তা, শামতা বা কামতা কেউই এসব কথা বহু বা জয়পরকাশকে বলতে যান। বলেন, মছলিখোর বঙ্গালি, মছলি খেতে শিখবে, নাস্তিক বঙ্গালি, ভগোয়ানকে মেনে চলবে না। বুঢ়া বাপ-মা-দাদার কদর সম্মান করবে না।
কিন্তু কে শোনে কার কথা? বহুও না পোতাও না। বহু দুপুরবেলা তার ঘুংঘট খুলে রসুইঘরের চাতাল থেকে গৌতমের মা-জেঠিমাদের সঙ্গে লংকার আচার আর ভিসিটিবল চপের রেসিপি দেওয়া-নেওয়া করে। নাকের বেসর খুলে রাখে। প্রথমে বলে নাকে লাগে, পরে বলে শরম লাগে। আর জয়পরকাশ—গৌতমদাদার দেওয়া টুথপেস্টে মেজে, ওরই মতো ঝকঝকে হয়ে ইস্কুলে যেতে যেতে সম্পূর্ণ বাঙালি টোনে বলে, গৌতমদা লেফট হ্যান্ডার ব্যাটকে রাইট হ্যান্ডার বোলার দিলে কার সুবিধে কার অসুবিধে হয় আমাকে বুঝিয়ে দাও তো!
কিংবা,
কাল অঙ্ক সার আমায় এমন কড়কালেন এক ক্লাস ছেলের মধ্যে! সুষ্ঠু বাবার জন্যে। কিছুতেই আমাকে ইনস্ট্রমেন্ট বক্স কিনে দেবেন না।
আমি তোকে আমার পুরোনোটা দিয়ে দিতে পারি।
উঁহু, তা কেন? আমি কেন তোমারটা নেব? কেনবার ক্ষমতা না থাকলে আলাদা কথা…
গৌতম বলে, আমার আর একটা নতুন আছে। এটা এক্সট্রা, আগেকার। তবে তোর যদি মনে লাগে জয়, লাগতেই পারে, তা হলে আমার বলার কিছু নেই। আসলে কী জানিস, এ তো গরিবের ভিক্ষা নেওয়া নয়, বোরা অবুঝ হলে, ছোটোদের পরস্পরকে সাধ্যমতো সাহায্য করতেই হয়।
জয়, জয়, জয়। কী সুন্দর। কী মধুর। কী ভদ্র। এভাবেই জয়পরকাশ হয়ে ওঠে জয়. পি. গুপ্ত। এভাবেই স্কুলফাইনাল, হায়ার সেকেন্ডারি, বিকম সে পাস দিয়ে ফেলে। খুব ভালোভাবে না হলেও খারাপভাবেও নয়। জয়. পি. গুপ্ত। সে যখন বি. কম পাশ করছে তখন তার দাদাজি পঁয়ষট্টি বছর বয়সে অতিবৃদ্ধ অবস্থায় দেহ রেখেছেন, বাবা বাড়িটাতে আর. সি. সি.-র ছাদ তৈরি করে ওপরে ছেলের জন্য একটি কামরা এবং নাহা-কামরা বানিয়ে দিয়েছেন। তাতে বিজলি বাতি, ফ্যান, টি.ভি.-সব এবার সি.ই. এস, সি-র নিয়মমাফিক। সে বাঙালিদের মতো মাছ-মাংস খেতে ভালোবাসে, খায়। তবে বাড়িতে নয়। তার ছোটোবেলাকার বন্ধু সেই গৌতমদারা আর এখন পাশের বাড়িতে নেই। শরিকি বিবাদে তাদেরই কাছে বাড়ি আধা দামে বিক্রি করে কোথায় চলে গেছে। কিন্তু জয়ের অনেক ইচ্ছে সত্ত্বেও কামতাপরসাদ সে বাড়িতে উঠে যাননি। খালি বলেন, পাপ হোবে, পাপ হোবে। বাড়িটা তিনি ভাড়া দিয়ে রেখেছেন। বাড়িভাড়ার পুরো টাকাটা এখন জয়ের হাতখরচ।
কেন ও বাড়িতে থাকতে যাবেন না এর সপক্ষে যুক্তির জন্য ছেলে কিন্তু তাঁকে কচ্ছপের মতো কামড়ে থাকে। উঠতে বলে, বসতে বলে, শুতে বলে। অবশেষে জেরবার হয়ে কামতাপরসাদ ইতস্তত করে বলেই ফেলেন কথাটা। তাঁদের বসতবাড়ি ও গো-ডাউন গৌতমের ঠাকুরদার কাছে বাঁধা রেখে অনেক টাকা ধার করেছিলেন একসময় শামতাপরসাদ। তাতেই তাঁর কারবার বিশেষরকম ফলাও হয়। কিন্তু তার পরেই আসে সাংঘাতিক মন্দা। তিনি সে টাকা আর ফিরিয়ে দিতে পারেননি। শামতা তা পারেনইনি, কামতাও পারেননি। অবশেষে সময় উত্তীর্ণ হয়ে যাচ্ছে দেখে গোরুচোরের মতো মুখ করে কামতা যান গৌতমের ঠাকুরদা সেই দ্বিজুবাবুর কাছে।
বাবু, আমাকে আর কিছুদিন সময় দিন।
দ্বিজুবাবু ইতিমধ্যে তিনবার সময় দিয়েছেন কামতাকে। কামতা একটা পয়সাও ঠ্যাকাননি। আজ হাজারখানেক এনেছিলেন।
ময়লা গেঁজে থেকে টাকা বার করতে দ্বিজুবাবু সেগুলো হাতে নিয়ে বলেন, এ যে লাখ টাকার পনেরো বছরের এক বছরের ইনটারেস্টও হয় না হে!
