যে এক্সট্রা পয়সা দিতে হয় জানা ছিল না আমার। ম্যালের ওপর কী অসংখ্য মানুষের ভিড়। রোগা রোগা ঘোড়ার পিঠে মোটা-মোটা মহিলা। বেনারসি। হাই-হিল। গড়িয়াহাটের মোড়ের সঙ্গে কোনো তফাত নেই। তার ওপর আবার তখন মের শেষ। সারাক্ষণ মেঘ, সারাক্ষণ বৃষ্টি, কুয়াশা আড়াল করে রইল গোটা হিমালয়। কাঞ্চনজঙ্ঘা মেঘের আড়ালেই ছুটি কাটালেন। একদিন রেঞ্জের বাঁ দিকটা একটু উঁকি দিয়েছিল, তাইতে মন আরও খারাপ। ভিজে, স্যাঁতসেঁতে, ঘিঞ্জি, নোংরা, গোলমাল, একদম বাজে!
এপ্রিলের শেষ। বাবা বলল, যাবি নাকি? একটু স্কুল কামাই হবে। কী আর করা যাবে। স্কুল কামাই না করলে কি আর দেখা যেত স্নো পিকস? লালটিববার দূরবিনে চোখ লাগিয়ে সারি সারি সাদা টুপি পাহাড়ের ছবি? ওসব মে জুন এমনকি অক্টোবরেও নাকি দেখতে পাওয়া যায় না। কী ঝলমলে আবহাওয়া! সব সময়ে যেন হালকা হলুদ রঙের একটা চুন্নি দুলছে চোখের সামনে। মিষ্টি-মিষ্টি আইসক্রিম-ঠান্ডা রোদ। চুপচাপ চারদিক। রাসবিহারীর ঠিক মাঝ মধ্যিখানে এণাদের বাড়িটা। ঢং ঢঙে ট্রাম, শাঁ শাঁ বাস, ধড়ফড় করতে করতে লরি-ট্রাক টেম্পো সবই চলছে। মা বলে, বাবা রে বাবা! ঝালাপালা করে দিল কান!
এখানে মে-জুন মাসে উত্তরপ্রদেশ, দিল্লি, পাঞ্জাব থেকে দারুণ গরমের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্যে কিছু কিছু লোক ছুটে আসে ঠিকই। কিন্তু এখনও সে ছুট পুরোপুরি আরম্ভ হয়নি। শহর একরকম ফাঁকাই। চওড়া, কালো রাস্তাগুলো সারাদিন পড়ে পড়ে অতিকায় ময়ালের মতো রোদ পোহায়। গাছের মধ্যে থেকে কী-সব পাহাড়ি পাখি অদ্ভুত স্বরে ডাকতে থাকে। নির্জনতা যেন আরও বেড়ে যায় তাতে। উতরাই ভাঙতে ভাঙতে গ্র্যানাইটের দেয়ালে চার পাপড়ির হলদে গোলাপ। মা বাবা খালি বলছিল, তুই যা দুরন্ত, ছটফটে, ঠিক দেড় দিন পরেই বলবি, বোরড হয়ে গেলুম। জাঠতুত দিদি মীনাক্ষীকে অনেক সাধাসাধি করেছিল আসতে। হায়ার সেকেন্ডারি ফাইনাল ইয়ার। সায়েন্স নিয়ে হিমসিম খাচ্ছে, স্কুল কামাই করতে সাহস পেল না। সারা বছর রোগীর ভিড় ঠেলতে হয় যে মানুষটাকে, সারা বছর শব্দদূষণে ভুগছেন যে মহিলা তাঁদের কাছে নির্জনতা আশীর্বাদ এবং নিরাময় মনে হতে পারে। কিন্তু এণা!
