আপনি কীভাবে বেচেছিলেন দাদা?
আরে ভাই আমি কি অত কুটকচালে জানি? তবে অ্যাজ ইজ হোয়ার ইজ বেচিনি। বেচেছি উইথ ফিটিংস অ্যান্ড ফিক্সচার্স। এখন তুমিই বলো না ছবি কি ফিটিংস এর মধ্যে পড়ে? ও তো হুক থেকে খুলে নিলেই হয়ে যায়। সে কথা প্রোমোটারকে বলতে বলল, আমি তো বাড়ি কিনেই ভাঙার অর্ডার দিয়ে দিয়েছি। কোথায় কী ছবি আমি জানি না। তো এখন দেখো, তুমি যখন ভাঙার কনট্রাক্ট নিয়েছ, ছবিগুলো তুমি উদ্ধার করতে পার কি না। মামলা-টামলা করাই যায়। কিন্তু এখন আর এর জন্যে মামলার খরচ চালাতে আমি রাজি নই। মানে ক্ষমতা নেই।
দেখি কী করতে পারি ভাবিজি–জয় বিনীতভাবে বলল, তবে ভাঙার কনট্রাক্ট আমার না। তার জন্য অন্য নোক আছে। আমি ভাঙার পর এইসব মাল কিনেছি। যদি খুঁজে পাই নিশ্চয় আপনাকে দিয়ে আসব। আপনি কোনো চিন্তা করবেন না।
সল্টলেক পূর্বাচলে সুদর্শন সরকারের ফ্ল্যাট। বেশ প্রশস্ত, সুন্দর। তাতে পুরোনো বাড়ি থেকে কিছু কিছু ফার্নিচার রেখেছেন ভাবি। যেমন ডাইনিং চেয়ার। সেসব কবেকার, কোন আমলের ফার্নিচার কিন্তু গ্লেজ দিচ্ছে কী? আলমারিটা অবশ্য বেডরুমে। একবার পর্দা সরিয়ে ভাবি বেরোবার সময়ে এক ঝটকা দেখা গেল। যেমন বিরাট, তেমন সুন্দর।
দর্শনদা বললেন, বেশিরভাগই এত বড়ো আর এত ভারী যে আমাদের ভাই সাধ্যে কুলোল না যে রাখি। তোমার ভাবির এজন্য অবশ্য খুবই নালিশ আমার কাছে।
আকাশি রঙের ডুরি শাড়ি-পরা ভাবি চা দিচ্ছিলেন। এক গোছা চুল হাত দিয়ে সরাতে সরাতে শুধু বললেন, আমি কিন্তু আনরিজনেবল নই জয় ভাই। একেবারেই না।
আচ্ছা দাদা, মনে কিছু করবেন না, আপনি আজকাল করেন কী? এঞ্জিনিয়ারিং পড়তেন না?
ভাবি তাড়াতাড়ি বললেন, আরে সে তো অনেক দিনের কথা। বিচ্ছিরি ধরনের লাম্বার স্পন্ডিলাইটিস হল, উনি কাজ ছাড়তে বাধ্য হলেন।
কোনো চিকিৎসা নেই এর?
