১ নম্বর—রাজা নল দয়মন্ত্রীর কাছে হংসদূত পাঠিয়েছেন। থামের ওপর সেই হংস, সামনে থামে কনুই রেখে দময়ন্তী।
২ নম্বর—দ্রৌপদী স্বয়ংবর। অর্জুন লক্ষ্যভেদ করছেন। দ্রৌপদী ধৃষ্টদ্যুম্নর সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন বরমাল্য হাতে।
৩ নম্বর—নীলচে সাদা জলের টইটম্বুর সরোবর। ভেতর থেকে উঠে আসছেন গোলাপবর্ণ দেহত্বকের এক লাবণ্যময়ী সিক্তবসনা সুন্দরী।
৪ নম্বর—সাদা-কালো আরও কিছু গাঢ় রঙের আলোছায়ায় নকশা মতো। যেন ভূতের-বাড়ি।
৫ নম্বর—খোয়া-ওঠা গর্ত-অলা লালচে মাঠ। গোরুর পাল তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে রাখাল। সময় গোধুলি শেষ।
৬ নম্বর—একটা লম্বা টেবিলে বারোজন আলখাল্লা পরা শিষ্য বসে আছে। মাঝখানে যিশু। রুটি ভাগ করে দিচ্ছেন।
৭ নম্বর–কাটা ছেঁড়া মানুষের হাত পা ঘোড়ার মুণ্ডু—এসব দিয়ে এক আজব নকশা।
রামলগন বলল, সমঝলেন না জয়পরকাশজি। এই ছে আর সাত হল ছবির প্রিন্ট। বিলাইতি ছবি, ছেপে ছেপে বিক্রি করা। এগুলোর তেমন কোনো দাম নেই। কিন্তু বাকি পাঁচটা এক্কেবারে আসলি চিজ। এসব আর্টিস্টদের নিজের হাতে আঁকা, কেউই আর জিন্দা নেই। আজকাল ছবির বাজার গরম। এসব পুরোনো পেইন্টিং কোনোটা লাখ, সওয়া লাখের কম হবে না। এসব ফিরৎ দিব কেন? আপনি আমি শেয়ার করে লিবো।
কথা না বার্তা না। বাঁধানো ছবির বান্ডিলটা জয়প্রকাশ তুলে নিল। তার মুখ থমথম করছে।
রামলাল হাঁ হাঁ করে উঠতে না উঠতেই সে কড়া গলায় বলল, চোরির মতো গন্ধা কামে আমি আপনাকে মদৎ করবো সোচছেন তো ভুল সোচছেন রামগলনজি। হয় এ ছবি ফিরত, নয় মামলা। ওঁরা আমার বন্ধুলোগ।
দেখেন উ সব মামলা-উমলা আমি থোড়ি ভয় পাই।—রামলগন বলল, খালি ডেট লিব, খালি ডেট লিব। ও বাঙ্গালিবাবুকে আমি চিনি, ও সির্ফ হ্যারাস হয়ে ছেড়ে দিবে। লেকিন, আপনি যখন বলছেন আপনার বন্ধুলোগ, তো ঠিক হ্যায় জি, এক কাম করুন, ও পাঁচটার মধ্যে থেকে একটা অন্তত আমায় দিন।
ঝুললাঝুলি করে প্রথম ছবিটি আদায় করে নেয় রামলগন।
অতঃপর ছবির বান্ডিল নিয়ে একদিন সুদর্শন সরকারের ফ্লাটে গিয়ে ভাবিজির পায়ের কাছে পুষ্পর্ঘ্যের মতো সেগুলো নামিয়ে রাখে জয়প্রকাশ। শিভাবি ভীষণ আগ্রহে, ভীষণ স্নেহে খুলছেন ছবির মোড়ক। কাচ একটু আধটু ফেটেছে, ধুলোর দাগ কাচের ওপর।
আর? আরগুলো? রবি বর্মা, হেমেন মজুমদার, আমার গগনঠাকুর, যামিনী গা,… কথা শেষ করতে পারেন না শিপ্রাভাবি। গলা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
এইসব মানুষদের পোট্রেট ছিল বুঝি? আপনাদের আপনজন? তা এসব তো আপনার লিস্টে ছিল না ভাবিজি।
শিপ্রা কোনো মতে বলেন, না, না, পোট্রেট নয়, ওঁদের আঁকা ওগুলো।
এ দুটো অনেক কষ্টে রাবল-এর মধ্যে থেকে উদ্ধার করেছি ভাবিজি। দেখুন না সিসা কেমন ফেটে গেছে। রামলগন আপনার প্রোমোটার বলছে বাড়ি কিনেই সে ভাঙতে দিয়ে খালাস, আর কিছু জানে না।
ফ্যাকাশে মুখে চা ঢালতে লাগলেন হলুদ শাড়ির ভাবি। হাত থরথর করে কাঁপছে। প্রাণপণে আত্মসংবরণ করতে চেষ্টা করছেন তিনি। নেহাত বাইরের মানুষ যেন বুঝতে না পারে তাঁর ক্ষতির পরিমাণ, আবেগ, কষ্ট, হতাশা। চোখ ভরে সেই বেপথুমতীকে দেখতে থাকে জয়পরকাশ, নাক ভরে নিতে থাকে বাস আর ভাবতে থাকে যদি লাখ দেড়েক করেও হয় গড়, তা হলে চারটেতে সে পায় ছয় লাখ। আর একটু কমিয়ে ধরলে পাঁচ। পিতাজি বলেন, আমি আর আমার বাবুজি জিরো ক্যাপিটাল থেকে এত বড়ো কারবার বানিয়েছি বেটা—এই মকান, হাবেলি এই গাড়ি। আর তুমি খালি টাকা লাগাচ্ছ, টাকা লাগাচ্ছ।
জয়পরকাশ একটু হাসে। এখন এটাকে পিতাজি কী বলবেন? জিরো ক্যাপিটালই তো? আর নাফা?
