এতগুলো কথা স্বল্পভাষী সনাতনের বউ কোনোদিন বলেনি।
সনাতন প্রথমটা চুপ। কথাগুলো সত্যি। সনাতনের মর্যালিটি অবশ্য খুব পোক্ত নয়। যতীন বা মঙ্গলের বউদের সঙ্গে বনেনি তত ছেড়ে দিয়েছে, এর মধ্যে কোনো ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্ন তুললে চলবে কেন? ছেলে কোলে নিয়ে সুন্দরীকে যদি পেট চালাবার জন্যে বাসন মাজতে হয় তো মাজবে! ছেলে বড়ো করার ভার মায়েরাই নেয়, ওসব ঝামেলি বাপেদের পোষায় না সবাই জানে, যতীনের এত পয়সা নেই যে সে এখন বউকে খোরপোশ দিতে বসে। তেমন বুঝলে সুন্দরী বাচ্চাগুলোকে বাপের কাছ পাঠিয়ে দিক। যতীন তাদের দেখভাল করবে কিনা, তারা বাঁচবে না মরবে অত কথা ভাবার দরকার তো সুন্দরীর নেই! গাছেরও খাব, তলারও কুড়োব-এ হয়? কাজেই সে তার বউকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দেয়, যা যা চুপ কর, চুপ কর। এত খবর তোকে কে দিয়ে গেল? গলায় দড়ি, হুঃ।
হঠাৎ একদিন নটে ভিন্ন মূর্তি ধরে। সে সনাতনের বউয়ের খুব অ্যাডমায়ারার হয়ে পড়ে। দূর থেকে অবশ্য।
তোর অনেক ভাগ্য অমন লক্ষ্মী পেয়েছিস রে সনা। রূপসি তোর বউ একশোবার। কিন্তু গুণ তার দুশো।
ইয়ার্কি মারছ বস?
ইয়ার্কি কী রে? ফ্যাকট! মাইন্ড করিসনি সনা, তুই তোর বউয়ের নখের যুগ্যি নয় তাই অমন রূপগুণের কদর করতে পারিস না। এই তো সেদিন নিবারণ বলছিল…তা দ্যাখ। কদিন ঘরে রাখতে পারিস।
নিবারণ আবার কী বলল?
তেমন আর কী! প্রায়ই যায় কিনা। বলে লক্ষ্মীর পিতিমে, দেখলে চোখ জুড়োয়।
জুড়োচ্ছি চোখ—সনাতন বিরক্ত হয়ে বলল, আর দ্যাখ নটে, গুরু আছিস গুরু থাক। তোকে আর আগ বাড়িয়ে আমার বউয়ের গুণ গাইতে হবে না। সব করেছে। ভারি দুশো-তিনশো রোজগার করছে অমনি সব তার করা হয়ে গেল। সনাতন আর রুজি রোজগার করে না, সনাতন আর কত ধানে কত চাল জানে না।
নটে বলল, আমি একা নই রে শালা। সবই তোর বউয়ের গুণ গাইচে। বলচে অমন মেয়ে লাখে একটা মেলে না। তোর সংসারটাকে একেবারে মাথায় করে রেখেচে। তোকে রেখেচে হাতের তেলোয়। বল রাখেনি? কোনো কিছুর জন্যে তোকে আর ভাবতে হচ্চে?
নিকুচি করেছে তোর হাতের তেলোর—সনাতন রেগেমেগে উঠে যায়। পেছন থেকে নটে হেঁকে বলে, একেই বলে বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা। শালা অমন গুণের বউ পেয়েচিস তার কদর করতে শেখ। তা নয়…নিবারণ তো বলছিল…
সনাতন ক্রমে ক্রমে চুপচাপ হয়ে যায়। হঠাৎই একদিন বউয়ের তৈরি জলখাবার সে ছুড়ে ফেলে দেয়, এটা কি সুজি হয়েছে? রুটি গড়তে শিখিসনি? কী শিখিয়েছে তোর ঝি পিসি? ভাত সেদ্ধ করতে পারিস না বেজন্মার বেটি!
এই ক্রোধ, এই গালির সামনে বউ ক্রমে আর নির্বাক হয়ে থাকতে পারে না। বলে, শুনি বটে এর তার কাছে সোয়ামি মানেই গালি। তা আমাকে যা বলছ বলো, আমার মরা বাপ-মা, আমার পিসি এদের গাল দিচ্ছ কেন? ছিঃ! এই তুমি মরদ?
