তুমি? এখন?—ভূত দেখার মতো চমকে উঠেছে বউ।
একটা যন্তর নিতে এসেছিলুম—সনাতনের আর প্রবিত্তি হয় না কালামুখীটার সঙ্গে কথা কইতে। তোম্বা মুখ করে সে বেরিয়ে যায়। বউ প্রমাদ গণে। কিছু একটা হয়েছে। কী? নিবাদা এসেছিল পিসির চিঠি নিয়ে মিস্তিরি কি আড়াল থেকে দেখেছে? নিবাদাকে দেখে কিছু ভাবল নাকি? সে আজকাল নিবাদাকে অত এসো বসো করে না। বাপের বাড়ির লোক। দাদার মতো। তাকে গহিত সন্দর কথা বলে সাবধান করতে সে মরমে মরে যায়। আজ আবার পিসির চিঠি নিয়ে তত্ত্ব করতে এসে নিজেই দেখতে চাইল কোথায় চালে কী ফুটো হয়েছে। টালি খসেছে, মাটি ধরাতে হবে…। নিবাদাকে দিয়ে আর কাজ করাবে না সে। কিন্তু দেখতে চাইলে না তো করতে পারে না। কাজ খোঁজে বেচারি, কাঠবেকার এ সময়টা। ঠিক এমন সময়েই মিস্তিরির আগমন? একটু বসল না। একটা কথা শুধোল না। সাঁঝের বেলায় বাড়ি ফিরলে সে নিজেই তুলবে কথাটা। নিবাদা এসেছিল টালি সারাতে হবে, দেয়ালে মাটি ধরাতে হবে…।
কিন্তু সাঁঝের বেলায় আজ আর ফিরলই না সনাতন। গেল বাঁধাঘাটে সোহাগির ঠেকে। চুল্লু গিলল মাঝরাত্তির অবধি, তারপরে রক্তরাঙা চোখে একখানা কাতান হাতে বাড়ি চলল।
বাড়ি? বাড়ি তো আর বাড়ি নেইকো তার। হয়ে গেছে নরককুণ্ডি খানকিবাড়ি। পায়ের কাছে এটা কী রে বাঞ্চোৎ? এক লাথিতে রাস্তায় পড়ে থাকা কার করোটিতে লাঠির বাড়ি মারে সনাতন মিস্তিরি। টলে একটু-আধটু। মাথায় তার আগুনের হাঁড়ি, তাতে ফুটছে সাতশো জ্বণের বাঁ হাতের কড়ে আঙুল, বুনো শুয়োরের নাড়িভুড়ি, খুনে-ডাকাতের ধোলাই মগজ, কঙ্গোর জঙ্গলের শেকড় বাকড়। আজ সে দেখিয়ে দেবে মরদের বাচ্চা কাকে বলে। ঘেউ ঘেউ ঘেউ। রাত-কুকুর চিকরে ওঠে। নির্ভুল নিশানায় কাতান চালায় মরদ। কেউ-উ-উ-বাস, মুণ্ডু একদিকে ধড় একদিকে ছিটকে পড়ে। রক্তের ফোয়ারায় ভিজে যায় রাত। পুরো কুকুরের দল ইঁদুরের আওয়াজ করে ডাকতে থাকে।
বাড়ির দরোজায় এক লাথ মারে সনা। তার দেহে আজ হাতির বল। এক লাথ, দুই লাথ, তিন লাথে বিকট খ্যাঁচ আওয়াজ করে হাট হয়ে যায় দরোজা। বুড়ি ঘুমের ঘোরে জিগিয়ে ওঠে, কে? কে? কে রে?
