রাত্তিরে পুঁটলিটি খানিকটা পদসেবা করবে তার, তারপর পরম কর্তব্যবোধে পতিদেবতার বুকের কাছটিতে আরও পুঁটলিকৃত হয়ে শুয়ে পড়বে। কী বলবে, জয়পরকাশের মনে হয় লাথ মেরে ওই পুঁটলিকে সে খাটের বাইরে ফেলে দেয়। কিন্তু কী করে, সে তো খানদানি হতে চাচ্ছে কিনা, তা ছাড়া ঘি আর আগুন পাশাপাশি থাকলেই একসময়ে জ্বলবেই, বহুদিন আগে মহাজনরা বলে গিয়েছেন।
তবে ধীরে ধীরে লোহার খাঁচা থেকে বেরিয়ে আসার সেই উচ্চাকাঙক্ষা তার ফলতে লাগল। পুরোনো জিনিসই। কিন্তু এখন সে কেনে পুরোনো জাহাজ। কেনে আর তাকে ভেঙে তার লোহা, কাঠ, নাটবল্ট স-ব বেচে দেয়। এই কেনাবেচা করতে করতে ক্রমে তার মাথা এমনি পাকা হয়ে উঠল যে সে জলের দরে জাহাজ কিনে ফেলতে লাগল। একটার পর একটা। কামতাপরসাদ গোড়ার দিকে ভয় পেয়েছিলেন, এ কলেজে পড়া বেটার দ্বারা বেওসা হবে কি না হবে। তারপর যখন সে জাহাজ কেনা ধরল আতঙ্কে তাঁর মহাপ্রাণী খুবই লম্ফঝম্প করেছিল। কেননা টাকাপয়সা একগাদা লগ্নি করেই বেওসা করবে তো তোমার নাফা হবে কেন? তাঁর ক্যাপিটাল থাকত প্রায় শূন্য। তাই নাফার পরিমাণ আর পার্সেন্টেজ হত চমৎকার। প্রায় হানড্রেড পার্সেন্ট। তা বেটা তো তাঁর নয় দেখা যাচ্ছে, কোনো সাধুসন্তের হবে। সে তো চোরাই জিনিস ছোঁবে না।
এই সময়ে একদিন জে, পি-র বন্ধুস্থানীয় এক সুরজলাল তাকে বলল, বড়ো বড়ো বাড়ি ভাঙা হচ্ছে। বাড়ি তো নয় প্রাসাদ। তা সেসব বাড়ির জানলা, দরজা, ইটালিয়ান মার্বেল, টাইলস, মূর্তি, ফার্নিচার…সবই আচ্ছা আচ্ছা চিজ। সে যদি কিনে নেয় এক লটে তো বহোৎ নাফা আসবে। কথাটা জয়পরকাশের মনে ধরল। সুরজ তার বন্ধুলোক। চাটার্ড অ্যাকাউন্টেট-এর কাম করে, কিন্তু মার্কিট সম্পর্কে তার ধারণা খুব ভালো।
এইরকম এক বাড়ির মাল কিনতে গিয়ে ক-দিন তার এক অদ্ভুত দম্পতির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ভাঙা বাড়ির রাশীকৃত জঞ্জালের মধ্যে স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন! ভদ্রলোক ফরসা, ভদ্রমহিলা আধা-ফরসা। ভদ্রলোক অনেকটা লম্বা। ফুট ছয়েক হবেন, আদ্দির পাঞ্জাবি আর কুচোনো ধুতি পরা। মহিলাও তাঁর সঙ্গে মানানসই, এত সুন্দর কুঁচি দিয়ে কালো পাড় একটি হলুদ কি নীল শাড়ি পরেন যে জয়প্রকাশের একটা অদ্ভুত সম্ভম বোধ হত। একদিন, দুদিন, তিনদিন, সে সেদিন একাই ছিল, একটু সাহস করে এগিয়ে গিয়ে বলল, নমস্তে, আপনারা কি কুছু খুঁজছেন?
ভদ্রলোক তার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বিস্ময়ের সুরে বললেন, আপনি…মানে তুমি, জয় না?
জয় নামটা বহু বহুদিন পর শুনল সে। সুরজরা তো শুধু পরকাশ বলেই ডেকে থাকে।
সে এবার বলল, আপনি আমাকে চিনেন?
