দ্যাখ দেখে নে। আমার বউ তো আর মোচলমানের ঘরের বোরখাপরা বিবি নয়। মর্ডান মেয়ে। দ্যাখ।
ফট করে বউয়ের শলমাচুমকির ঘোমটাখানা হাট করে দিল সনাতন।
ফিক করে হাসল মেয়েটি। তারপরেই গম্ভীর হয়ে উঠে চলে গেল। মুখ ফিরিয়ে বলে গেল, চা আনছি।
তখনই সবাই দেখল—বাপ চটক বটে।
ভদ্দরলোকের বাড়ির মেয়ে ফুসলিয়েছিস না কী বল তো!
সনাতন বললে, কেন? আমরা কি ভদ্দললোক নই?
সে কথা যদি বলিস তো সে আলাদা কথা। পেলি কোথায়?
সম্বন্ধ করেছে আমার মেসো। তেলকলের পোদ্দারবাবুকে চিনিস তো? সে-ই। বাপ মা মরা। পিসির গলায় ছিল। ঝোপ বুঝে মেসো কোপ মেরেছে।
কী রকম?
পোদ্দার মেসোর কাছে টাকা ধার পিসিটা। মেসো বললে, টাকা যখন খুশি দিয়ো। কিন্তু আমার শ্যালীপোর জন্যে দিতে হবে তোমার ভাঞ্জিটাকে।
কেন? তার জন্যে অত দরদ কীসের?
কী যে বলিস? শ্যালীপপার জন্যে মেসোর দরদ থাকবে না তো কি তোর জন্যে আমার থাকবে? …
এই সময়ে বউ চা নিয়ে এল। একটা কেটলি আর গোটা কতক মাটির ভাঁড়।
সবাইকে ঢেলে ঢেলে দাও। সোয়ামির দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।
ক্যা নাম গো ভাবি? —নটে একটু হিন্দির মিকসি দিয়ে শুধোয়।
নাগিনা।
ক্যা?
চার-পাঁচ যতজন ঘরে ছিল সববার যেন একসঙ্গে ইলেকট্রিকের শক লেগেছে। থিনঅ্যারারুটের বিস্কুট সুদ্ধ একটা স্টিলের থালা সনাতনের হাতে চালান করে চলে গেল বউ।
সত্যি রে সনা?
কী সত্যি?
ওই নাম?
সনাতন হাসতে থাকে, মিছে কথা বলতে যাবে কেন খামোখা? মলিনা, সেলিনা এত নাম হচ্ছে আর নাগিনা নাম হতে পারে না?
এখন, দলে এক নম্বরের হিরো যদি হয় নটরাজ, তো দু নম্বর হল সনাতন। নটের মতো কটা রং, ঝাড়া ছ-ফুট না হতে পারে, কিন্তু সনার কাঠামোটাও কিছু ফ্যালনা নয়। তা ছাড়া রঙে নটে পয়লা হতে পারে, কিন্তু চুলে গুরু সনা। সনার মাথায় একেবারে আসল গুরু ফিট করে বসানো। এ বুড়ো বয়সের কে. বি. সি-র গুরু নয়, এক্কেবারে বয়সকালের রংদার শাবি। যেন পুরনো মডেলের ফোর্ড গাড়ির বনেট! ইয়া গুল, ইয়া ছাতি। বলবান পুরুষ যাকে বলে।
এ হেন সনাতনের ঘরে সুখ-সোয়াস্তি ছিল না। মা-বুড়ির কবেই কোমর ভেঙেছে। দিনরাত কোঁকায় আর সনাতনের মরা বাপকে গাল দেয়। ইঁদুরে মাটি তুলে তুলে ঘরদোর নৈরেকার করেছে। রান্নাঘরে দুটি সানকি, একটি জনতা, একটি কড়া আর একরাশ কালিঝুলি। ডিজেল-মিশেল কেরাচিনির ঝাঁঝে ভূত পালিয়ে যায়। কিন্তু ইঁদুর, আরশুলো, টিকটিকি, মাছি, মশার কামাই নেই। একখানাই ঘর, দরমার বেড়া দিয়ে দুভাগ করা। একদিকে মা আরেক দিকে বউ নিয়ে ছেলে। বউ সনাতনের মুখ চাপা দেয়, আস্তে, আস্তে আস্তে।
নিকুচি করেছে তোর আস্তের।
তাহলে আমি পিসির কাছে চলে যাব। কালই। দিব্যি!
ব্যস, জোঁকের মুখে নুন পড়ে। এখন নতুন শাদি। নতুন রংচং। তার ওপরে চটুকে বউ। বয়স ষোলো কি সতেরো। এখন সনাতন একটু বিচ্ছেদসম্ভাবনাকাতর তো হবেই।
অ বউ? কী কচ্ছিস?
