এস্টারই বটে–বউয়ের ঠোঁট তাচ্ছিল্যে বেঁকে যায়। তোমার ওই যতীন। নিজেকে ভেবেছে খুব চালাক, মিউ মিউ করে রাধুপিসির পেছনে পেছনে ঘুরছে। রাধুপিসি যেন আর জানে না কী মার মেরে যতীন নিজের বউটাকে তাড়িয়েছে। আর ওই মঙ্গল? ও তো দারোগার চাকর। বাড়ি গিয়ে পা-ধোয়া জল খেয়ে আসে, মুখেই যত হ্যান করেঙ্গা ত্যান করেঙ্গা।
তা হলেও হতে পারে, কিন্তু নটে?
বউ এবার মুখ ঘুরিয়ে বলে, ছিঃ!
কীসের ছি, কেন ছি এসব বিশ্লেষণে সে যায় না।
তা আমিই বা কীসে এদের চেয়ে সরেস হলুম রে।
তুমি তো তবু সৎভাবে উপায় করছ, ঘর বসিয়েছ, বুড়ো মাকে দেখছ…
আর যদি সত্তাবে উপায় না করি! যদি বাইরের দিকে নজর দিই, যদি মা বউকে না দেখি?
তবে ঝাঁকের কই ঝাঁকে মিশে যাবে বউ আর কথা বাড়ায় না।
ইয়ার দোস্তরা খারাপ। সে ভালো। এ একটা আমাদের ব্যাপার বটে। সনা এ আমোদ বেশিদিন চেপে রাখতে পারলে না, একদিন বাংলুর মুখে বলেই ফেললে।
আমার বউ না তোদের দেখতে পারে না মাইরি।
কারুর বউই সোয়ামির দোস্তদের দেখতে পারে না রে সনা। হিসকুটির ঝাড় সব।—যতে বলল।
কিন্তু সনাতন চলে গেলে বোঝা যায় কথাটায় তিনজনেরই আঁতে লেগেছে। কিছুর মধ্যে কিছু না, যখন-তখন তারা সনাতনের বাড়ি চড়াও হতে থাকে।
ক্যা ভাবি, একটু চা খাওয়াও, মিঠে হাতের কড়া চা! কী বল সনা?
বা, বা, ফুলকাটা চিনে মাটির কাপ, আজকাল এতেই চা খাচ্ছিস তবে?
আরে এ মোড়াগুলো তো আগে দেখিনি!
এ মাদুরটাও দেখচি নতুন! তা এত নয়া নয়া চিজ কোথা থেকে আসছে রে ইয়ার?
সনাতন তাচ্ছিল্যে ঘাড় নাড়ে, ও সব ঘরের ব্যবস্থা আমি বিলকুল বউয়ের ওপর ছেড়ে দিয়েছি। ও যা ভালো বুঝবে করবে। কোথা থেকে কিনেছে, কবে কিনেছে এসব আমি থোড়ি শুধোই।
বন্ধুরা চোখ চাওয়াচাওয়ি করে মুখ মটকে হাসে। বাস, আর কিছু না।
সেই শীতে সনাতন বউয়ের কাছ থেকে একটি জম্পেশ উপহার পায়। খয়েরি রঙের কার্ডিগান। ফাসক্লাস জিনিস। দুদিকে পকেট, বাহারি বোতাম। পরে ঠেকে যেতে হইচই পড়ে যায়। ঠেকসুদ্ধ চালাচামুন্ডা গুরু গুরু করে ওঠে। কে এসে পকেটে হাত দিচ্ছে, কে বোতামে চুমু খাচ্ছে, কে আবার জোড়া জোড়া সাপ প্যাটার্নে হাত বুলুচ্ছে।
সনা পকেটে কী রাখবে বল তো—নটে জিজ্ঞেস করে যতেকে।
যতীন বলে, লুলিপপ।
মঙ্গা বলে, বলিস কী? সনা আজকাল লুলিপপ খাওয়া ধরেছে?
নিশ্চই—যতীন বলে-বউ রোজগার করছে সনা লুলিপপ খাবে না তো কি তুই খাবি? এবার বকলস দেওয়া পেন্টুল পরবে, মাথায় টুপি পরবে। বউই পরিয়ে দেবে।
ঠেকসুদ্ধ লোক হেসে ওঠে।
সনাতনের ধৈর্যের বাঁধ এবার ভেঙে যায়। সে সামনের বেঞ্চি ঠেলে উঠে দাঁড়ায়। আদাছোলার চাট শালপাতাসুদু পড়ে যায়। সে কলার ধরে যতের।
যত বড়ো মুখ নয় তত বড়ো কথা! থোবড়া তোর এক চড়ে ভেঙে দেব।
নটে এসে ছাড়িয়ে দেয়, আরে ছাড় ছাড়, নিজেদের মধ্যে এসব কী রে সনা?