চিকিৎসা তো হচ্ছেই, হয়েই চলেছে, কিন্তু রোগটা বাড়ে কমে, একেবারে সারে না।
দু-চারদিন আসাযাওয়া করেই জয়প্রকাশ অবশ্য বুঝে গেল। এই কাজ না করে করেই শ্বশুরের বাড়িটি ফুকে দিয়েছেন ইনি। সম্ভবত ওই বাড়ির মূল্য দিয়েই এই ফ্ল্যাট কেনা এবং কিছু আমানত করা—তাতেই এঁদের চলে। ছেলেপুলের কথা তুলতেই দুজনে উদাস হয়ে যান। এ কথা জয়প্রকাশ কিছুতেই বুঝতে পারে না তার পুঁটলি পত্নী যদি তাকে বারো বছরে ছটি সন্তান উপহার দিয়ে থাকতে পারে তা হলে এই পরিপাটি চমৎকার চাঁপা রঙের ভাবিটি কেন এতদিনে একটিও…না, এসব ভগবানের খেলা।
চিৎপুরের বাড়ির চিত্রের খোঁজও চলেছে, এদিকে জয়প্রকাশও সুদর্শন সরকারের বাড়ির নিয়মিত অতিথি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর কিছু না, এই চমক্কার কারুকার্যের নীচু টেবিল সামনে নিয়ে আরামদায়ক মেরুন সোফায় হলুদ কালো কুশনে ঠেস দিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকা, মাছের চপ, কি মাংসের কাটলেট রেস্তোরাঁর মতো, কি তার চেয়েও ভালো বানান শিপ্রাভাবি আর চা-টা তো দার্জিলিঙের ফ্লেভারে ভরা। ঢাললে গোটা ঘরটাই সুগন্ধে ভর ভর করে। আর কিছু নয়, হলুদ কিংবা গোলাপি কিংবা আকাশি কিংবা সাদা শাড়ি পরা একজন সভ্য সুশ্রী মহিলা, যাঁর গলার স্বর, ভাষা, চলনের ধরন সবই মানুষকে নেশায় ফেলে দেয়। নেশাও নয় ঠিক। একটা শান্তি, শান্তি দেয় মানুষকে, সেই তাঁর সমীপে বসে নিজেকে শান্ত, সুস্থ, স্বস্তিমান করে তোলা, আর সেইসঙ্গে সেই ছেলেবেলার অমল দিনগুলো, গৌতমদার সঙ্গে অচ্ছিন্ন অভিন্ন খেলাধুলোর খেলাভোলার দিনগুলোর স্মৃতি নিয়ে নাড়াচাড়া করা।
এই সময়েই সে খবর পেল প্রামোটার রামলগন বৈদ মুম্বই থেকে ফিরে এসেছে। রামলগন তার বন্ধু না হতে পারে, চেনাশোনাও খুব না থাকতে পারে, কিন্তু দেশোয়ালি তো! বলা-কওয়া কিছু না করে জয়প্রকাশ একদিন প্রায় প্রত্যুষে রামলগনের কোঠিতে হাজির হয়ে গেল। রামলগন তখন লোটাভর ভইসের দুধ গিলছে।
আরে আরে জয়পরকাশজি, আপ ইত্যা সবেরে!
কোনো ভূমিকা না করেই জয়প্রকাশ বলল, ধান্ধে মে আয়া ভাই। পেইন্টিং হ্যায় না ও চিৎপুর কী কোঠির? উও সব নিকলাইয়ে।
কাঁহা তসবির? ক্যা তসবির।–রাগ-রাগ মুখ রামলগনের। কিন্তু জয়প্রকাশের কঠিন দৃষ্টির সামনে সে ফ্যাকাশে হতে শুরু করেছে তা বুঝতে জয়প্রকাশের দেরি হল না।
উইথ ফিটিংস অ্যান্ড ফিক্সচার্স কিনেছেন শুনছি, তা তসবির ফিটিংস না ফিক্সচার্স কোন ক্যাটিগরিতে পড়ে রামলগনজি?—তার গলা উত্তরোত্তর কড়া হচ্ছে, সুদর্শন সরকার আর তার মিসেস আপনার বিরুদ্ধে কেস করবেন। খাস গাওয়া আমি আনব। বাস, হয়ে যাবে আপনার মাল্টিস্টোরিড, বারোটা বেজে যাবে আপনার রিয়্যাল এস্টেটের কারবারের।
আরে, ভাই বৈঠেন। এই কে আছিস রে? জয়পরকাশজির জন্যে মসালা চায় আর কচৌড়ি নিয়ে আয়। বসুন ঠান্ডা হয়ে, তবে তো কথা করবেন!
রামলগনের চেয়ে জয়প্রকাশের ব্যক্তিত্ব বেশি দেখা গেল। ছবির কথাটা সে বেশিক্ষণ অস্বীকার করতে পারল না। তবে কিছুক্ষণ পরেই তার চোখদুটো অন্য কোনো মতলবে চকচক করে উঠল। সে আসলে এই বিশেষ কাজেই মুম্বই গিয়েছিল, সেখান থেকেই বুঝে এসেছে কত গেঁহুর দানার কত আট্টা। ছবির বান্ডিলটা সে বার করে আনল। ভাবির দেওয়া লিস্টটা আজকাল জয়প্রকাশের পকেটেই ঘোরে। লিস্টে আসলে মেলানো শুরু হয়।