না, আমি মরদ হতে যাব কেন? যত মরদ তোর ওই নিবারণ।
কেন? নিবারণদাদা আবার কী করল?
কী করল? নিবারণের সঙ্গে তোর কী? পাড়ায় যে ঢিঢ়ি পড়ে গেল!
পাড়ায় ঢিটি? নিবারণদা? কী ভুল বকছ?
ভুল বকছি? আনব ডেকে পাড়াসুদ্ধ লোককে?
বউ পত্রপাঠ স্থানত্যাগ করে।
অর্থাৎ সাক্ষীর ভয়ে আসামির টনক নড়েছে।
এখন থেকে সনাতন, চুল্লু পান করে এসে নিয়ম করে বউকে ঠ্যাঙায়। বাড়ির জানলা দরজাগুলো খুলে রাখে, নালিশগুলো যাতে পড়শিরা ভালো করে শুনতে পায়।
আশনাই! নিবার সঙ্গে আশনাই চলছে? মেরে মুখ ভেঙে দেব!
চুপ করো, চুপ করো। কারও নাম নিচ্ছ কেন শুধু শুধু?…
আর শুধু শুধু। সনাতনের মতো মরদ কি কাউকে গেরাজি করে? শুনুক, দুধারে সবাই শুনুক যাকে তারা মাথায় তুলে নাচত কেমন গুণের গুণী সেই ধনি!
এততেও কিন্তু দমে না সেই বউ। আরও জম্পেশ করে পাঁঠার কালিয়া রাঁধে। তরকা রুটি। তক্তপোশে নতুন লেপ। কাজ সেরে বাড়ি ফিরলে শীতের দিনে হাত পা ধোবার গরম জল। বাড়িতে বিরাজ করে শান্তি। শান্তি অবশ্য একটা মশারির মতো। ভেতরে সন্ত্রস্ত ঘুম, বাইরে মশার ক্রুদ্ধ গর্জন। দুরারোগ্য ব্যাধির বাহকরা চক্রাকারে ঘোরে, ফাঁক পেলেই ঢুকে পড়বে।
নিবারণ বউয়ের বাপের পাড়ার লোক। পিসি তার মাধ্যমেই ভাইঝির তত্ত্ব নেয়। সে তো আর অতশত জানে না। সে বেচারির মাঝে মাঝে একেবারে কাঠবেকার দিন যায়। তখন সে সকাল থেকে রাত অব্দি ফ্রি। এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে ঘুরে বেড়ায়, কেউ একটা ফরমাশ করলে হাসিমুখে খেটে দেয়। কিংবা নিছক গল্প জমায় কারও বাড়ির দাওয়ায় বসে।
একদিন দরকারে অসময়ে ফিরছে, স্বগৃহে নিবারণকে দেখে থমকে আড়ালে দাঁড়ায় সনাতন।
নিবারণ হাঁক পাড়ছে, বউ এসে ঘোমটা খুলে দাঁড়াল। মুখে হাসি আর ধরে না। কী যেন একটা বলছে নিবা, ও-ই বউয়ের হাতে একটা চিঠি দিল! বসছে দাওয়ায়, জল-বাতাস এসেছে! মা বুড়ি কোথায়? ওহ তার তো এখন পা হয়েছে, পাড়া বেড়াতে গেছেন। ঘরে সোমত্ত বউ একা, ভাঁড়ে রসগোল্লা, চারদিকে ভনভন মাছি, ফেলে উনি গেলেন মজা মারতে। ঠ্যাং ভেঙে দিব–দাঁত কিড়মিড় করতে থাকে সনা। ও কী! নিবা যে তার বউয়ের পেছু পেছু ভেতরে যায়? পাঁচ মিনিট? ঘড়ি দেখেনি সনা, কিন্তু এ নির্ঘাত, পাঁচ যুগ! ওই বেরিয়ে এসেছে। বউয়ের কাপড় কি এলোমেলো নয়? নিবার মুখে যেন সিঁদুরের দাগ! নেই? মুছে দিয়েছে শালো! কম সেয়ানা নাকি? বেরিয়ে যাচ্ছে নিবা। একটু সময় দিয়ে বাড়ি ঢোকে সনাতন।
