ঠাকুরদার অন্য ভবিষ্যদ্বাণীটাও সত্য হয়েছিল। কিন্তু কামতাপরসাদ সে কথা জানতেন না। জয়প্রকাশ চাকরি খোঁজা শুরু করে দিয়েছিল। সেই কণ্ঠ-ন্যাঙট বাঁধা—হাতে বই বাকসো-টাইপের চাকরি। কিন্তু ভালো কোথাও সে কিছু পেল না। সাড়ে চার হাজার টাকা যে হিসেবহীন মাসোহারা পায় তার তো খুব অল্পস্বল্পের চাকরি পছন্দ হবার কথা নয়। সরকারি অফিসের তো কথাই নেই, এক্সচেঞ্জ ছাড়া সেখানে ঢোকাই যায় না। কেতাদুরস্ত মার্চেন্ট অফিসগুলোও তাকে ফেরাল। মারোয়াড়ি ফার্মে সে পেয়ে যেত, যদি মারোয়াড়ি হত। কিন্তু সে তো ফৈজাবাদি, উত্তরপ্রদেশীয়। এরা ও মারোয়াড়িরা পরস্পরকে তাচ্ছিল্য ও অবিশ্বাসের চোখে দেখে। সে রোজগার ছেড়ে অন্য ধান্দায় মন দিল।
তার, সত্যি কথা বলতে কি, এখন বিশ্বগ্রাসী ক্ষুধা। চারদিকে কোমল অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সব ঘুরে বেড়াচ্ছে। নবনীত কোমল। কত রকম। পাকা ধানের রং, কাঁচা ধানের রং, পেঁহুর মতো, জওয়ানের মতো, চিনেমাটির ফুলদানির মতো, জ্যান্ত একেবারে জ্যান্ত। ধরতে চাইলেই ধরা যায়। সাড়ে চার হাজার তো হাতেই, তা দিয়ে কিনতেও পাওয়া যায়। কিন্তু তার অত দুঃসাহস নেই। অসুখের ভয়েই হোক, আর ধরা পড়ার ভয়েও হোক সে ব্লু ফিলম এবং স্বমেহনেই ক্ষান্ত রইল। হুইস্কির পেগে চুমুক দেয়, নীল ছবি দেখে, আর শরীরের নিম্নাঙ্গে তার হাত চলে যায়। কিছু বন্ধুবান্ধবও জুটল। তারাও একই পথের পথিক। একসঙ্গেই সব কিছু উপভোগ করে।
শেষে একদিন তার মা কপাল চাপড়ে সাশ্রু নয়নে কামতাপরসাদকে বললেন, আমাদের বহু কি আনবে না? বেটা যে হয় যোগী নয় জাহান্নমবাসী হতে চলল।
শাদি? কামতা আকাশ থেকে পড়লেন। শাদি আর এমন কি ব্যাপার? তিনি হাত ঝাড়া দিলে অমন একশোটা শাদি হয়ে যাবে। তো ছেলেকে রাজি করাও। তাঁর ধারণা ছিল রাজি হবে না। ছেলে কিন্তু দু-চারবার নিয়মরক্ষার না, নাকরেই রাজি হয়ে গেল, খালি মাকে বলল, কুৎসিত মেয়ে সে শাদি করবে না। সুন্দর চাই।
তো তারই বা অভাব কী? ফৈজাবাদি আওধওয়ালিদের মধ্যে কী সুন্দর নেই? একেবারে দেশঘরের আসলি ঘিউয়ের মতো আসলি সুন্দরীই জোগাড় হল। খোসা ছাড়ানো ঘিয়ার মতো রং। কুচকুচে কালো চুল। গালের ভাঁজে নাক-চোখ দুই-ই ডোবে, ডোবে। চোখের তো দরকার নেই। তিন হাত ঘোমটা। আর নাক তো গহনা পরবার জন্য, নাকে নথ উঠল, হিরের নাকছাবিও উঠল। হাতভরতি কাচের চুড়ি। সুহাগ রাতের সুহাগের অত্যাচারে সেই সুহাগনের কাচের চুড়ি যখন মটমট করে ভাঙল তখন ফরসা রঙে রক্তের ফোঁটাগুলো চুনির মতো জ্বলছে দেখে