পঁচিশ শো-র এঞ্জেল সিটিতে
এঞ্জেল সিটির ফর্টিসেভেনথ স্ট্রিটে অর্থাৎ শহরের প্রায় প্রাণকেন্দ্রে কালকন বা কালী কনশাসনেসের অফিস, কনফারেন্স হল, টেম্পল। সবই একটি বহুতলের পঁয়ষট্টিতলায়। সেপ্টেম্বরের গোড়ায় অফিসে বসে কার্যনির্বাহী সমিতির কয়েকজন সদস্যের মধ্যে আলোচনা হচ্ছিল। এরা হল যুবশাখার কর্মী। বেশিরভাগ কাজকর্মই করে এরাই। যদিও গেরেম্ভারি ওপরওলারাও আছেন।
অনন্থই প্রথম তুলেছিল কথাটা। শুধু বলেছিল শেম।
কার কথা বলছ? কেন? রযু ভুরু কুঁচকে প্রশ্ন করেছিল।
ক্রিসকন যেভাবে জুলন সেলিব্রেট করল…
কেন, চমৎকার হল তো! গর্জাস! পাপেটস বলো ড্রেস বললা… ফ্যান্টাসটিক!
রিং-এর মধ্যে পুরো শো-টা স্লো মোশনে ঘুরে যাওয়ার আইডিয়াটাও বেশ। আচ্ছা রিং-এর মাঝখানে ক্রিসমাস ট্রি-র মতো ওটা কী ছিল বলো তো?–রিকি জিজ্ঞেস করল।
অনন্থ বলল, কদম গাছ। লর্ড কৃষ্ণার ফেভারিট ট্রি।
আর্ভিন বলল, গর্জাস অ্যান্ড ডেলিশাস! চমৎকার ভেজ ফ্রড ছিল। ম্যাক ফার্সনস-এর সুপারফাস্ট ফুডগুলো খেয়ে খেয়ে আমার জিভ থেকে লিভার পর্যন্ত সব পচে গেছে। মার্ভেলস অ্যান্ড ডেলিশাস ওদের ওই ম্যালপুয়া। আ উইশ আ কুড় হ্যাভ মোও। আমার মাম্মি বলছিল, মনে হচ্ছে গুড ওল্ড ক্যালকাটায় ফিরে গেছি।
শিট! তোর মাম্মির মাম্মি কখনও ক্যালকাটায় গেছে? ঠোঁটে একটা তাচ্ছিল্যের ভঙ্গি করে বলল লিজ।
তোর মাম্মিজ মাম্মি গেছে নাকি? আর্ভিনের গলায় যথেষ্ট রাগ।
স্টপ ইট। আমাদের কারুরই বোধহয় চোদ্দপুরুষ ক্যালকাটায় যায়নি। তাতে কী? আর্ভিন ক্যালকাটা কালচার, ক্যালকাটা অ্যাটমসফিয়ারের কথা বলছে। সত্যি, ক্রিসকন একটা কাজের মতো কাজ করছে। সারা বছর জুলন, ডোল, রথ ইয়াত্রা কতরকম সেলিব্রেট করে আমাদের ঢার্মা অ্যান্ড কালচার বাঁচিয়ে রেখেছে— অনন্থ মহা খেদের সঙ্গে বলল।
