কিন্তু বালক বয়সেই জয়প্রকাশের এই দুপুররাতের ঝনঝনানি সাক্ষাৎ কুম্ভীপাক নরকের আওয়াজ বলে মনে হতে থাকে। কারণ, প্রথমত তার অ্যাংলো-স্যানসক্রিট স্কুল, আর দ্বিতীয়ত তার প্রতিবেশী গৌতম সরকার, তার চেয়ে কিছু বড়ো এক বালক, বা কিশোর, তার মতো খাঁটি গৌরবর্ণ নয়, কিন্তু চোখেমুখে কথাবার্তায় খুব ধার। পরদিন সকালে উঠেই সে জয়প্রকাশকে জিজ্ঞেস করবে কি না, কী রে জয়? কাল রাত্তিরে তোর ঠাকুর্দার গোডাউনে আবার চোরাই মাল এল? বেশ ঘন ঘন আসছে দেখছি, এবার তোদের টিনের চালি পাকা হয়ে যাবে, দ্যাখ। বলতে বলতে ফিচকে হাসি হাসবে গৌতম।
একটা বোবা রাগে তখন জ্বলে জয়প্রকাশের তনুমন।
তাজ্জব কি বাত? চোরাই? চোরাই হতে যাবে কেন?
মাঝরাত। বুঝিস না? আমাদের এ রাস্তা দিয়ে ট্রাক চলে? পুলিশকেও কিছু দিয়ে ঢুকেছে। আর কিছুই যদি না বুঝিস, তো দাদুকে জিজ্ঞেস করিস, বাবাকে জিজ্ঞেস করিস! আববার কয়লার গুঁড়ো দিয়ে দাঁত মাজছিস? এক তাড়া দেয় গৌতম।
কয়লাগুঁড়ো! কলোয়ারের বাড়ি কয়লার গুঁড়ো ছাড়া আর কিছুই দাঁত মাজবার জন্য সরবরাহ করবেন না জয়প্রকাশের দাদা বা বাপজি। এক যদি লোহাচুর দেন। জয়প্রকাশ নয়, জয় জয়, জয়। গৌতমদাদার শত ধিক্কার অবজ্ঞা, খামখা নাক গলানো, গালাগালি সব সে মাফ করে দিতে পারে ওই নামটুকুর জন্যে। জয়! কী মধুর! কী সম্মানের। যেন অন্য কোনো সাফসুতরো জগতের অন্য কোনো দেবোপম বালকের নাম। কয়লাগুঁড়ো দিয়ে দাঁত মেজে মেজে যার দাঁতের চটা উঠে যায়নি, যার বাড়ির চালি জন্ম ইস্তক পাকা। রীতিমতো দোতলা হাবেলি, যার বাড়ির সামনে অন্ধকার কুলুঙ্গির মতো দোকান নেই, আর…আর যে দোকানে রাত্তিরে ঝনঝনঝনঝন লোহা পড়ে না। চোরাই কিংবা অ-চোরাই।
সুতরাং এই ছেলে যে শুধু জয় গুপ্তা না হয়ে জয়প্রকাশ গুপ্তা হয়েছে এই-ই তার তিন চোদ্দং বিয়াল্লিশ পুরুষের ভাগ্যি। দাদাজি অর্থাৎ শামতাপরসাদ গোড়ার থেকেই তাঁর বউমাকে সাবধান করে দিয়েছিলেন, বহু, পোতাটাকে বড়োলোকের বাড়ির লড়কাদের সঙ্গে মিলতে মিশতে দিয়ো না ওরা আমাদের ছোটো নজরে দেখে।
সাত হাত ঘোমটার ভেতরে থেকে কাঁসার কাঙ্গন বাজিয়ে বহু বলত, দিলে কী হয়? এক ইস্কুলে যায়, বড়ো হাভেলির লড়কা হলে হবে কি মোটেই ছোটো নজরে দেখে না। কতরকম শিখায় আমাদের লড়কাটাকে। এক টিব-পুরা মাজন কিনে দিয়েছে ওকে তা জানেন? বলেছে যতদিন তোর দাদা তোকে না কিনে দেন, আমি দেব। আমাদের লড়কার রকমসকম বদলে গেছে, ভদ্দর আদমি বলে মনে হয়।
