মা কই রে?
সিনেমা গেছে।
বলিস কী? বেতো হাঁটু মচকে যদি মাঝরাস্তায় পড়ে যায়?
পড়বে কেন? মায়ের আর পায়ের ব্যথা নেই তো!
নেই!
কেন, দেখতে পাও না?
তা কী করে গেল?
মল্লিক ডাক্তারকে দেখলুম। ওষুধ দিলে, মালিশ চলছে।
গেল কার সঙ্গে?
দল বেঁধে গেল সব। চার-পাঁচ জনা। ভালো বই এসেছে।
তা তুই গেলি না?
আমি? তোমায় ফেলে?–বউ সনার গলা জড়িয়ে ধরে, বলে, যাব, তুমি আমি। কিন্তু সিনেমা না।
তবে?
বেড়াতে যাব। ইলেকট্রিক ট্রেনে চড়ে, ভোঁ-করে, অনেক দূর। নিয়ে যাবে?
বেশ। যাস এখন।
বলে বটে, কিন্তু যাওয়াটা আর হয়ে ওঠে না। ঘরে ফিরলেই কোথা থেকে রাজ্যির আলস্য এসে সনাতনের হাত-পা মনের দখল নেয়। ইদানীং আবার তার মা সুদ্ধ ঝালর দেওয়া হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছে। এত আরাম! এত আরামও ঘরে থাকতে পারে?
প্রায় দিনই সনাতন দেখে এ পাড়ার ও পাড়ার বউঝিরা তার বারান্দায় আসর জমিয়েছে। কাপে করে চা খাচ্ছে, উল বুনছে, আর গপ্পো করছে। সে ঢুকলেই আসর ভেঙে যায়। আজ চলি ভাই, চলিরে বলতে বলতে সব গা মোড়ামুড়ি দিয়ে উঠে পড়ে। বোঝা যায় আসরটা চলছিল অনেকক্ষণ কেউ কেউ চেনা পড়োশিনি, কী মিস্তিরি, আছ কেমন? বলে দুদণ্ড দাঁড়িয়ে ভদ্রতা করে যায়। কেউ আবার হাতের থলি গুটিয়ে একেবারে বার রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ায়।
এত আড্ডা কীসের?—সে গম্ভীর মুখে বলে একদিন।
বউ প্রথমটা জবাব দেয় না।
কী রে?—আবার হাঁকে সনাতন।
কেন? আড্ডা দিলে কী হয়?
যদি কিছু নাই হবে তবে পালায় কেন? যেন পালে বাঘ পড়েছে!
মুচকি হাসল মেয়ে, বলল, আচ্ছা, এবার বলে দেব, ঘরের মানুষ এলে পালিয়ো না গো।
মুড়ির সঙ্গে থাবা-থাবা ঘুগনি খেতে খেতে সনাতন বলে, আচ্ছা হল গিয়ে মেয়েমানুষের কাল, শনির দশা যাকে বলে। বুঝলি? আজ ভাত সেদ্ধ হয়নি। কাল তরকারিতে লবণ দিতে ভুলেছি। পরশু পাশের ঘরের বচসায় তাল ঠুকতে যাচ্ছি।
সনাতনের গলায় মুড়ি আটকে যায়। বউ হাসছে, গমকে গমকে হাসছে।
কী হল? এত হাসি কীসের?—সে ধমকিয়ে ওঠে।
জল খাও এক ঢোঁক–জল এগিয়ে দেয় বউ। তারপর হাসি গিলে নিয়ে সিঁদুররাঙা মুখ করে বলে, তুমি এমন করে বলো! হুলোতেও হাসবে।
কথাটা হাসির হল?
হাসির ছাড়া কী? একেক দিন দুপুরে দু-চারজন বন্ধুসাথি আসে, তো তার সঙ্গে ভাত ধরা, তরকারি সেদ্ধর সম্পর্ক কী! আগে অসিদ্ধ, আলুনো পাও তারপরে বোলো।
তুই জানিস না—সনাতন এখন অনেক নরম হয়ে এসেছে—মেয়েমানুষ জাত বড্ড জাঁহাবেজে, মতলববাজ! ওই যে চৌরাস্তার শঙ্করীটা! ও তো তোর মাথায় ভূত ঢুকিয়ে দিল বলে!