বাঃ চিনব না? গৌতমের কত বন্ধু ছিলে। দিনরাত তো আমাদের বাড়িতে পড়ে থাকতে।
আপনি?
আমি গৌতমের বড়দা, এখনও বুঝতে পারছ না?
ও হো হো, আপনি সেই দুশমনদা, হায় হায়!
জয় নীচু হয়ে তাঁকে প্রণাম করতে যেতেই তিনি হাত দুটো ধরে নিলেন। হা-হা করে হেসে বললেন, শুনছ, আমার নাম এরা কী দিয়েছিল? দুশমন! গৌতমটা এত শয়তান ছিল! ওর শয়তানি সব আমি কাকাবাবুর কাছে ফাঁস করে দিতাম, মাস্টারমশাইদের বলে দিতাম কিনা তাই আমাকে ও দুশমনদা বলত! তা জয়, তুমি তো বাংলা বুলি বেশ ভালোই বলতে!
জয় সম্বোধনে পুনঃপুলকিত হয়ে জয় বলল, এখনও তো বলি। বলতে পারি। তবে বলবার সুযোগ তো হয় না! বাঙালিরাও আমাদের সঙ্গে ভাঙা হিন্দিতে কথা বলেন। তা দর্শনদা, কী ব্যাপার?
সুদর্শন বললেন, আগে তোমার বউদিদির সঙ্গে পরিচয় করো। শিপ্রা, এ হল সেই জয়, তোমাকে বলতাম না আমাদের পাশের বাড়ি থাকত। আমাদের পুরানো বাড়ি গো…সেই যখন যৌথ…
হ্যাঁ হ্যাঁ হাসি-হাসি মুখে ভদ্রমহিলা বললেন।
জয়প্রকাশ বুঝতে পারল দর্শনদা কোনোদিনই তার বা তাদের কথা স্ত্রীকে বলেননি। বলবেনই বা কেন? ওঁরা অনেকদিন ওখান থেকে চলে গেছেন, অনেক বছর পার হয়ে গেছে। তা ছাড়া তার বন্ধু ছিল গৌতমদা, সে হলে হয়তো তার স্ত্রীকে বললেও বলতে পারত। কিন্তু এই ভাবিজি স্রেফ ভদ্রতার খাতিরে অমন বড়ো করে হ্যাঁ হ্যাঁ করলেন।
সে জিজ্ঞেস করল, গৌতমদা কোথায়?
সে তো বহুদিন ইংল্যান্ডে পাড়ি দিয়েছে। সেখানেই ডাক্তারি করে, সেখানেই বিয়ে শাদি করেছে। আসে মাঝে মাঝে…
তা আপনারা এখানে? কী ব্যাপার দাদা?
আর বলো কেন? শিপ্রার বাবার বাড়ি এটা। বিক্রি হয়ে গেল।
শিপ্রাভাবি যেন কেমন একরকম করে দাদার দিকে চাইলেন। পুরো চোখে চেয়েই আবার চোখটা ফিরিয়ে নিলেন।
তা সে যাই হোক, এসো আমার বাড়ি একদিন…ভালো কথা তুমি এখানে কেন?
আমি এই ভাঙা বাড়ি কিনেছি দাদা।
আচ্ছা! অবাক হয়ে উনি বললেন, কিনেছ!
আজ্ঞে।
কী করবে?
এই সব কাঠকাঠবা, জাফরি, মার্বেল সব আলাদা আলাদা দামে বিক্রি হবে দাদা।
ভাবি তখন দাদার দিকে চেয়ে মিনতির সুরে বললেন, তা হলে ওঁকে বলো না
কী হবে? দর্শনদা হাত উলটোলেন।
কী ব্যাপার? বলুনই না!
দর্শনদা বললেন, আরে ওঁর কিছু প্রিয় ছবি ছিল বাড়িতে। সে ছবিগুলো তো উনি বিক্রি করেননি। কিন্তু প্রোমোটাররা সবসুদ্ধ নিয়ে নিয়েছে। ভেঙে চুরে একাকার সব। আমারা ছবিগুলো খুঁজতে আসি। এটা ওটা সরিয়ে, যদি পাওয়া যায়।
জয়প্রকাশ দেখল ভাবি অন্য দিকে চেয়ে আছেন। খুব সম্ভব, সজল চোখ দুটো আড়াল করবার চেষ্টা করছেন।