গুরু তুমিই বিচার করো, এসব টুপি-ফুপি কী বলছে যতে, তার ওপর বউ তুলে কথা!
নটে বলে, ছাড়। যেতে দে। মুখ ফসকে কথা একটা বলে ফেলেছে।
তখনকার মতো শান্তি বিরাজ করে।
কিন্তু মাঝে মাঝেই কখনও মঙ্গা কখনও যতে উলটোপালটা উটকো মন্তব্য করেই যাচ্ছে, করেই যাচ্ছে, কখনও সনাতন ভুরু কুঁচকে তাকাচ্ছে। কখনও আস্তিন গুটোচ্ছে, অমনি থেমে যাচ্ছে, কিন্তু হচ্ছে কথাগুলো। যতে-মঙ্গার সঙ্গে সুতরাং একটা হিচ হয়ে যাচ্ছে সনাতনের। কিন্তু নটরাজের কথা হল আলাদা। সে হল ভদ্দরলোক। তার সঙ্গে মাখামাখি দিন-কে-দিন বাড়তেই থাকে সনাতনের। লোকে বলে, সনাতনের সঙ্গে নটরাজের পটবে না তো কি তোর সঙ্গে আমার? নটে যদি তেণ্ডুলকর হয় তো সনা হল বিনোদ কাম্বলি। নটে যদি উত্তমকুমার হয় তো সনা হল সুচিত্রা সেন। নাম্বার ওয়ান নাম্বার টু বলে কথা!
দুজনের এক নিভৃত মজলিশে নটে বলে, একটা কথা তোকে বলি সনা, মেয়েছেলেকে কখনও বিশ্বাস করবি না। অবিশ্বাস করতে তোকে বলছি না। কিন্তু চোখ কান একটু খোলা রাখতে হয়। বউ রোজগার করছে কথাটা ন্যাড়া করে বলতে সেদিন তোর গায়ে খুব লাগল, লাগবার কথা, কিন্তু সত্যিই তো কী করে তোর বউ ঘরের ছিরি অমন ফেরাল, তোর ঘরদোর তো আগেও দেখেছি।
ও কথা বলিস নে নটে, ও তো উল বোনে। এখন উলের বোনা ফি গোলা কুড়ি টাকা মজুরি। একটা দশ-গোলার সোয়েটার বুনলে অমনি দুশো টাকা। বাড়ি বসে রোজগার, ভালো নয়? দুপুরবেলা আরও পাঁচটা মেয়ে আসে, হাতে থলিতে উলের গোলা! কথা বলতে বলতে শটাশট হাত চলে।
চুপচাপ কথাগুলো শুনে গেল নটরাজ। শেষে একটা সিগ্রেট ধরিয়ে বলল, ভালো, খুব ভালো, অর্ডারগুলো ঠিকঠাক ধরতে পারলেই ভালো।
কথাগুলো বাড়ি এসে বউকে শোনাল সনাতন। শুনে সে গম্ভীরভাবে বলল, তোমাকে কে আমার হয়ে সাউখুড়ি করতে বলেছিল? কত রোজগার করি, কেমন করে রোজগার করি, এ সব ঘরের কথা পাঁচজনকে বলতে যাবার কী দরকার? তোমাকে বউয়ের রোজগারের খোঁটা দিচ্ছে, ওদের বউদের কী করতে হয়? বাচ্চা কাচ্চা সুষ্ঠু বউগুলোকে তো ঘরের বার করে দিয়েছে। যতীনের বউ সুন্দরীদিদি কোলে ছেলে নিয়ে লোকের বাড়ি-বাড়ি বাসন মেজে বেড়াচ্ছে। মঙ্গলের বউ লক্ষ্মীদিদির তিনটি ছেলেমেয়ে, খাওয়াতে না পেরে শেষে লাইনে দাঁড়াচ্ছে সে খবর রাখো? আর ওই নটা? ও যে কতগুলো মেয়ের সববনাশ করেছে। একটা গলায় দড়ি দিয়েছে। দুটো কোথায় চালান হয়ে গেছে কেউ হদিস করতে পারছে না।