জাত তুলছ কেন মিস্তিরি! আমি যদি ব্যাটাছেলে জাত বলে খোঁটা দিই তোমার কেমন লাগবে? সব মানুষে কি আর সমান হয়? ওই যে তোমার বন্ধু যতীন, মঙ্গা, নটে…ওরা আর তুমি কি এক? শঙ্করীই বা তোমার কোন পাকা ধানে মই দিল!
বাপ রে! কাঁড়ি কথা শুনিয়ে দিলি যে?–সনাতন হাসে। তার বন্ধুদলের থেকে সে আলাদা—এই নতুন সন্দেশটি তার বেশ লেগেছে। যেন আবার খাব সন্দেশ। সত্যি কথা বলতে কী যতই সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হোক, সনাতনের ভেতরে একটা কমপ্লেক্স কাজ করে। নটে ফিলিমস্টার, মেয়েমাত্রই তাকে দেখলে লটকে পড়ে, মঙ্গার পুলিশফুলিশের সঙ্গে এক গেলাসের ইয়ার্কি, যাকে বলে ইনফুলেন্স। যতেটার বডিতে যেমন, বাতচিতেও তেমন সর্ষের তেল মাখানো, যে কোনো বিপদ থেকে স্রেফ বাতেল্লা দিয়ে কেটে বেরিয়ে যাবে। কার্যসিদ্ধির জন্যে স্বয়ং বস নটে যতের বুদ্ধি নেয়। মঙ্গার হোল্ডের ওপর ভরসা করে। কিন্তু সে সনাতন কে? কী? একটা সাধারণ কলের মিস্তিরি যার একখানা প্রকাণ্ড থোবড়া আছে। বাস! প্লামিং কাজ সে খুব ভালোই জানে। কিন্তু কমপিটিশন এসে যাচ্ছে। ফটিককে সে নিজের হাতে কাজ শেখাল এখন সেই ফটিকেরই পাখা গজিয়েছে। অধর দাস হেড মিস্তিরিটা তো আস্ত ঘুঘু। পানি-ট্যাংকির কাছে সকালবেলা তারা জড়ো হয়। অধর দাস হেড। ওইখান থেকেই সব যে-যার ডিউটি নিয়ে সারা দিনের মতো বেরিয়ে যায়। তার শাঁসালো কাজগুলোয় অধর ঠিক ব্যাগড়া দেবে। সিঙ্গিদের ফুরুলে (ফেরুল) টি লাগিয়ে দু ফাঁক করেছিস তুই? হাঁরে সনা!
হ্যাঁ। কেন?
জানিস বড়ো সিঙ্গিদের কলে জল আসা বন্ধ হয়ে গেছে। ফুরুলে হাত দেবার তুই কে? তোর কর্পোরেশনের লাইসেন্স আছে?
এখন লাইসেন্স সত্যিই নেই। কিন্তু বড়ো সিঙ্গিদের কলে জল না আসার নালিশটা ডাহা মিথ্যে। ছোটো সিঙ্গিরা ডেকেছিল সনাতনকে। তাদের কলের জল তাদের বড়ো শরিক পুরো ধরে নিচ্ছে, কল নীচু করে এস্টপ-কক দিয়ে। সনাতন বুদ্ধি দিল একেবারে ফুরুল থেকে দুজনের লাইন আলাদা করে নেওয়া যাক। তাই করতে ছোটো সিঙ্গিদের যত জল আসছে বড়ো সিঙ্গিদেরও ততই আসছে। প্রেশার কম। তাই দুজনেই কম-কম পাচ্ছে। কিন্তু পাচ্ছে ঠিক।
অন্যদের ব্যাপারে, এমনকী সেদিনের ছোঁড়া ফটিকের ব্যাপারেও যেটুকু বা প্রোটেকশন দেবার, দিয়ে থাকে অধর দাস, যার না কি কর্পোরেশনের লাইসেন্স আছে। খালি সনাতনের বেলাতেই খিস্তি, খচরামো। বললে, আইন মেনে কাজ না করলে নিজের পোঙা নিজে ঢাকিস্। আমি পারব না।
এই অবস্থায় বউয়ের অ্যাসেসমেন্ট সনাতনের লাগে মন্দ না। মুখে অবশ্য জানতে দেয় না, বলে, এ শালি, খবদ্দার। বন্ধু তুলে কথা বলবি না। জানিস কত বড়ো বড়ো এস্টার একেক জন!