এখন সেটাই তো সবচেয়ে শঙ্কার কারণ জ্ঞানবৃদ্ধ শামতাপরসাদের। পড়ালিখা কিছু শিখতেই হয়, নইলে বেওসায় ঠকে যেতে হবে, নুকসান। সহবতও কিছু শিক্ষণীয়। সে অবশ্য তাঁদের আছেই। আসতে নমস্তে, যেতে নমস্তে। হাত জোড়। মুখে দুরবিগলিত হাসি। এ সমস্তই মন্তর। তা এসব তো ছেলেকে, পোতাকে ছোট্ট থেকে তাঁরা শেখানই। কিন্তু এরপর যদি বলে এ লোহা কি দুকানে বসব না, অন্য কাম করব! দেখেন তো এ মুলুকের ছেলেপিলেদের। বাপ-মায়ের প্রাণান্ত খরচ করিয়ে এতগুলি পাস দেয় এরা, তারপর দু পয়সার কেরানিগিরির জন্যে হাঁটাহাঁটি শুরু করে। সে নোকরি পেলে আবার গলায় টাই-মাই ঝুলিয়ে হাতে ব্রিফ-বাক্স, দশটা পাঁচটা করে। নিজেদের বলবে—অ্যাসিস্ট্যান্ট, মেনেজমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট, সেলস এগজিকিটিব। তিনি মনে মনে হাসেন, ঘাসে তো আর মুখ দিয়ে চলেন না। তাঁর খাঁটিয়ার তলায়, কোমরের গেজেতে অমন হাজার হাজার টাকা গোঁজা আছে। ইচ্ছে করলেই তিনি এ কোঠির টিনের চালি সরিয়ে ঢালাই ছাদ বানিয়ে নিতে পারেন, এমন একখানা দুখানা হাবেলিই কি পারেন না? কিন্তু তাঁর এতেই চলে যায়। লোহার কালো গুঁড়ো আর রাস্তার ধুলো মাখা ময়লা ধোতি, চোখের কোণে পিচুটি, সববাইকার চোখের সামনে বসে তিনি মজুর খাটান, একটা পয়সা বেশি কাউকে দিতে কালঘাম ছটিয়ে দেন। সবার সামনে এই দড়ির খাঁটিয়াতেই তার। দুপুরের খানা আসে—পিতলের কাঁসিতে চার-পাঁচখানা গেঁহু কি চাপাটি আর মোটা মোটা সিমলাই লংকার আচার। তাঁর মজুরদের থেকে বেশি কিছু না। লোটা ভর পানি পিয়ে নেন। বাস মহাপ্রাণী শান্ত। আবার কী চাই? ইনকামট্যাক্সঅলারা দূর থেকে পালায় এখন। গেঁজের টাকার কথা ঢালাইয়ের ছাদ বানিয়ে জানান দিলেন। আর কি। বাস করেন যে কোঠিতে তা ছিল এক বুডটি বেওয়ার, বেনারস থাকত। সেখান থেকেই ভাড়া করে আসেন। যতদিন বেঁচেছিল ভাড়া গুনেছেন, সে মরে যেতে তার ভাইপো-ভাগ্নেদের এখানে দাঁত ফোঁটাতে দেননি কিন্তু। কার্যত সুতরাং এ কোঠি তাঁর। কে কতদিন টিনের চালির গোডাউনের উত্তরাধিকার নিয়ে ঝগড়া করবে, সব কেটে পড়েছে। একটা পয়সা ট্যাক্স দিতে হয় না। কর্পোরেশনের খাতায় এ কোঠির কোনো অস্তিত্বই নেই। জল ফ্রি, বিজলি নিয়েছেন রাস্তার তার থেকে হুক করে। তা-ও সবসময় জ্বলে না, বলেন, বিল উঠবে, বিল উঠবে। বহু বা পোতা অতশত জানে না, তাড়াতাড়ি করে রসুই, পড়ালিখা সব সেরে নেয়। কিন্তু ছেলে তো জানে। সে একটু অবাক হয়ে তাকায়। বিল উঠবে? ক্যা বিল? কিসকা বিল? পরক্ষণেই তার মুখে একটা বোঝার হাসি দেখা দিয়েই মিলিয়ে যায়। বাপজি এই বুঢ়াপাতেও তাকে কত কিছু শিখলাচ্ছেন, সাববাশ পিতাজি। যে বিজলি বিল উঠবে করপোরেশনের, কিংবা কোনো অজানা কোঠির কোঠিয়ালের সেই বিলের দোহাই পেড়ে তিনি লোককে এবং আপন পরিবারকে জানাচ্ছেন তাঁর বিজলি খরিদ করা বিজলি। মাঙনা নয়, আবার সংসারে খাওয়া-পরা-শোয়ারও একটা ডিসিপ্লিন আনছেন। ওয়াহ, ওয়াহ।