বাসনায় জে. পি. গুপ্তর শরীরে আগুন। কিন্তু হায়, ও আগুন তো বারবার জ্বলে না। জড়সড় একটি কাপড়-গহনার পুঁটলি, তিন হাত ঘোমটা, একটি মোটাসোটা তাকিয়া ছাড়া জয়প্রকাশ আর কিছুই পেতে পারল না। না দুটো কথা, না একটা সলাহ, একটা দুটো শায়রি কি গানা, কিছু না। কিছু না। খালি বছর বছর পয়দা হতে লাগল নাকে পোঁটা, যেখানে-সেখানে পিসাবকরনেওয়ালা, ন্যাংটা হ্যাংলা, ভোঁদাটে ছেলেপিলের পাল। তাদের মধ্যে মেয়েগুলোকে দেখলে জয়প্রকাশের আরও ঘিন্না লাগে। এগুলোও তার কাছ থেকে কাপড়-গয়নার পুঁটলি হয়ে আর কারও ঘরে যাবে, চিত হবে আর আরও একপাল শূকর শূকরী পয়দা করবে।
কিন্তু শাদিসুদা মানুষ, তার ওপরে বাপ হয়েছে, কামে-কাজে তো যেতেই হয়। অতএব কামতা ও কামতানির ইষ্টসিদ্ধি হল। জে. পি. গুপ্ত বাপের ভাঙা লোহার কারবারে গিয়ে বসল। তবে তার চেহারা বদলে দিল সে। এখন লোহার গুদাম আলাদা, অফিসঘর আলাদা, অফিসঘরে সানমাইকা-ঢাকা টেবিল, রিভলভিং চেয়ার। ভেপার ল্যাম্প জ্বলে। আরও নানান ধান্দা বার করতে লাগল সে। এই ভাঙা চোরাই লোহার খাঁচা থেকে তাকে বেরোতেই হবে, হতেই হবে নিয়মনিষ্ঠ ভদ্র ব্যবসায়ী, খানদানি ভদ্রলোক। মানিয়ে নিচ্ছে সে, মানাতেও বাধ্য করছে ক্রমাগত। তার মা ঘুংঘট ছেড়েছেন, খোঁপার ওপর আর তা ওঠে না, বাপ ভদ্র পোশাক পরিচ্ছদ পরছেন। সেই পড়ে-পাওয়া কোঠাবাড়ি এখন হয়েছে মোজেইক করা দোতলা, দোতলায় শুধু তার বসবাস। একতলায় খাবার টেবিল, গ্যাস, ফ্রিজ, গ্যারাজে মোটর সাইকেল, আধুনিক জীবনের সকল অনুষঙ্গে সে ভরিয়ে দিচ্ছে বাড়ি। তবু বাড়িতে ঢুকলেই তার মাথায় খুন চাপে। একটি জড়পুঁটলি এগিয়ে এসে জুতো খুলে দেবে, মোজা খুলে পাটসাট করবে, ফ্যান থাকা সত্ত্বেও কোথা থেকে একটা ঝালর দেওয়া গোলমতো দেশোয়ালি পাখা এনে একটি হাত বার করে হাওয়া করবে যেন একহেতে পেতনি। শূকরের পাল—নোংরা, সর্দিঝরা নাকে কেউ উলঙ্গ, হামা দিতে দিতে কেউ টলটল করতে করতে, কেউ আবার দিব্যি ছুটে কিংবা হেঁটে বাপকে তাদের দৈনিক আদর সোহাগ জানাতে আসবে। তাদের মা তাড়া দেবে, কিন্তু তারা নড়বে না, অবশেষে তার পকেট থেকে লজেন্সের ঠোঙা বার হলে একটা একটা নিয়ে পশ্চাদপসরণ করবে।
যাচ্ছেতাই একটা গালাগাল সে চাপা গলায় উচ্চারণ করবে, তার স্ত্রী পাখাধরা হাতটা একটু জোরে জোরে নড়বে। স্বামীর পৌরুষে সে ভীত এবং প্রীত। ওদিকে মা তাঁর হনমানজির পরসাদসমেত লাড়ু-কচৌরির ভোজনের থালি নিয়ে এসেছেন এবং বহুর দিকে বাড়িয়ে ধরেছেন। যেন মা না দিয়ে বহু দিলে খাবারগুলোর বিশ্রীত্ব একটুও দূর হবে।