গর্তে অ্যাসিড দিচ্ছি মা!
দিয়ে?
দিয়ে ইট পাথর খোলামকুচি দিয়ে ভরাট করব।
কদ্দিন দিবি?
যদ্দিন না গেরস্তর ঘর থেকে ইঁদুর যায়।
অ বউ কী ঘষছিস?
গেরস্তর কড়া কেটলি ছানতা-জালতি জনতা খন্তা খন্তি!
ঘষে?
রুপোর মতো চকচকে যদি না করি তো আমার নাম নেই।
কদ্দিন রাখবি?
যদ্দিন গতর থাকে মা আর যদ্দিন আমার মানুষের…
মানুষের কী?
কিছু না।
অ বউ, কে এল?
নিবারণদা।
কে নিবারণ? নিবা ঘরামি?
হ্যাঁ গো মা।
কী করবে?
বারান্ডা ছাইবে।
পয়সা দেবে কেডা?
যার ঘর সে দেবে! তোমার ছেলে, আবার কে?
সনাতন সেদিন কাজ সেরে ফিরে দেখে ছাওয়া বারান্দায় নতুন পলতে পরানো পরিষ্কার জনতার নীল শিখায় চকচকে তাওয়া চাপিয়ে চেপে চেপে রুটি করছে। বউ। একদিকে উঁচু মাটির বেদিতে পুরোনো সানকি কড়া-কেটলি যেন বা নতুনই। ক-টি বোয়া মাটির ভাঁড় পাশে উপুড় করা।
এ কী?
বাচ্চা মেয়ের মতো একগাল হেসে বউ বলল, রান্নাঘর গো, এবার থেকে এখানেই রান্না করব। ভালো হয়নি?
মুখ আঁধার করে তাকিয়ে তাকে সনাতন।
নিবারণদাকে দিয়ে ছাইয়ে নিলুম। সবসুদ্ধ পঞ্চাশটা টাকা তুমি ওকে দিয়ে দিয়ো। এসো চা খাবে এসো।
সনাতনের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা রাখে না বউ, ভূতপূর্ব রান্নাশালে ঢুকে যায়। এইবার সনাতনের চমৎকৃত হওয়ার পালা।
বাড়ির একটিমাত্র তক্তপোশে গুছিয়ে বিছানা করা। মা সেখানে বসে হাসছে। ছোট্ট জানলা দিয়ে ছোট্ট একটা হাওয়া ঢুকল। ঘরেতে মশার ধূপের কড়া গন্ধ।
বউ বললে, রুটির সঙ্গে গুড় খাবে তো?
ভেলি?
না এখো।
আড়ে আড়ে চায় সনা, বউয়ের মুখে রহস্য হাসি।
অর্থাৎ কিনা, মায়ের এখন আলাদা ঘর হল অর্থাৎ কিনা বড়ো ঘরটি এখন নিভাঁজ নিষ্কন্টক ফুলশয্যে ঘর।
তাই বলে আমাকে না বলে-কয়ে তুই এত বড়ো কাণ্ডটা করবি? দ্যাখো,—বউ চোখ তুলে সোজা তাকায়, তুমিও যেমন কত্তা, আমিও তেমন গিন্নি। বারের ব্যবস্থা তোমার, ঘরের ব্যবস্থা আমার। তোমাকে বললে তুমি বাগড়া দিতে না? এতদিন ধরে ঘরদোরের এমন ছিরি তবে কেন করে রেখেছিলে?
খুব গিন্নি হইচিস-কচি চিবুকখানা এবার সোহাগ করে নেড়ে দেয় সনাতন।
এইভাবেই আস্তে আস্তে সনাতনের রান্নাঘরে বাসন হল, মায়ের ঘরে ঠাকুর বসল, নিজের ঘরে তক্তপোশ এল, তক্তপোশে নতুন বিছানা-বালিশ, ঘরে তাক, তাকে পুতুল। ঘরের বাইরে পাপোশ, ভেতরে মাদুর, বারান্দায় মোড়া, কোণে ঝাড়, চা খাবার কাপ, জল খাবার গেলাস। সন্ধের শাঁখ, ধূপ। আর সনাতনের বেতো মা আস্তে আস্তে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল। কবে যে সে দাঁড়িয়েছে, কবে যে পাড়া বেড়াতে শুরু করেছে, কবে যৌবনকালের তরিবতের মাংসের কালিয়া রাঁধতে লেগেছে সনাতন সেটা খেয়ালই করেনি। খেয়াল করল যেদিন সন্ধেবেলা ঘরে ফিরে মাকে দেখতে পেল না।