তা হলে?, কামতার বুক গুরগুর করছে।
তা হলে এই। দ্বিজেনবাবু তাঁর সিন্দুক থেকে বন্ধকি কাগজপত্র, দলিল দস্তাবেজের ফাইলটা এনে কামতার হাতে গুঁজে দিলেন। বললেন, তুমি আমার কতকালের পড়শি কামতা, তোমার ভিটেমাটি চাটি করে আমি কি নরকে যাব? যাও, এ সব নিয়ে যাও। তোমার ও টাকা আমি ছেড়ে দিলাম। বিপদের দিনে পরস্পরকে যারা দেখে তারাই হল পড়শি। আমি যেমন তোমার, তুমিও তেমনি আমার।
টাকা না নিয়ে যে দলিল ছেড়ে দিলেন এ কথা দ্বিজুবাবু নিজের স্ত্রীকে পর্যন্ত বলেননি। ছেলেদের তো দূরের কথা। তিনি তার কিছু পরেই মারা গেলেন। ক্রমে তাঁর স্ত্রীও মারা গেলেন। ধীরে ধীরে ওদের পার্টিশনের ব্যবস্থা হল। কামতা দরাদরি করে বাড়িটা আধাদরে কিনে নিলেন। তখন সরকারবাড়ির সব ভিন্ন হবার জন্য ব্যস্ত। পৈতৃক সম্পত্তি কত দামে গেল সে নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। কামতা বলেন, বাড়িটা তো পুরোনো হল কি না, পঁয়তাল্লিশ বছর ভরে গেল, ডেপ্রিসিয়েশন হয়ে আর কী আছে? বাড়ির তেমন ভ্যালু নেই। ভাঙতে বরং খরচা। জমিটুকুরই যা দাম। তা পাঁচ কাঠার উচিত মূল্যই আমি দেব। পড়শি বলে আপনারাও একটু কনসিডার করুন।
বাস, মার্বেলের মেঝে, সেগুন কাঠের দরজা জানলাসুদ্ধ পুরনো বাড়িটা আধা দরে কামতার হয়ে গেল।
এত কথা খুলে অবশ্য তিনি ছেলেকে বললেন না। শুধু বন্ধকি কাগজপত্র ফেরত পাওয়ার কথাটাই বললেন। ও কোঠিতে থাকলে বুঢ়াবাবু আমার উপর গুসসা হোবেন। আমার কোঠি তিনি ফিরিয়ে দিলেন, তিরিশ বছর আগেকার সেই লাখ টাকা এখন সুদে আসলে কত হয় কে জানে বাবা, ও বাড়িতে আমরা থাকতে যাচ্ছি না।
ছেলের কাছ থেকে ঘেন্না, কিছু রি-অ্যাকশন, অন্তত কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন আশঙ্কা করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেসব কিছু এল না। জয় পি. গুপ্তর গম্ভীর মুখ দেখে তার ভাবান্তর অন্তত কামতাপরসাদ সাউ কিছুই ধরতে পারলেন না। ভয়ে ভয়ে যখন ও বাড়ির সাড়ে চার হাজার টাকা ভাড়াটা ছেলের হাতে হাতখরচা বলে তুলে দিলেন, তখনও সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। হাত পেতে নিল টাকাটা। এবং নিয়েই যেতে লাগল চুপচাপ। এবং ঠাকুরদাদার ভবিষ্যদ্বাণী সত্য করে সে কিছুতেই সেই লোহার দোকানে বসল না।