তোর যম।–দাঁতের মাঝে বলে মরদ। লাথ মারে শোবার ঘরের ঝাঁপে। এইবার মশারি হিচড়ে হ্যাঁচকা মারবে সে লাল শালুর সাধের লাউ লেপে। আজ তোরই একদিন কি আমার। ধষষণ করে মেরে ফেলে দিব।
সড়াক।—লাফ দিয়ে পেছু হঠে যায় মরদ। সামনে লকলক লকলক করছে এক কালনাগিনা। টালির ছাদ অবধি উঠে গেছে হিলহিলে পেছল কৃষ্ণবর্ণ, বুঝি চালি ফুঁড়ে যায়। চ্যাটালো আঠালো বিরাট ফণা সনার চোখের সামনে দুলছে, ঝিলিক দিচ্ছে জিহ্বা, মাঝখানে তার ভয়াবহ চিড়। আর ফণার দু পাশ থেকে জ্বলন্ত অঙ্গার নির্নিমেষে তার চোখ তাক করে রয়েছে।
নাফা
শামতাপরসাদ। না, যাঁকে শান্তাপ্রসাদ তবলিয়া বলা হত, তিনি নন। ইনি নেহাতই শামতাপরসাদ কালোয়ার। বঙ্গালিলোগ শান্তাপ্রসাদ বললে তিনি কখনও কখনও শুধরে দেন। তাঁর ছেলে কামতাপরসাদ সাউ। তাঁরও ছেলে ওমপরকাশ নামের ওমটুকু গ্যাংগ্রিনগ্রস্ত প্রত্যঙ্গের মতো বাদ দিয়ে সে জায়গায় আনল একট আস্ত সুস্থ ইস্পাতশানিত জয়, পরসাদও সে আর থাকল না, পরকাশ হয়ে গেল। জয়প্রকাশ গুপ্তা।
এরা ফৈজাবাদের লোক। সেই যে উত্তরপ্রদেশ, অযোধ্যার কাছাকাছি ল্যাংড়া লুলা, হতদরিদ্র ফৈজাবাদি গাঁও। সেই। আর কালোয়ার? কালোয়াররা খুচরো লোহার বেওসা করে। রেসিডেনশাল এরিয়ার মধ্যেই কুচি কুচি অন্ধকার কুলুঙ্গির মতো গোঁজা এক একখানা বে-সহবত নাঙ্গা দোকান, তার ভেতর থেকে ভিখিরির অপুষ্ট পুরুষাঙ্গর মতো রাশি রাশি লোহার রড বেরিয়ে আছে। একখানা পাথরের খণ্ডর ওপর টকটকে লাল একটা জিনিস রেখে উলটেপালটে যাচ্ছে এক যমদূত, আর একজন পেল্লাই হাতুড়ি দিয়ে তাকে পেটাচ্ছে। এরকম ছবি প্রাগৈতিহাসিক সময়ের ছবিতেও আমরা হিস্ট্রি বইয়ে আকছার দেখেছি। তা জিনিসটা কী? অবাধ্য আত্মা-টাত্মা না কি? উঁহু, নেহাত ছেলেমানুষেও জানে ওটা লোহা। লোকদুটোও যমদূত নয় স্বভাবতই, কালোয়ারের ভাড়া-করা মজদুর, খিদমতগার, কখনও বা কালোয়ার নিজেই। লোহা পিটিয়ে পাত বানানো হচ্ছে। রাস্তাটা জনগণের সবাইকার, সুতরাং জনগণের প্রত্যেকেরও, আপনারা জানেন বোধহয়। সেই রাস্তার ধারে দেখা যাবে লোহার পাতের জায়গায় জায়গায় কী যেন একটা যন্তর ধরা হচ্ছে। শোঁ শোঁ আওয়াজ, গাঁক গাঁক নীল আলো, না না, কোনো রামদিন বা আলাদিনের দৈত্য নয়, ওটা অক্সি-অ্যাসিটিলিন গ্যাস, লোহার সঙ্গে লোহা জোড়া হচ্ছে। ওয়েল্ডিং।
তা, এই লোহার বেশিরভাগটাই আবার চোরাই। অনেক রাতে শামতা কামতাপরসাদের কুলুঙ্গি দোকান ও তৎসংলগ্ন টিনের চালের ঘরের সামনে শোনা যাবে ঝনঝনঝনঝন ঝনঝনঝনঝন, আগে পিছে চলন্ত হেভি ট্রাকের মুখ চেপে ধরা গোঁয়ার আওয়াজ। কী রে বাবা? পড়ছেটা কী? আলিবাবার মোহর? তার আওয়াজ তো আর একটু মিঠে হওয়ার কথা! উঁহু! মোহর নয়, কিন্তু মোহরের কাছাকাছি কিছু তৈরি করবার উপায়। ওগুলোই চোরাই লোহা। কিছু পয়সা খেয়ে লরি-ড্রাইভার খানিক লোহা ফেলে দিয়ে যায়। ড্রাইভারেরও কিছু হল, কালোয়ারেরও কিছু হল। ভেজনেওয়ালা, লেনেওয়ালা উভয়েই জানে কিছু মাইনাস ধরতেই হবে, এমনটা হয়ে আসছে, এমনটাই হওয়ার কথা। লিভ অ্যান্ড লেট লিভ। খারাপ কিছু?
